kalerkantho


মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ

সাদিয়া সুলতানা

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ

অঙ্কন : মানব

হাতিটার বিশাল পেটের ডান পাশে থালার মতো একটা গোলাকার ক্ষতচিহ্ন। মানব শরীরের সঙ্গে হাতির শরীরের দাগের পার্থক্যটা শুধু দৈর্ঘ্য-প্রস্থে। মৃত হাতিটার ত্রিভুজাকৃতির কান, হালকা লোমশ ঝুলঝুলে চামড়ায় ঢাকা বিরাট মাংসল দেহ আর থামের মতো পায়ের পাশে দাঁড়ানো একজন মানবসন্তানকে নিতান্ত ক্ষুদ্র লাগে। সেই বিশালত্ব উপভোগ করতেই উত্সুক জনসাধারণ হাতির চারপাশে মালার মতো গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই অঞ্চলের মানুষ মাঝেমধ্যেই হাতির দর্শন পায়। সীমান্তের কাছাকাছি খাদ্যের খোঁজে দু-একটা দলছুট হাতি হঠাৎ লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে। কিন্তু ভারতীয় সীমানার কাঁটাতারের পাশে এইভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা হাতির দশাসই মৃতদেহ দর্শনের অভিজ্ঞতা এই তল্লাটের লোকের কাছে নতুন। 

হারুন হাতিটার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। সে অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছে। হঠাৎ হাতিটার শরীরের ক্ষতে হারুন একটা পাটকাঠি গুঁজে দিতেই সেটা দেবে যায়। এখন বোঝা যায়, ক্ষতটা বাইরে থেকে যতটা নির্দোষ ধরনের দেখা যাচ্ছে, এই পুরনো ক্ষতটা ঠিক ততটা নির্দোষ নয়। হারুন পাটকাঠিটা টেনে তোলার চেষ্টা করতেই কাঠির ডগা মট করে ভেঙে হাতির পেটে সেঁধিয়ে যায়। ভয় পেয়ে ও কয়েক পা পিছিয়ে আসে। নেতাগোছের মনোয়ার এসে হারুনের পিঠে চাটি মারে,

—হালা! আকাম করস? পুলিশ আইলে ঠ্যালা বুঝবি।

মনোয়ারের কথা শুনে ভয় পেয়ে হারুন হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। কিন্তু স্বস্তি না পেয়ে পিছু হেঁটে অদূরে পাকুড়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ঘটনাস্থলের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা না দেখে বাড়ি ফেরা মুশকিল। এ এক অদ্ভুত টানাপড়েন।

বৃদ্ধ আবদুল কুদ্দুস প্রতিবেশী হযরত মারফত খবর পেয়ে দশ বছর বয়সী নাতি মেহেরের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে মরা হাতি দেখতে এসেছে। উত্তেজিত আবদুল কুদ্দুস কাঁপা কাঁপা গলায় নাতিকে বলে,

—বুঝছস দাদা, মরা আতি লাখ ট্যাহা।

ভিড়ের মধ্যে কারো একটা সাবধানী গলা শোনা যায়, ‘কেলা মারচেরে ভুইত্যামারা আতি?’ মুরব্বিগোছের কেউ একজন বলে, ‘অত বুড়া আতি, বয়স অইয়া মরছে। কত বড়! বাপ রে বাপ! দত্যি-দানোর মতো আতি! জীবনে পইলা অত কাছেত্তে দেখলাম। এইডারে লাড়াইব কিবা!’ এক যুবক হাতির শুঁড়ে হাত বুলাতে বুলাতে মোবাইল উঁচু করে মুখ হাসি হাসি করে সেলফি নেয় আর বলে, ‘এই চিন্তা তোমার কেরে চাচা? এই চিন্তা তো পুলিশের।’

প্রশাসনের লোক তখনো এসে পৌঁছেনি। মেনকি ফান্দার এই অংশটা বেশ নিরিবিলি। জঙ্গলে পূর্ণ। ভারত-বাংলাদেশ সীমানা পিলারের এদিকটায় লোকজনের যাতায়াত কম। তাই পারতপক্ষে লোকজন এই দিকে আসে না। আজ অবশ্য এখানে কৌতূহলী লোকের ভিড়। তারা এখন সরকারি লোকজনের আগমনের আশায় পথ চেয়ে আছে।

