kalerkantho

পটিয়া ♦ বোয়ালখালী ♦ বাঁশখালী

বেশির ভাগ সময় ভোটকেন্দ্র ফাঁকা

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বেশির ভাগ সময় ভোটকেন্দ্র ফাঁকা

বাঁশখালী কাথারিয়া-বাঘমারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র সকাল সাড়ে ১১টায় । ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী, পটিয়া ও বোয়ালখালী এবং কক্সবাজারের পেকুয়ায় রবিবার দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র ছিল দিনের বেশির ভাগ সময় ভোটার শূন্য।

বাঁশখালী থেকে উজ্জ্বল বিশ্বাস জানান : প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীর কর্মীদের পোস্টার, ব্যানার ও ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে উৎসব আমেজ থাকলেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। যে কারণে প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্বে নিয়োজিত চৌকিদার, দফাদার, আনসার, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গল্প করে আর চা-পানে অলস সময় কাটিয়েছেন।

সকাল সাড়ে নয়টায় পুকুরিয়া নাটমুড়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গেলে প্রিসাইডিং অফিসার মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘ভোটারের উপস্থিতি খুবই কম। ওই সময় ৩৮৫৯ ভোটের মধ্যে মাত্র ১৬৭ ভোট কাস্ট হয়েছে।’

ওই কেন্দ্রের বাইরে থাকা স্থানীয় ইউপি সদস্য ফরিদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে চান না। মহিলারা ভোটকেন্দ্রে আসতে

চা-পানের আবদার করে। প্রার্থীরা ওইসব ব্যবস্থা না করায় মহিলা ভোটাররা খুবই কম ছিল।’

সকাল ১১টায় পূর্ব রায়ছটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার মো. নুরুল আলম বলেন, ‘২২৫২ ভোটের মধ্যে ১১৫ ভোট কাস্ট হয়েছে।’ সকাল সাড়ে ১১টায় খানখানাবাদ রায়ছটা কোস্টাল কমিউনিটি সেন্টার ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার বশির উদ্দিন আহমদ কনক বলেন, ‘৩৩৩৯ ভোটের মধ্যে মাত্র ৩২৫ ভোট কাস্ট হয়েছে।’ পৌনে ১২টায় ওই কেন্দ্রের পাশে বি বি চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘২৪১৪ ভোটের মধ্যে ৪১২ ভোট কাস্ট হয়েছে।’ ওই সময়ে কেন্দ্র ছিল ভোটার শূন্য। ১২টা ১০ মিনিটে বাহারছড়া রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার সঞ্জীব বড়ুয়া বলেন, ‘২৫৫৮ ভোটের মধ্যে ৫৫৭ ভোট কাস্ট হয়েছে।’ পৌনে ১টায় সরল ইউনিয়নের জালিয়াঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার প্রদীপ দত্ত বলেন, ‘২৬৮৭ ভোটের মধ্যে ৪৫০ ভোট কাস্ট হয়েছে।’

বাঁশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোর নজরদারিতে থাকায় দুষ্কৃতকারীরা কোনো ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারেনি।’

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, ‘সকল স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার, চৌকিদার-দফাদাররাসহ সকলে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করায় নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে। বিশেষ করে প্রার্থীদের একে অপরের প্রতি সম্প্রীতির কারণেই সফল নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।’

বোয়ালখালী থেকে কাজী আয়েশা ফারজানা জানান : সংঘাত-সহিংসতা ছাড়াই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলার ৭৭ কেন্দ্রে একযোগে চলে ভোটগ্রহণ। তবে কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল কম। প্রায় কেন্দ্রে ভোটারদের কোনো সারি দেখা যায়নি।

জ্যৈষ্ঠপুরা ইসলামিয়া হামিদিয়া মাদরাসা ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা লিয়াকত আলী জানান, ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও যাঁরা এসেছেন তাঁরা ভোট দিয়ে নিরাপদে ফিরে গেছেন। সকাল ১০টা-১২টার মধ্যেই বেশির ভাগ ভোট পড়েছে। এর পর থেকে প্রায় ফাঁকা ছিল কেন্দ্র।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেষ্ট থাকায় অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি জানিয়ে সহকারী রিটার্নিং ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল দিনভর। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন। বিকেল চারটায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়।’

