kalerkantho


৩ মাস পর চট্টগ্রামে ফের মিলছে আমদানি সনদ

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



৩ মাস পর চট্টগ্রামে ফের মিলছে আমদানি সনদ

তিন মাস বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম থেকেই আবার আমদানি সনদ বা আইপি দেওয়া শুরু হয়েছে। কৃষিজাত পণ্য আমদানির ফলে দেশের উদ্ভিদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেটি নিশ্চিত করতে এই সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

এতদিন এই সনদ চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ দপ্তর থেকে দেওয়া হলেও গত ২০ জুন থেকে হঠাৎ এটি বন্ধ করে চট্টগ্রামের বদলে ঢাকা থেকে দেওয়া শুরু হয়। এর ফলে শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নয়, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। পরে চট্টগ্রাম চেম্বার উদ্যোগী হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথে বসে বিষয়টি সমাধান করে। এরপরই কৃষি মন্ত্রণালয় গত ১৭ সেপ্টেম্বর এই সংক্রান্ত আদেশ দেয়। এর পর থেকে চট্টগ্রাম থেকেই সনদ মিলছে।

সনদ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের উপ পরিচালক জহিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয় এই আমদানি সনদ অনুমতি প্রদানের ক্ষমতা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও মংলা সমুদ্রবন্দরে কর্মরত উপ-পরিচালককে দিয়েছেন। এই সংক্রান্ত নির্দেশনা ১৭ সেপ্টেম্বর জারি ও কার্যকর হয়েছে। ফলে সেদিন থেকেই আমরা সনদ অনুমতির ক্ষমতা পেয়ে যাই।’ তিনি জানান, গত ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর দুদিনে ৮টির মতো সনদ প্রদান করা হয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিমাসে গড়ে ৩০০ সনদ ইস্যু করলেও নতুন আদেশের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানে না। এজন্য আবেদন কম জমা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের ভোগান্তির বিষয়টি জানার পর আমি সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠকে বসে কী কারণে এবং কোথায় সমস্যা তা চিহ্নিত করি। এর পর গত সপ্তাহে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রীর সাথে সরাসরি দেখা করে আমাদের ভোগান্তির বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হই। তারা দুজনেই একমত হওয়ার পর নতুন এই নির্দেশনা জারি করেন। চট্টগ্রাম চেম্বার সবসময় তৃণমূল ব্যবসায়ীদের কথা বলে এটিই তার প্রমাণ।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের মোট আমদানি পণ্যের ৯২ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়। আর কৃষিজাত পণ্যের ৮৭ ভাগই আমদানি হয় দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর দিয়ে। বিগত ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত কৃষিজাত পণ্যের আমদানি অনুমতিপত্র (আইপি) দেওয়া হত উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র ঢাকা থেকে। এতে চট্টগ্রাম-ঢাকা দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে অনেক সময় লাগত। সময় লাঘবে চট্টগ্রাম চেম্বার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জোর দাবি ও তদবিরের কারণে ২০০২ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকেই আইপি দেওয়ার নিয়ম চালু হয়।

এই কাজে জড়িত একাধিক সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী বলছেন, আমদানি অনুমতিপত্র চট্টগ্রাম থেকে সরবরাহ দেওয়া হলেও অনুমতি দেওয়া হত ঢাকা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে। আমদানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী যাবতীয় কাগজপত্র চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রে জমা দিতেন। আর সেই কাগজপত্র যাচাই করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতেন চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। ঢাকা থেকে সেগুলো অনুমোদন হয়ে চট্টগ্রামে ফেরত আসত। আর চট্টগ্রাম থেকেই অনুমোদনের কপি সংগ্রহ করতেন আমদানিকারকের প্রতিনিধিরা। এই কাজটি করতে গিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ব্যাপক আর্থিক লেনদেন করতেন বলে অভিযোগ ওঠে।

পরে ২০১৫ সালে বিদেশ থেকে তুলা আমদানির একাধিক চালানে জালিয়াতি ও ঘষামাজা করে মান যাচাই ছাড়া ছাড়পত্র প্রদানের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি তদন্ত করতে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তদন্ত দল চট্টগ্রাম আসে। তদন্ত শেষ করে যাওয়ার আগে রেজিস্ট্রারে চট্টগ্রাম থেকে আইপি দেওয়া বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একইসাথে অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আবদুর রশিদ মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে বাগেরহাটে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। একইসাথে আরেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে পটুয়াখালীর রাঙাবালীতে বদলি করা হয়।

এর পর থেকে কিছু কিছু সনদ চট্টগ্রাম থেকে ছাড় পেলেও বেশির ভাগই নিতে হত ঢাকা থেকে। সর্বশেষ ২০ জুন এক আদেশে চট্টগ্রাম থেকে আইপি সনদ ইস্যু বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর থেকে ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে পড়েন। চট্টগ্রামের বদলে ঢাকা থেকে সনদ ইস্যু করায় চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১২ দিন বাড়তি সময় লাগছে। আগে যেটি দিনে দিনে কিংবা একদিনেই হত। এই বাড়তি সময়ের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পড়ে থাকছে, আর যোগ হচ্ছে মাশুল। এর ফলে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সারাদেশের ব্যবসায়ীদের চেয়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছেন। এর প্রতিবাদে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মানববন্ধনও করেছিলেন।

 



মন্তব্য