আজ হাতির মৃতদেহটি নজরুল প্রথম দেখতে পায়। ওর বাড়ি মেনকি ফান্দার এই শেষ প্রান্তে। যদিও বিজন এই এলাকায় নজরুলের যাতায়াত কম। আজ সকালে নজরুল তার বড় মেয়ে আট বছর বয়সী হেনাকে সঙ্গে করে বউয়ের ফরমায়েশ মতো লাকড়ি খুঁজতে বের হয়েছিল। হঠাৎ তরতাজা কিছু ট্যাকাপাতা চোখে পড়ায় সেগুলো তুলতে গিয়ে উঁচু টিলার মতো হাতিটাকে পড়ে থাকতে দেখে ও মেয়েকে রেখে দিগ্বিদিক ছুটে পালিয়েছিল। আসলে নজরুল পালায়নি, মেনকি ফান্দা গ্রামের অন্যতম মাথা জহির মেম্বারকে ডাকতে গিয়েছিল। নজরুল জহির মেম্বারের নিতান্ত অনুগামী।

জহির মেম্বার খবর পেয়ে হাতির কাছে আসার আগে বন বিভাগ আর থানায় লোক পাঠিয়েছিল। তারপর হন্তদন্ত হয়ে নিজে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই যে অত বড় অনিষ্ট হয়ে গেছে, সে বিষয়টা তখনো জহিরের কানে পৌঁছেয়নি। জানলে সে চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে হাতির লাশের পাশে পাহারা বসাত, আর চোর-ছ্যাচ্ছড় ধরতে গাঁয়ে লোক ছড়িয়ে দিত। যখন বিষয়টা ওর কানে এসেছে, ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে গেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন প্রথম বিষয়টা খেয়াল করেছেন। একে একে বন বিভাগের দুর্গাপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা হায়দার আলী, স্থানীয় ভেটেরিনারি সার্জন তৌফিক ইজাজ, দারোগা মিজান উপস্থিত হলে আমজনতা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে।

এখন তো বন বিভাগের লোকজন হাতির দুরবস্থা দেখে হম্বিতম্বি শুরু করেছে। দারোগাও আসার পর থেকে একে বেঁধে নেন তো তাকে বেঁধে নেন। তাই দেখে মেহের মজা পেয়ে বড়দের লম্বা শরীরের আড়ালে দাঁড়িয়ে হাসছে। বৃদ্ধ আবদুল কুদ্দুস নাতির হাত ধরে টানে,

—অত হাসছ ক্যারে ছ্যাড়া, কত বড় পাপিষ্ঠ দেখছচ? একটা মরা আতিরেও ছাড়ছে না! মানুষ লুটা মানুষ জন্তু-জানোয়ারও লোটে! কত বড় হাপরে হাপ!

ছোট মেহেরের মাথায় ছোট বিষয়টা ঢোকে না। যুগপৎ বিস্ময়ের সঙ্গে দাদাকে সে প্রশ্ন করে,

—এইডা তো চুরি? হাপ কিবাই অয়? 

নাতির কথা শুনে আবদুল কুদ্দুস হেসে বলে,

—সব চুরিই হাপরে দাদা।

আবদুল কুদ্দুসের কথায় মেহের আবার হাসে,

—তয় তুমি যে বেইন্যা সম রান্নাঘরতে দুধ চুরি কইরা খাইচছ, হেইডাও হাপ।

নাতির কথা শুনে কুদ্দুসের মুখ আমচুরের মতো শুকিয়ে যায়। সে আর কথা খুঁজে না পেয়ে নাতির পাশ থেকে সরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকজনের গুনগুন শুনে দারোগা মিজান খেপে ওঠে,

—এমনিতে তো কারো গলায় রা নাই, পেছন ফিরলেই অত ফটফট করে কোন শালা!