বোয়ালখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে লড়েন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী নুরুল আলম (নৌকা), জাতীয় পার্টি সমর্থিত দিদারুল আলম ফজু (লাঙল), স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল কাদের সুজন (আনারস), এস এম নুরুল ইসলাম (দোয়াত কলম), সৈয়দুল আলম (মোটরসাইকেল)। এ ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান পদে চারজন ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এদিকে জাল ভোটের অভিযোগ এনে দুপুরে নির্বাচন বর্জন করেছেন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী জাসদ নেতা সৈয়দুল আলম (মোটরসাইকেল)। তিনি বোয়ালখালী প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রে নৌকার কর্মী-সমর্থকরা নৌকায় ভোট দিতে ভোটারদের হুমকি-ধমকি দেন। ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকায় ব্যাপকভাবে জাল ভোট দিয়ে জনগণের মূল্যবান রায়কে কলঙ্কিত করা হয়েছে।’

এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দায়িত্বরতদের বারবার বলা সত্ত্বেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান তিনি।

খাজা গরীবে নেওয়াজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ২০ জন ব্যক্তিই দিনভর ভোট প্রদান করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জাল ভোট না হলে আমি নির্বাচিত হতাম। তারা আমার নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে।’

পটিয়ার জিরি আমানিয়া লোকমান হাকিম প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র বেলা ১টায়।         ছবি : কালের কণ্ঠ

পটিয়া থেকে আবদুল হাকিম রানা জানান : শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হলে বিভিন্ন কেন্দ্রে লাইন ধরে ভোটারদের ভোট দিতে দেখা যায়। তবে বেলা বাড়তে শুরু করলে ভোটার উপস্থিতিও কমতে থাকে। বিভিন্ন কেন্দ্রে জাল ভোটের অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে অবশ্য তাঁদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারা নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটলেও পটিয়ার চরকানাই হাই স্কুল কেন্দ্রে জোরপূর্বক দুষ্কৃতকারীরা ব্যালটে সিল মারার চেষ্টা করলে নির্বাচন কমিশন এ কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। বেলা ২টা নাগাদ এ কেন্দ্র থেকে সব মালামালসহ দায়িত্বরতদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় বলে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ইউএনও হাবিবুল হাসান জানান।

উত্তর গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার পীযুষ কান্তি শীল বলেন, ‘এখানে মোট ভোটার ৪৫১২। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ ভোটগ্রহণ হয় প্রায় ৩০০।’

ওই কেন্দ্রে দক্ষিণ জেলা যুবলীগ সভাপতি আ ম ম টিপু সুলতান চৌধুরী বলেন, ‘সকাল থেকে নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

কেলিশহর ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রে সকাল ১০টায় পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিজন চক্রবর্তী বলেন, ‘সকাল থেকে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। এখানে কেউ কারো ওপর প্রভাব বিস্তার করছে না।’

সকাল ১১টায় কেচিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, জাল ভোট নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ভোটারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া নিয়ে ভোটগ্রহণ সাময়িক বন্ধ থাকে। এ সময় প্রিসাইডিং অফিসার বিশ্বজিৎ দত্ত জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজ আহমদের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধাওয়া করলে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ কেন্দ্রেরই ভোটার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ডা. তিমির বরণ চৌধুরী কেন্দ্রে এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য অনুরোধ জানালে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

বেলা ১২টায় বড়লিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, তরুণ ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। তরুণ ভোটার লিটন বলেন, ‘জীবনে প্রথম ভোট দিলাম। খুব ভালো লাগছে।’ ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার পুলিন বিহারী জানান, ৩৪৬৮ ভোটের মধ্যে ১৬০০ ভোট কাস্ট হয়েছে। পৌনে ১টা নাগাদ জিরি আমানিয়া লোকমান হাকিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভোটার উপস্থিতির হার নগণ্য। জানতে চাইলে ওই স্কুলের সভাপতি লোকমান হাকিম বলেন, ‘এখানে সকালেই অধিকাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।’

এর পর জিরি বিবেকানন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা  যায়, ২০৫৪ ভোটের মধ্যে প্রায় ৩০০ ভোট গ্রহণ হয়েছে। জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানান, এ কেন্দ্র থেকে বিজিবি কৃষ্ণ নাথ মাস্টার ও জাহাঙ্গীর আলমকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর ভোটার উপস্থিতি কমে যায়। পরে অবশ্য তাঁদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হাবিবুল হাসান জানান, পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনসহ প্রশাসনের কড়া সতর্কতার কারণে কোনো ধরনের অঘটন ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

মন্তব্য