kalerkantho


প্রকৃতির শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

জাহিদ মুস্তাফা   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রকৃতির শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

ছবি : কাকলী প্রধান

একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা একাত্তর বছর বয়সে চলে গেলেন আমাদের সমকালীন চারুশিল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। ১৯৪৭ সালের ১৯ মার্চ খুলনার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম। তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়েছিল ঢাকার কামরুননেসা স্কুলে। পরে খুলনায় পাঠ নেন।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় দেশি-বিদেশি শিল্পবোদ্ধাদের চমকে দিয়েছিলেন ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তাঁর সৃজন সমাহার দিয়ে। পরিত্যক্ত গাছের শেকড়, ডাল আর তুচ্ছ অতিসাধারণ উপকরণকে যুক্ত করে চেনা আদল তৈরি করে শিল্পে অপ্রচলিত একটি ধারাকে নতুন আঙ্গিকে তুলে এনেছেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক ভাস্কর্য শিল্পশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তিনি পাননি। তিনি স্বশিক্ষিত অভিজ্ঞতালব্ধ দৃশ্যমানতা অবলোকন ও বুঝেশুনে প্রাকৃতিক রীতির অনুসারী শিল্পী এবং ব্যতিক্রমধর্মী এক ভাস্কর। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর আবেগ-অনুভূতি, শারীরিক যাতনার বাস্তবতা, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা স্পর্শ করে তাঁর শিল্পবোধ তৈরি করেছেন। নন্দন-চেতনায় প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সৃষ্টি প্রাচুর্যের অনুপম ও চমকপ্রদ সব আলেখ্য।

একাত্তর-পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের বাস্তবতা, বিষণ্নতা ও দুঃখবোধ তাঁকে উচ্ছিষ্ট, অত্যাচারিত ও অবহেলিত করে তুলেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে ও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তির অত্যাচার, সামাজিক অবহেলার সেই তীব্র কষ্ট থেকে উঠে আসা অসামান্য শিল্পবোধ ও শিল্পসত্তা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সৃজনে। বাতিল ও পুরাতন গাছের ডাল, গুঁড়ি, শেকড়, লতা-পাতা, পোড়া কাঠ, শ্যাওলাযুক্ত বাঁশের  অংশ, বটের ঝুরি, পরিত্যক্ত হাঁড়ি-কলসি, ধাতব টুকরা যেন তাঁর গভীর যাতনাময় জীবনের অংশ। এসব নিয়েই ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর অভিনব শিল্পযাত্রা।

আমরা সাধারণ চোখে টের পাই না বটে, তবে শিল্পীর চোখ যেকোনো অকেজো বস্তুর মধ্যে মানুষ কিংবা জীবজন্তুর অবয়ব ও গঠনাকারের কিছুটা ছায়া, সাদৃশ্য বা মিল খুঁজে পান। সেটাকে পরম যত্নে কুড়িয়ে নিয়ে তার ভেতর থেকে শিল্পগুণ আবিষ্কার করাটাই তাঁর আরাধ্য। তিনি এভাবেই মূল্যহীনকে অমূল্য করে সবার সামনে তুলে ধরেছেন তাঁর স্থাপনা ও ভাস্কর্যে। ঘরের দেয়াল, বসার ঘর, আহার কক্ষ, বারান্দা কিংবা বাগানের সামনে নিসর্গ রচনা, ঝরনা বা ফোয়ারার বিন্যাস—এসব শিল্পবস্তু তাঁর নতুন শিল্পগুণের পরিচায়ক হয়ে দেখা দেয়।

তাঁর সৃজন উন্মুক্ত বা আবৃত পরিসরে স্থানান্তরিত বা স্থাপিত হয়ে উজ্জ্বল অস্তিত্বে প্রকাশিত হয় এবং দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, সুখানুভূতি সৃষ্টি করে। এখানেই ফেরদৌসীর শিল্পজীবনে সৃষ্টিশীলতার সফলতা ও সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৯৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ ও আর্টিজান আয়োজিত দুই দিনের এক আর্টক্যাম্পে বরেণ্য শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবু তাহের, কালীদাস কর্মকার, অলকেশ ঘোষ, রণজিৎ দাস ও ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর সঙ্গে আমিও অংশগ্রহণ করি। সেখানে সবুজবেষ্টিত ক্যাম্পাসে আমরা যখন নানা বিষয় নিয়ে ছবি আঁকছি, তখন প্রিয়ভাষিণী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নানা প্রাকৃতিক উপাদান সংগ্রহে ব্যস্ত থাকলেন। পরে সেগুলো দিয়ে তিনি একাধিক নন্দিত ভাস্কর্য গড়েছেন, যা সবার কাজের চেয়ে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল।

তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৮ সালে যশোরে চারুপীঠের কর্ণধার সহপাঠী ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামীম ও শিল্পী হিরণ্ময় চন্দের কল্যাণে। তখনো তিনি ভাস্কর পরিচয়ে পরিচিত হননি। ব্যক্তিগত আগ্রহে গৃহসজ্জার জন্য সৃজন করেন যে ভাস্কর্য, সে দিনই তাঁর শিল্পীমনের পরিচয় পেয়েছি। পরে তিনি নিজের শিল্পভাবনাকে জনসম্মুখে মেলে ধরেন।  প্রথম প্রদর্শনী ১৯৯১ সালে আয়োজন করে চারুপীঠ যশোর পাবলিক ইনস্টিটিউটে। ১৯৯১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৩টি একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ব্যক্তিগত জীবনে একজন সংগ্রামী, সাহসী, লড়াকু মনোবৃত্তি ও পোড়খাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অসামান্য মানুষ। তিনি তাঁর লক্ষ্যে অবিচল ও অকুতোভয়। তিনি ত্যাগী, গুণী ও নিরলস ভাস্কর্য শিল্পকর্মী। একদিকে তিনি যেমন সন্মানিত ও শ্রদ্ধেয় হয়েছেন, অন্যদিকে গুণীজনদের মর্যাদা দিয়েছেন। আপন আলোয় তিনি মানুষের কাছে সম্মানিত এক আলোকবর্তিকা।

২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেঙ্গল গ্যালারি শিল্পালয়ে অন্তত তিনবার এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে গ্যালারি শিল্পাঙ্গন ঢাকায় তাঁর একক প্রদর্শনী হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত বিভিন্ন জাতীয় ও দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। মর্যাদাপূর্ণ অনেক দলীয় প্রদর্শনীতেও তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। চারুশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।

ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর রয়েছে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। গত ৬ মার্চ মারা যান এই গুণী শিল্পী। আমরা তাঁর বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করছি।


মন্তব্য