kalerkantho

বিদায় আইয়ুব বাচ্চু

ভালোবাসার ঢল

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ভালোবাসার ঢল

চট্টগ্রাম নগরের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ময়দানে শোকার্ত মানুষ। ছবি : রবি শংকর

বাহার উদ্দিন চৌধুরীর বয়স প্রায় ৬২ বছর। কয়েক বছর আগে আনসার অ্যাডজুটেন্ট পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। ফেনীর বাসিন্দা বাহার নগরের আকবরশাহ থানা এলাকায় থাকেন। শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটায় তিনি প্রবেশ করেন জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে। এখানেই রাখা আছে তাঁর প্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ। শেষবারের মতো তিনি প্রিয় শিল্পীকে দেখবেন-এই মনোবাসনায় দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ালেন। প্রায় ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে তিনি প্রিয় শিল্পীর নিথরমুখ দেখার সুযোগ পান। 

কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে বাহার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি আইয়ুব বাচ্চুর ভক্ত। তাঁর প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর থেকেই তাঁর গান শুনি। অবসর জীবনে এসেও তাঁর গান শুনতাম। টিভির অনুষ্ঠানগুলো দেখি। তাই প্রিয় শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছি।’

তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধ বয়সে প্রায় ৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে শিল্পীকে দেখেছি। এতে শারীরিকভাবে কষ্ট হয়েছে। এর পরও মনে প্রশান্তি পেয়েছি। তবে তাঁকে হারানোর কষ্ট আছে বুকে। এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবেন বুঝিনি। বয়সে আমার চেয়েও ছোট হবে কয়েক বছর।’ শিল্পীর নিথরমুখ দেখে ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’ গানটির কথাই বাহার উদ্দিনের মনে পড়েছে বলে জানালেন।

ব্যাংকার রায়হানুল কবির সুমনের বয়স ৪২-৪৩ বছরের মতো। তিনিও এসেছেন জানাজায় অংশ নিতে।

বললেন, ‘কিশোর বয়স তথা ১৯৯২ সাল থেকে আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনছি। তাঁর কনসার্টে যেতাম। সর্বশেষ গত সপ্তাহে জিইসির মোড় এলাকায় পিএইচপির একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তিনি। সেই কনসার্টেও গান শুনতে গিয়েছিলাম। প্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে সুরের মূর্ছনায় আর নিজকে হারাতে পারব না-এটাই কষ্টের। বড় অসময়ে চলে গেলেন তিনি।’

গানের রাজত্বে তাঁর মতো ‘রাজা’ আর জন্ম নেবে কিনা সন্দেহ তাঁর। প্রিয় শিল্পীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুমন আইয়ুব বাচ্চুর সেই গানটি স্মরণ করলেন, ‘এখন অনেক রাত / খোলা আকাশের নিচে / জীবনের অনেক আয়োজন / আমায় ডেকেছে / তাই আমি বসে আছি / দরজার ওপাশে / দরজার ওপাশে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শাহেদ হাসান (২০) এসেছেন বাবার সঙ্গে। বাবা-ছেলে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলেন জানাজায়। হাসান জানালেন, তিনি আইয়ুব বাচ্চুর গান নিয়মিত শোনেন। অল্প বয়সে আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীর ভক্ত কীভাবে হলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান জানালেন, ‘আমার বাবা আইয়ুব বাচ্চুর গানের ভক্ত। তাই বাসায় তাঁর গানের অনেক সিডি ছিল। কিশোর বয়স থেকেই বাসায় তাঁর গান শুনতে শুনতে শিল্পীর প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়। এরপর থেকেই ভক্ত।’

বাহার উদ্দিন চৌধুরী, রায়হানুল কবির সুমন ও শাহেদ হাসান-তিন প্রজন্মের কাছেই সমান প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু। সেই অর্থে, জনপ্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রিয় শিল্পী। কারণ, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি যখন ছাত্র ছিলেন তখন থেকে গানের প্রেমে পড়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। আর পেশাদার শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন ১৯৭৮ সালে। সেই থেকে আইয়ুব বাচ্চুর গানের জগতে বিচরণ। আর নব্বইয়ের দশক পরবর্তী সময় থেকে তিনি গানের রাজ্যে সোনালি সময় পার করেছিলেন। সেই কারণে, তিন প্রজন্মের কাছে সমান প্রিয় এই গুণীশিল্পী।

শনিবার সর্বশেষ জানাজায় প্রিয় শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন হাজারো মানুষ। কিন্তু তাঁদেরই অনেকে জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তাঁদের একজন শুলকবহর এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল কবির চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘জানাজার অনেক আগে এসেছিলাম প্রিয় শিল্পীকে দেখতে এবং জানাজা পড়তে। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ায় জানাজায় অংশ নিতে পারিনি।’ প্রিয় শিল্পীর জানাজায় অংশ নিতে না পারে ভক্তদের মনে যেন আরেকবার উচ্চারিত হয়েছে আইয়ুব বাচ্চুর সেই গান, ‘সুখেরই পৃথিবী/ সুখেরই অভিনয় / যত আড়ালে রাখো / আসলে কেউ সুখী নয় / নিজ ভুবনে চিরদুঃখী / আসলে কেউ সুখী নয়।’

জাহিদুল কবির সুমনের মতো জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি আরো অনেকে। আবার অনেক ভক্ত দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শিল্পীর মুখ শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাননি। মূলত সময় স্বল্পতার কারণে সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসন সেই সুযোগ দিতে পারেনি। যদিও বিকেল থেকে কয়েক সারিতে বিভক্ত হয়ে হাজার হাজার ভক্ত শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখেছেন। কিন্তু অগুনতি ভক্তকুলের অনেককে সেই সুযোগ দেওয়া যায়নি সময়ের অভাবে। কারণ, বাদে আসর শিল্পীর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে থাকতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ গানের মতো জনপ্রিয় সব গান গেয়ে। আর বাংলাদেশের তিন প্রজন্ম গতকাল শনিবার বিকেলে শেষ জানাজায় ‘কষ্ট’ স্বীকার করেই জড়ো হয়েছিলেন শিল্পীকে বিদায় জানাতে। তবে তিন প্রজন্মের শ্রোতাদের ‘কষ্ট’ ছিল প্রিয় শিল্পীকে হারানোর। সেই কারণে হয়তো ভক্তদের মনে ‘কষ্ট’ ছিল। ভালোবাসার সেই ‘কষ্ট’ বুকে নিয়েই ভক্তরা শেষ বিদায় জানিয়েছেন প্রিয় গুণীশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে।



মন্তব্য