kalerkantho


তারাভরা রাত

ইফতেখারুল ইসলাম

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তারাভরা রাত

কয়েক সপ্তাহ আগে এক পত্রিকায় পশ্চিমবঙ্গের কবিদের আলাপচারিতা আগ্রহ নিয়ে পড়ছিলাম। দুই কবির সাক্ষাত্কার নিয়েছেন অন্য এক কবি। তাঁদের আলোচনায় সমসাময়িককালের নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কবিরা অন্য দেশের হলেও তাঁদের আলোচনার কোনো কোনো ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ থাকতে পারে। কিছু বিষয় বাংলা কবিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্পূর্ণ অন্য কারণে আমার মনোযোগ আটকে যায় একটা ছোট অংশে।

শ্রীজাত :...প্রেম যে শুধু মানুষের সঙ্গেই হবে এর কোনো মানে নেই। হতেও পারে শহরের সঙ্গে প্রেম। যেসব শহরে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, তাদের সঙ্গে আমার রীতিমতো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। দু-একটি শহরের প্রেমে এমনও পড়েছি যে নিজের শহরে ফিরে এসে আমি কেঁদেছি।

পৌলোমি : কোন শহর?

শ্রীজাত : যেমন ধরো নিউ ইয়র্ক। নিউ ইয়র্ক শহরে আমি প্রথমবার ভিনসেন্টের ‘দ্য স্টারি নাইট’ ক্যানভাসটা দেখি। সেই অভিজ্ঞতাটা আর কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়।...

গত মাসের সতেরো তারিখের ‘দেশ’ পত্রিকায় দুই কবির যুগল সাক্ষাত্কারের এক জায়গায় আছে ওপরের এই কথাগুলো।

ঠিক ওই সময়টাতে নিউ ইয়র্কে তেইশতম বাংলা বইমেলার আমন্ত্রণে আর অন্য দু-একটি ব্যক্তিগত উপলক্ষ নিয়ে অল্প কয়েক দিনের জন্য নিউ ইয়র্ক যাই আমি। প্রতিবারের মতোই আমার ভ্রমণসূচির একটা পুরো দিন বরাদ্দ ছিল মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট বা মোমার জন্য। বলা বাহুল্য, ‘স্টারি নাইট’ সব সময়ই মোমা দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেকটা সময় বিহ্বলভাবে কেটে যায় এই ছবির সামনে। উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত ঘরে দাঁড়িয়ে ছবিটা খুব কাছে থেকে দেখি। চারপাশে তাকিয়ে দেখি এই ছবি দেখতে আসা অসংখ্য মানুষকে। পাশের ঘরগুলোতে মাতিস অথবা পিকাসোর বিখ্যাত কিছু ছবি দেখার পর আবার ফিরে আসি স্টারি নাইটের কাছে। এই ছবির সামনে সারাক্ষণ একই রকম ভিড়। অনেক মানুষ নীরবে একাগ্রভাবে তাকিয়ে থাকে। অন্য সবার পাশে দাঁড়িয়ে আমিও দীর্ঘ সময় ধরে দেখি ভিনসেন্ট ভ্যানগগের এই বিখ্যাত ছবি। শ্রীজাতের ভাষায় এই অভিজ্ঞতাটা আর কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়।

চিত্রকলার ইতিহাসে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন, সবচেয়ে নিবিড় একটি রাতের ছবি এঁকেছেন ভ্যানগগ। এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলোর অন্যতম। রাতের ঘন অন্ধকার তীব্রভাবে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে শিল্পীর ছোট ছোট তুলির টানে তৈরি মহাজাগতিক রশ্মির ঝলকে। তাঁর বেশির ভাগ ছবিতেই তুলির টানে তৈরি আলোর ঝলক এত তীব্র যে ক্যানভাসের সীমিত পরিসর তাকে ঠিকমতো ধরে রাখতে পারে না। কিছু আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসে। এই ছবিও তেমন।

স্টারি নাইট পৃথিবীজুড়ে অতিপরিচিত একটি ছবি। নিউ ইয়র্কে না গিয়েও আমাদের অনেকেই এই ছবি দেখি। অর্থাৎ এটির কপি বা প্রতিলিপি সর্বত্র দেখা যায়। কাগজে, কফির মগে, কোস্টারে, টি-শার্টে, ন্যাপকিনে, ফ্রিজের গায়ে লাগানো চুম্বকে, দেয়াল-সাজানো ছবিতে বারবার দেখে দেখে আমরা এই দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠি। তার পরও সুযোগ পেলেই অসংখ্য মানুষ মূল ছবিটি দেখার জন্য ছুটে আসে। আর এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ ও আপ্লুত হয়। এতেই বোঝা যায় ১৮৮৯ সালে আঁকা এই অসামান্য ছবিটি শিল্পানুরাগী মানুষের কাছে অতিপ্রিয় ও প্রকৃত অর্থেই কালজয়ী।

এই ছবিটি ভিনসেন্ট ভ্যানগগ এঁকেছিলেন সাঁ-রেমি অঞ্চলের সাঁ-পল নামক মানসিক হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সময়। বারবার বিষাদ ও মনোবিকলনের আক্রমণে পর্যুদস্ত অবস্থায় তাঁকে সেখানে ভর্তি করা হয়। এখানকার চিকিৎসা ও শুশ্রূষায় তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। তাঁকে এই হাসপাতালের ভেতর ও বাইরে ছবি আঁকার অনুমতি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ছবি আঁকার জন্য হাসপাতালের ভেতরেই তাঁকে বানিয়ে দেওয়া হয় একটা স্টুডিও। এই হাসপাতালে থাকাকালে তিনি অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। ছবি এঁকেছেন নিয়মিতই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর রোগ ফিরে এসেছে। আবার দেখা দিয়েছে মানসিক বিভ্রম, গভীর বিষাদ ও আত্মহত্যার প্রবণতা। এ সময় তাঁর ছবিতে রঙের ব্যবহারে কিছু পরিবর্তন ঘটে। হালকা ও উজ্জ্বল রঙের বদলে প্রথম জীবনে ব্যবহূত গাঢ রংগুলো আবার ফিরে এসেছে তাঁর ছবিতে। ‘স্টারি নাইট’ এই স্বর পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