জনতার মাঝে নিবিড় নির্জনতা নেমে আসে। দারোগা মিজান হাতির মুখের দিকে এগিয়ে ক্ষতির পরিমাণ পরখ করেন। ভেটেরিনারি সার্জন তৌফিক ইজাজ মিজান দারোগার দিকে তাকিয়ে বলে,

—পুরুষ হাতি। এই যে এর ওপরের দুটা কর্তন দাঁত শুঁড়ের দুপাশ দিয়ে বেরিয়ে ছিল। দুটা গজদন্তের কোনোটাই অক্ষত নেই। একটার তো পুরোটাই কেটে ফেলেছে। আরেকটা অর্ধেকটা আছে। দাঁত কাটতে গিয়ে শুঁড়ও কেটেছে। আর ওই পাশের কানের অংশও কাটা।

—কিভাবে মারা গেছে?

দারোগার প্রশ্ন শুনে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন এগিয়ে এসে জবাব দেন।

—ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য হাতির দেহের অভ্যন্তরের বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। এরপর ময়নাতদন্ত করে এর মৃত্যুর কারণ বলা যাবে। আমরা বেশি দেরি না করে মনে হয় এখনই কাজ শুরু করতে পারি।

সার্জন তৌফিক ইজাজ সাহেব বলেন,

—ভিসেরা নিয়ে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক রোগ গবেষণাকেন্দ্রে রিপোর্টের জন্য পাঠাতে হবে।

হাতিটার দাঁত, কান, শুঁড়ের কাটা অংশে তাকিয়ে দারোগা মিজান তর্জনী উঁচু করে হুংকার করে ওঠেন,

—কোন হারামির কাম রে! আজকা সব কয়টারে বাইন্দা নিয়া যামু। হাতির পাঁচ পা দেখছে, শালারা!

লোকজন জানে, দারোগা মিজান ফাঁকা আওয়াজ দেয় না। এলাকায় রটনা আছে; সে মন্ত্রী, এমপি মানে না। এলাকার উঠতি বা বর্ষীয়ান সব ধরনের নেতা তাকে সমীহ করে চলে। গেল সপ্তাহে খিজির চেয়ারম্যানকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিতে এসেছিল। চেয়ারম্যান সাহেব হাতে-পায়ে ধরে ছাড়া পেয়েছেন। দারোগা মিজান খুব কর্মনিষ্ঠ ও কঠিন মানুষ। কোনো জায়গায় কোনো অঘটন ঘটলে তিনি দ্রুততার সঙ্গে স্পটে হাজির হয়ে যান। যদিও আজ হাতি মরার খবর তিনি দেরি করে পেয়েছেন। আরো আগে খবর পেলে হয়তো এই অঘটন ঘটত না।

বন বিভাগের দুর্গাপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা হায়দার আলী হাতিটার দাঁতে-শুঁড়ে হাত বুলাতে বুলাতে প্রায় কান্নাজড়িত গলায় বলে,

—দারোগা সাহেব, আপনি বললে হাতিটারে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করি।

এখানে আসার আগে হায়দার আলী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। দারোগা মিজান অবশ্য জিডির আগেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে চলে এসেছেন। কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানাতে এখন তাঁরা দুজনই ফোনে কথা বলছেন। ফোনে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে দারোগা মিজান একে-ওকে জেরা করে ঘটনার কার্যকারণ বের করারও চেষ্টা করছেন। দারোগা মিজানের জেরার সামনে বিপর্যস্ত হারুন একটু তফাতে গিয়ে নজরুলের কানে কানে বলে,

—আমার লাহান পটকা মাস্টার অত্ত ভুইত্যামারা হাতি কিবা মারবোরে! ওর হায়ের তলাত চাহা খাইয়া কবে পেটের নাড়িভুঁড়ি বাইর অইয়া যাইত!

