kalerkantho

বোয়ালখালী

আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থী জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

কাজী আয়েশা ফারজানা, বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম)   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থী জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

বাঁ থেকে : নুরুল আলম, আবদুল কাদের সুজন ও দিদারুল আলম ফজু (উপরে) এবং সৈয়দুল আলম, শাহেদা আকতার শেফু ও সুপর্ণা ভঞ্জ।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের নির্ঘুম প্রচারে বোয়ালখালীতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার সর্বত্র ভোটের আমেজ বিরাজ করছে। তবে দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীকে ঠেকাতে ‘মরিয়া’ আওয়ামী লীগ। এতে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার এক শীর্ষ নেতার একতরফা সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান পদে একজনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ওই অভিযোগে মনোনয়নবঞ্চিতদের মধ্যে আট মনোনয়নপ্রত্যাশী এ বিষয়ে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লিখিত অভিযোগও করেন।

পরে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলমের পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে শক্ত অবস্থান করে নেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজন। ফলে দুই প্রার্থীর পক্ষে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়েছে ভোটের মাঠেও।

ইতোমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাঁর নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা ও  প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগে উত্তেজনাও বিরাজ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জেলার শীর্ষ এক নেতা দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিলেও উপজেলা পর্যায়ের বড় একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে মাঠে কাজ করছে। এতে দলের নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। জেলার নেতা নির্বাচনকে প্রভাবিত করায় নির্বাচনে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরাও সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভোটরদের দরজায় ছুটে চলছেন। মাইকিং, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন আর লিফলেটে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রবেশদ্বার কালুরঘাট থেকে শুরু করে উপজেলার যেখানেই চোখ যায় সেখানেই প্রার্থীদের পোস্টার আর ব্যানার।

আগামী ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে উপজেলা নির্বাচনে বোয়ালখালীতে ভোটগ্রহণ। এখানে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম (নৌকা), নাগরিক কমিটির মনোনীত প্রার্থী এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজন (আনারস), মহানগর জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম (দোয়াত-কলম), জাতীয় পাটি মনোনীত প্রার্থী দিদারুল আলম ফজু (লাঙল) ও জাসদের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দুল আলম।

অপরদিকে নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান বিএনপির মহিলা বিষযক সম্পাদিকা শাহেদা আকতার শেফু (ফুটবল), প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান অশোক কুমার ভঞ্জের স্ত্রী সুপর্ণা ভঞ্জ (কলসী) ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আরা (প্রজাপতি)।

পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন রিদুয়ানুল হক টিপু, মো. সেলিম উদ্দিন, এস এম সেলিম ও এম এস করিম।

ভোটাররা জানান, নির্বাচনের প্রচারণা জমে উঠলেও ভোট নিয়ে রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। চলছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। প্রশ্ন ওঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও।

পূর্ব গোমদণ্ডীর ভোটার ও পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল বিশ্বাস বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। এ পরিবেশ ধরে রাখতে প্রশাসন যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ থাকে তাহলে ভোটে বড় চমক আসবে। তাই ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।’

কধুরখীলের ভোটার গৃহবধূ ইয়াছমিন আকতার বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে ফেরত আসতে  হয়েছে। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনেও যদি ওই পরিবেশ বজায় থাকে তাহলে ভোটকেন্দ্রেই যাব না।’

চরণদ্বীপের ভোটার মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এবার নির্বাচনে প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে জনগণ। ভোটের আগে যেভাবে বিভিন্ন জায়গায় হট্টগোল হচ্ছে তাতে রক্তপাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদি কোনো প্রার্থীর পক্ষে কেউ প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে তাহলে বড় ধরনের সংঘাত হতে পারে।’

উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী মো. জাহেদ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনে এবার ভোট দেওয়া নিয়ে অনেকটা ভয় আর সংশয় আছে। জনগণ এবার তরুণ ও নবীনকে নির্বাচিত করতে আগ্রহী।’

রিকশাচালক হারুন মিয়া বলেন, ‘যদি ভোট হয় তাহলে সুখে-দুখে যাঁকে পাবো তাঁকেই ভোট দেব। পকেট ভারী না করে যিনি বোয়ালখালীর উন্নয়নকে প্রাধান্য দেবেন তাঁকেই ভোট দেব। যিনি মানুষের জায়গা দখল, থানায় রাতের আঁধারে দালালি করেন নিরীহদের ফাঁসিয়ে দেন তাঁকে বয়কট করব।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য মঈনউদ্দিন খান বাদল বলেন, ‘কেউ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে বোয়ালখালীর জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দেবে। সরকার চায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। প্রার্থীদের জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘উৎসবহীন ভোট, ভোট নয়। নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন বদ্ধপরিকর। তাই সকল প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে জনগণের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।’

মন্তব্য