ভ্যানগগের নাতিদীর্ঘ শিল্পীজীবনে রঙের ব্যবহার যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে তাঁর শিল্পশৈলী আর তুলির প্রয়োগ বা ব্রাশস্ট্রোক। এ ছবিতে তাঁর প্রতিটি তুলির টান মনোযোগ দিয়ে দেখি। মনে হয় রঙের ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে। রঙের প্রতিটি ফোঁটা মেঘের সঙ্গে ঘুরে চলেছে চাঁদ আর তারাদের ঘিরে। ছবির বাঁ দিকে থাকা সাইপ্রেসগাছে তুলির টানে রং বেঁকে গেছে গাছের শাখা হয়ে। তুলির কোমল টানে পাহাড় ঢালু হয়ে নেমে এসেছে নিচের ছোট্ট শহরটির ওপর।

শহরের ছোট ছোট বাড়ির গায়ে নরম বাঁকানো তুলির টান থাকলেও প্রতিটি বাড়ির আকার তৈরি করার জন্য ব্যবহূত হয়েছে শক্ত ও স্পষ্ট রেখা। পুরো ছবিতে ব্যবহূত বাঁকানো তুলির টান আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহের মধ্যে এই সলিড রেখাগুলো কিছু কিছু ছেদ তৈরি করেছে। প্রতিটি বাড়ি আলাদা করে চেনা যায়। কয়েকটি বাড়ির ভেতরে জ্বলা ছোট ছোট আলোকেও স্পষ্ট করেছে শিল্পীর তুলি। আর ওই শহরেই রয়েছে উঁচু মিনারযুক্ত একটি ছোট গির্জা।

ক্রমে সরু হয়ে উঁচুতে ওঠা মিনারের কারণেই গির্জাটি অনেকখানি আলাদা হয়ে আছে শহরের অন্য সব ঘরবাড়ি ও বৃক্ষলতা থেকে। এর কি কোনো তাত্পর্য আছে? শিল্পী কি তারাজ্বলা দীপ্র ও স্বর্গীয় ভুবনের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষকে যুক্ত করতে চেয়েছেন?

এর উত্তর খোঁজার আগে জেনে রাখা দরকার এ ছবির আরেকটা বৈশিষ্ট্য। এ ছবির দৃশ্যটি ভ্যানগগ সৃজন করেছেন সম্পূর্ণভাবে কল্পনার সাহায্য নিয়ে। সাঁ-পল হাসপাতালের আশপাশে বা তাঁর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে দেখা কোনো দৃশ্যের সঙ্গে এর একটুও মিল নেই। অন্যান্য ছবিতে তিনি সাধারণত তা-ই এঁকেছেন, যা তিনি নিজে দেখেছেন। সে হিসেবে এই ছবি খুবই উল্লেখযোগ্য এক ব্যতিক্রম।

নিজের মন থেকে এ রকম এক দৃশ্যের ছবি কেন আঁকলেন ভ্যানগগ? যে দৃশ্য তিনি দেখেননি, তারই চিত্র তৈরি করার সময় সেখানে মেঘ আর তারাদের ঘূর্ণি দিয়ে স্বপ্নময় ও স্বর্গীয় আকাশ এঁকেছেন। সেই আকাশের নিচে এঁকেছেন পাহাড় ও গাছের ছায়ায় ছোট এক শহর। কী বার্তা আছে এখানে?

বাঁকানো তুলির টান আর রঙের ঘূর্ণি মেশানো তারাভরা আকাশকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকরা। ১৯৮৯ সালের বসন্তকালে আকাশে কী কী গ্রহ-নক্ষত্র দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা হয়েছে। মে ও জুন মাসের মধ্যে শুক্র সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হিসেবে দেখা দিয়েছিল, আর সেটাই শিল্পীকে প্রেরণা দিয়েছে তারাভরা রাতের ছবিটি আঁকতে। নিজের স্নায়বিক রোগ হয়তো রঙের ঘূর্ণি তৈরিতে সাহায্য করেছে। এমনকি মাইগ্রেন আর ভার্টিগো রোগীরাও এ ছবি দেখে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা তৈরি করেছেন। নানা ব্লগে ও মন্তব্যে সেসব কথা লিখেছেন তাঁরা।

তবে এই ছবির পেছনে শিল্পীর ভাবনাটুকু বোঝার জন্য চিত্রকলার বাইরের কিছু কিছু তথ্যও তাত্পর্যপূর্ণ হতে পারে। ওই ছবিটি আঁকার সময় ভ্যানগগ তাঁর ভাইয়ের কাছে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি ধর্মের তীব্র প্রয়োজন বোধ করি, তাই আমি তারাদের ছবি আঁকতে বাইরে যাই।’ হয়তো ওই আকাশ, ওই প্রকৃতি আর ওই নক্ষত্রখচিত রাত্রি শিল্পীর অনন্তের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছে। সত্যিই এই ছবি দেখার অভিজ্ঞতা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়।

 



মন্তব্য