নিজের কথায় নিজে মজা পেয়ে ফিকফিক করে হাসে হারুন। তা দেখে নজরুলের গা জ্বলে।

—তোরে আতি মারার লাইগ্গা ধরত আইছে কেলা? তোরে ধরত আইছে আতির দাঁতের লাইগা। আতির দাঁতের দাম লাখ ট্যাহা।

নজরুল অসহিষ্ণু গলায় জবাব দিয়ে হারুনের কাছ থেকে সরে দাঁড়ায় আর মনে মনে গাল দেয়, হাগলচোদা। হাতিটার দাঁত, কান, শুঁড়ের কাটা অংশে তাকিয়ে নজরুলের মনের মধ্যে কী একটা অশান্তির বুদ্বুদ পাঁক খেতে থাকে। ভিড়ের মাঝে হেনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নজরুল চিৎকার করে,

—এইহানে রঙ্গ দেহস! যা, বাড়িত যা। চেরি মানুষ হইয়া রাস্তঘাটে রঙ্গ দ্যাহে!

নজরুলের ধমক শুনে হেনার বদলে হারুন ঘটনাস্থল থেকে খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। মরা হাতি লাখ টাকা সকাল থেকে শুনে আসছে হারুন। এইবার কথাটার মানে বুঝতে পেরে সে ভড়কে যায়। দারোগা মিজান হারুনের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ওর দুই পা যেন মাটির ভেতর দেবে যেতে থাকে।

—তুই হারুন না? কই ছিলি কালকা রাতে?

—খোদার কিরা, স্যার বাড়িত আছিলাম। এশার নামাজ পইড়া বাড়িত গেয়া হুইত্যা পড়ছি।

—কিরা কাটছ ক্যা? তোরে আমি চিনি নাই ভাবছস? তোর আকাম-কুকামের সব লিস্ট আমার কাছে আছে।

হারুন ঢোক গেলার চেষ্টা করে, কিন্তু গলার ভেতরটা আলজিব পর্যন্ত শুকনো লাগায় মুখ-চোখ বিকৃত হয়ে ওঠে ওর। হারুনকে নিশ্চুপ দেখে মিজান দারোগা বলে,

—চোখের দিকে তাকাইলেই বুঝি কার ভেতরে কী আছে। আমার হাত থেইকা কেউ রেহাই পায় নাই।

দারোগা মিজানের কাছে গিয়ে নেয়ামত খেঁক খেঁক করে হাসে। এই ভিড়ের মধ্যে কখন যে নেয়ামত এসে দাঁড়িয়েছে তা কারো চোখে পড়েনি। নেয়ামত উদ্ভ্রান্তের মতো হাতির চারপাশে দৌড়াতে থাকে। হাতির চারদিকে এক পাক ঘুরে এসে নেয়ামত চিৎকার করতে থাকে,

—মরা আতি লাখ ট্যাহা। মরা মানুষ দশ হাজার ট্যাহা। মরা আতি লাখ ট্যাহা...

নেয়ামতের কথা শুনে মিজান দারোগা চমকে ওঠে। তর্জনী আর মধ্যমার মাঝখানে ধরে থাকা সিগারেট টানতে ভুলে যায়। পাঁচ মাস আগে এই গ্রামেরই একটা গাছের ডালে নেয়ামতের মেয়ে কলির লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। নেয়ামত অভিযুক্তদের সঙ্গে আপস করেছিল। শেষ পর্যন্ত তাকেও প্রভাবশালীদের চাপে ধর্ষণসহ হত্যা মামলায় আত্মহত্যা মর্মে তদন্ত রিপোর্ট দিতে হয়েছিল।

নেয়ামতের চিৎকারে ঝিম ধরা জনতার একাংশ আড়মোড়া ভাঙে। নেতিয়ে পড়া ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ আবার গুঞ্জনে মুখর হয়ে ওঠে, মরা আতি লাখ ট্যাহা। এর পরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। মেনকি ফান্দার আকাশও বদলে যায় হুট করে। মেঘহীন স্থির আকাশে একটা থমথমে ভাব। কী এক অশুভ ইঙ্গিতে আবদুল কুদ্দুসের বুক কেঁপে ওঠে। এ কিসের আলামত?

