kalerkantho


শুভসংঘের ব্যতিক্রমী আয়োজন

পুঁথি পাঠের আসর

জাহাঙ্গীর হোসেন   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পুঁথি পাঠের আসর

বাংলার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘পুঁথি পাঠের আসর’-এর আয়োজন করেছিল রাজবাড়ী জেলা শুভসংঘ

বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পুঁথি পাঠ। একসময় রাজ্যসভাগুলোতে মহারাজাদের সামনে বসত পুঁথি পাঠের আসর। পুঁথি পাঠকারীর সুরের মূর্ছনা, উপস্থাপনা আর গল্পের বৈচিত্র্যের কারণে মাহারাজাসহ উপস্থিত দর্শকরা কখনো হাসত, আবার কখনো বা কাঁদত। বয়োবৃদ্ধ অনেকের স্মৃতিতে আজও পুঁথি পাঠ ও পুঁথি পাঠের আসরের সেই রোমাঞ্চ জ্বলজ্বল করছে। তবে বয়সে তরুণ এবং স্কুল-কলেজেপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পুঁথি পাঠ সম্পর্কে নেই তেমন কোনো ধারণা। তারা জানে না একসময়কার এই উর্বর সংস্কৃতির খবর। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুঁথি পাঠ সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা দিতে এবং হারিয়ে যেতে বসা এ সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে শুভসংঘ রাজবাড়ী জেলা শাখার উদ্যোগে ‘পুঁথি পাঠের আসর’-এর আয়োজন করা হয়েছিল।

গত ১৭ জানুয়ারি বুধবার দুপুরে রাজবাড়ী জেলা শহরের শেরেবাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজনের শুরুটা ছিল একটু ভিন্ন। ছাত্রীরা পুঁথি পাঠ কী বিষয় তা-ও জানে না। শিক্ষকরা তাদের বসতে বলেছেন, তাই তারা বসেছে; কিন্তু আগ্রহ ছিল একেবারেই কম। নিচুগলায় তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিল। তখনই তাদের পুঁথি সম্পর্কে ধারণা প্রদানপূর্বক বক্তব্য প্রদান করেন শুভসংঘ রাজবাড়ী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ মণ্ডল, কালের কণ্ঠ’র রাজবাড়ী প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর হোসেন, শেরেবাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তপন কুমার পাল। এরপর পুঁথি পাঠকারী ও গবেষক এথেন্স শাওন শুরু করেন কথা। আর কথার ফাঁকে ফাঁকে চলে পুঁথি পাঠ। এসব শুনে মুগ্ধ নয়নে স্বল্প সময়ের মধ্যেই উপস্থিত শুভসংঘের সদস্য হাফিজুর রহমান, কাওছার আহম্মেদ রিপন, সহকারী শিক্ষক দিলারা বানু, চায়না সাহা, মাহফুজা খানম লাকি, মিজানুর রহমান ইকবালসহ অন্য শিক্ষক ও ছাত্রীরা বেশ উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের করতালিতে ও আনন্দ প্রকাশে পুরো মাঠ মুখরিত হয়। তাঁরা এথেন্স শাওনকে একের পর এক অনুরোধ করেন পুঁথি পাঠ করতে।

বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী শামিমা আক্তার জানান, প্রথমে মনে করেছিলাম পুঁথি পাঠ—সেটা আবার কী? তবে এখন বুঝলাম, এটা আমাদের চিরাচরিত বাংলার আরেকটি রূপ। বাদ্যযন্ত্র ছাড়াও যে মনোমুগ্ধকর আয়োজন হয় এবং মনোযোগ দিয়ে সে আয়োজন শ্রবণ করা যায়, তা এই পুঁথি পাঠ করার মধ্য দিয়ে আমরা জানতে পারলাম। আমাদের সবাই এখন জানল, এটা বাংলা সংস্কৃতির একটা অংশ এবং আকর্ষণীয় ব্যাপার। যে কারণে তারা বারবার পুঁথি পাঠকারীকে অনুরোধ করছিল আরো কয়েকটি পুঁথি পাঠ করার জন্য।

শিক্ষক তপন কুমার পাল বলেন, বর্তমান শিক্ষার্থীরা পুঁথি পাঠ সম্পর্কে কিছুই জানে না। এটাও যে একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার এবং বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা তারা জানত না। শুভসংঘ পুঁথি পাঠের মতো হারিয়ে যেতে বসা একটি বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করেছে। যার অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের কয়েক শ শিক্ষার্থীর মধ্যে বাংলা সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি তুলে ধরেছে। এটা শুধু এই বিদ্যালয়েরই নয়, দেশের সব স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের অবগত করতে হবে। হারাতে বসা পুঁথি পাঠের আসর ফিরিয়ে আনতে হবে। শুভসংঘের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ মণ্ডল বলেন, শুভসংঘ বাংলা সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। যার অংশ হিসেবে এই পুঁথি পাঠের আসরের আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আজকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হারাতে বসা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারল। আমাদের চেষ্টা কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। আমরা পুঁথি পাঠের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেলার অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে দেব।

 


মন্তব্য