kalerkantho


প্রথম দেখাতেই গৃহবধূর সংসার তছনছ করে দিল ফেসবুকবন্ধু

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রথম দেখাতেই গৃহবধূর সংসার তছনছ করে দিল ফেসবুকবন্ধু

নগরের মুরাদপুর এলাকার ব্যবসায়ী হেলাল চৌধুরী (ছদ্মনাম) চার বছরের কন্যা সন্তানের বাবা। ব্যবসা নিয়ে কিছুটা বেশি ব্যস্ত থাকেন। ব্যবসার প্রয়োজনেই যান শহরের বাইরে। এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে হয় তাঁকে। এর পরও স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে সুখের সংসার তাঁর।

ব্যবসায়ী স্বামী বাইরে থাকায় রাতে সময় কাটানোর প্রয়োজনেই স্ত্রী সাবরিনা খানম (ছদ্মনাম) ফেসবুকে সময় পার করেন। এরই মধ্যে ফেসবুকে পরিচয় হয় অপু (ছদ্মনাম) নামে এক যুবকের সঙ্গে। দুজনের মধ্যে প্রায় মেসেঞ্জারে চ্যাটিং হয়। মেসেঞ্জারই হয়ে ওঠে তাঁদের সময় কাটানোর মাধ্যম। এরই মধ্যে জুলাই মাসে একদিন অপু প্রস্তাব দেন ঈদের পর সারবিনার বাসায় আসবেন তিনি। এতে সায় দেন সাবরিনা।

অপু ঈদের পর এক বিকেলে অটোরিকশা নিয়ে চলে আসেন সাবরিনার বাসভবনে। এসে ফোন দেন সাবরিনাকে। অপুর ফোন পেয়ে সাবরিনা তাঁকে বাসায় না ডেকে ভবনের নিচে অপেক্ষা করতে বলেন। পরক্ষণে নিজের চার বছর বয়সী শিশু কন্যাকে পাশের বাসায় রেখে নিচে নামেন সাবরিনা।

বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। কথার ফাঁকে অপু প্রস্তাব দেন, কাছের রেস্টুরেন্টে বসে কফি খাওয়ার। পরে সাবরিনা ফিরে আসবে বাসায়। সদ্য দেখা হওয়া বন্ধুর সঙ্গে সাবরিনা অটোরিকশায় উঠেন কফি হাউসের যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

অটোরিকশায় আলাপের সময় সাবরিনার স্বামীর মোবাইল নম্বর চান অপু। সরল বিশ্বাসে সাবরিনা নম্বর দেন অপুকে। সাবরিনার কাছ থেকে নম্বর পেয়েই হেলাল চৌধুরীকে ফোন করেন অপু। এ প্রান্ত থেকে বলতে শুরু করেন, ‘আপনার স্ত্রী সাবরিনার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। আমাদের শারীরিক সম্পর্কও আছে। আপনি সাবরিনাকে ভুলে যান। আমরা ভারতে চলে যাচ্ছি।’

অপরিচিত এক মোবাইল ফোন থেকে এমন কথা শুনে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে হেলাল চৌধুরীর মাথায়। এদিকে স্বামীকে ফোন করে অকপটে মিথ্যা বলার প্রতিবাদ করেন সাবরিনা। কিন্তু কাজ হয়নি। অপুর এমন আচরণে বিমর্ষ হয়ে পড়েন সাবরিনা। হতাশায় কান্না শুরু করেন। ইতোমধ্যে অপু তাঁর বাসায় পৌঁছেন সাবরিনাকে নিয়ে। অপু সরাসরি জানিয়ে দেন, ‘তোমার স্বামীকে আমাদের সম্পর্কের কথা বলে দিয়েছি। এসব কথা শোনার পর তোমাকে আর স্বামী গ্রহণ করবেন না। তাই অতীত ভুলে আমার সঙ্গে থাকো।’

নির্বাক সাবরিনার তখন কিছুই বলার ছিল না। তিনি মুষড়ে পড়েন। এরই মধ্যে সাবরিনাকে বাসায় নিয়ে রাখেন অপু। সাবরিনাকে বাসায় রাখার বিষয়ে অপু নিজের বাসার অন্য সদস্যদের ম্যানেজ করে ফেলে। গভীর রাতে সাবরিনা নিজের বাসা ও শিশু সন্তানের কাছে ফিরে যেতে চান। এই নিয়ে অপুকে চাপ দেন। কিন্তু অপু এতে রাজি হননি। শেষে ওই কক্ষে থাকা বেশ কিছু ওষুধ এক সঙ্গে খেয়ে ফেলেন সাবরিনা। ওষুধ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অজ্ঞান হন। অজ্ঞান সাবরিনাকে চিকিৎসক এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরদিন অপুর বাসার সদস্যরা সাবরিনাকে আর রাখেননি। অপু বেরিয়ে যান সাবরিনাকে নিয়ে। পরে চলে যান কক্সবাজারে।

এদিকে স্ত্রী অন্যের সঙ্গে চলে গেছে শুনে হতাশ হেলাল চৌধুরী বাড়িতে ফিরেন। পরে নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে পৌঁছেন নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে। স্বামীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান শুরু করে।

অভিযানের শুরুতেই গোয়েন্দা পুলিশ হালিশহর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপুর ভাই-বোনকে আটক করে। দুজনের আটকের পর গোয়েন্দা পুলিশ শর্ত দেয়, যদি সাবরিনাকে ফিরিয়ে দেয় অপু, তবেই আটক ভাই-বোনকে ছাড়া হবে। নাহলে অপহরণে সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগে তাঁদেরকেও মামলার আসামি করা হবে।

গোয়েন্দা পুলিশের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে অপুর ভাই-বোন গোয়েন্দা পুলিশকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে তাঁরা অপুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হন। শেষে অপু রাজি হন সাবরিনাকে ফিরিয়ে দিতে। এর পর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু এলাকায় এনে সাবরিনাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে সটকে পড়েন অপু। সেখান থেকেই সাবরিনাকে উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

সাবরিনা উদ্ধার হওয়ার পর নতুন সমস্যা তৈরি হয়। হেলাল চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন সাবরিনাকে তালাক দেবেন। অপুর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করায় আর সংসার করবেন না। এবার গোয়েন্দা পুলিশ নতুন করে উদ্যোগ নেয়, সংসার রক্ষার। চার বছরের ছোট্ট মেয়েটি যেন তার বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারে। এই চেষ্টার অংশ হিসেবে স্বামী হেলাল চৌধুরী বুঝতে পারেন, তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ঠিক হবে না। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় ফিরেন। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা হয়। কিন্তু অধরা থাকে আসামি। 

ঘটনার বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব আর বাস্তব জীবনের বন্ধুত্ব্ব এক নয়। ভার্চুয়াল বন্ধুরা প্রকৃত বন্ধু হবে এমন কোনো কথা নেই। যে কোনো সময় বিপদে ফেলতে পারে ভার্চুয়াল বন্ধুরা। তাই সতর্কভাবে বন্ধুত্ব করতে হবে। আর অবশ্যই নৈতিকভাবে শক্ত থাকতে হবে। না হলে বিপদ অনিবার্য হয়ে ওঠতে পারে।’



মন্তব্য