ধীরে ধীরে আকাশের মতো কৌতূহলী জনতার মধ্যেও বিপুল পরিবর্তন ঘটে। দারোগা মিজান দৈবচয়ন পদ্ধতিতে অপরাধী শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার আগেই সেই আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটে যায়। ততক্ষণে হাতির বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করতে ব্যতিব্যস্ত থাকা বন বিভাগ আর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তারাও হাতের কাজ অসমাপ্ত রেখে উঠে দাঁড়িয়েছেন। যদিও তাঁদের অপরাধের ফিরিস্তি কেউ জানতে চায়নি। তবু বন বিভাগের দুর্গাপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা হায়দার আলী থতমত খেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকেন—মধুপুর বন বিভাগে চাকরি করাকালে যা যা হাপিস করেছেন তার বখরা তো ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে সব জায়গায়, এতে আবার অপরাধ কী? পাপই বা কোথায়? ওপরমহলের স্যাংশন থাকে যেসব কাজে, সেসব তো এ দুটির কোনোটায়ই ফেলা যায় না।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন কর্মজীবনের সততার ইতিহাস পুনঃপাঠ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই তাঁর নিশুর কথা মনে পড়ে। নিশু তাঁর স্ত্রী। অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণটা ওয়াশ করার সিদ্ধান্তে তাঁদের দুজনেরই সম্মতি ছিল। এত বছর পর সে কথা মনে পড়ায় মাহবুব হোসেন অদ্ভুত এক আবেগে পাশে দাঁড়ানো মনোয়ারের হাত খামচে ধরেন। মনোয়ার তখন ওর ডান হাতের ক্ষতটা আড়াল করতে গুটিয়ে রাখা শার্টের হাত ছাড়তে ছাড়তে আড়চোখে এদিক-সেদিক তাকায় আর মনে মনে ভাবে, কোনোভাবেই অর্ধেক দাঁতের লোভে রাতে আবার আসা ঠিক হবে না। যা পেয়েছে, তা-ই সাত বলদের দুধ। সে না নিলে সরকারি লোকজনই এসব হাপিস করত। মনোয়ার আপন মনে বিড়বিড় করে, ‘এই যে অহন অত বড় বড় কথা কইছে, তহন কি আর দাঁতসহ আতিরে কবর দিত? এহ, আবার হাপ আর অপরাধের হিসাব নেয়!’

অপরাধ কী? পাপই বা কী? সব অপরাধ কি পাপ? সব পাপ কি অপরাধ? প্রশ্নগুলো এত জড়াজড়ি করে থাকে যে এদের উত্তর পাওয়া মুশকিল হয়। তাই প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও কেউ উত্তর খোঁজে আবার কেউ খোঁজে না। ঠিক এভাবেই বড় বড় গাছের কারুকার্যময় ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে সরকারি লোকজনের কাজ-কারবার দেখতে থাকা জহির মেম্বার, নফর, মানিক, জোলা কাশেম, ফরিদ, জিকির থেকে শুরু করে মেনকি ফান্দার প্রতিটি মানুষ তাদের কৃত অপরাধ আর পাপের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। তারা আধবোজা চোখে নিজেদের দৃষ্টিসীমানায় দেখতে থাকে নিজেদের পাপ আর অপকর্মের ফিরিস্তি। নিজেকে সবচেয়ে বেশি পুণ্যবান মনে করা মহির শেখও নিজের অপকর্মের নিশানা দেখে বিস্ফোরিত চোখে ঊর্ধ্বাকাশে তাকিয়ে থাকে।

আকাশের রুগ্ণ রূপে এখন চারপাশ আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। যেন পৃথিবী উপচানো অপরাধ কিংবা পাপ আকাশের ঠিকানায় পৌঁছেছে। ভিড়ের মধ্যে ওরা কেউ পরস্পরের চেহারা দেখতে পায় না। অল্পবিস্তর দিশাহারা ভাব লেগে থাকে তাদের চোখেমুখে। অতঃপর পাপের ভারে কালো হয়ে থাকা আকাশে ধীরে ধীরে মেনকি ফান্দার মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অপরাধ আর পাপের খতিয়ান বিন্দুর মতো মিলিয়ে যায়।



মন্তব্য