kalerkantho


মহাসড়কের চকরিয়ায় মৃত্যুফাঁদ!

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মহাসড়কের চকরিয়ায় মৃত্যুফাঁদ!

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় গতকাল দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ায় প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। শুধু একদিনের ব্যবধানে দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল চার নারীসহ ১১ জনের। আহত হয়েছে শিশু, নারীসহ ১৪ জন। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করে থাকে।

এ প্রসঙ্গে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান পর পর দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাসড়কের চকরিয়ায় এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ বের করতে ইতোমধ্যে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাতকে প্রধান করা হয়েছে। এছাড়া কমিটিতে স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সদস্য করা হয়েছে। এই কমিটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেবে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করলেও তা মানছে না সংশ্লিষ্টরা। মহাসড়কে চলছেই অটোরিকশা, ইজিবাইক টমটম, মাহিন্দ্রসহ হরেক রকমের ত্রি-হুইলার বাহন। এমনকি লেগুনা-ছারপোকার মতো চার চাকার ছোট যানবাহনও মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও এগুলো চলছেই। ছোট যানবাহনগুলো মহাসড়কে চলাচলের কারণেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার কেউ কেউ মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁককে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন।

গতকাল বুধবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে ভারি বর্ষণ হচ্ছিল। এ সময় মহাসড়কের চকরিয়ার বরইতলী নতুন রাস্তার মাথা থেকে যাত্রী নিয়ে হারবাংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ব্যাটারিচালিত একটি টমটম। এটি হারবাং স্টেশনের কাছে ইনানী রিসোর্টের সামনে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পণ্যবাহী দ্রুতগামী একটি কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে দুজনসহ মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে এক নারীও ছিলেন। আহত হন ইজিবাইকের শিশুসহ আরো চার যাত্রী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী কালের কণ্ঠকে জানান, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ইজিবাইক টমটমটি যিনি চালাচ্ছিলেন মূলত তিনি একজন রিকশাচালক। তিনি রিকশাচালকের পেশা বদলে টমটম চালকে নিয়োজিত হয়েছেন কয়েকমাস আগে। মহাসড়কে গাড়ি চালানোর জন্য তাঁর নেই কোনো প্রশিক্ষণ। তাছাড়া টমটমটি যখন ইনানী রিসোর্টের সামনে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে পৌঁছে তখনই তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান এবং বিপরীত দিক থেকে আসা কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে পতিত হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

একইভাবে গত মঙ্গলবারের ভয়াবহ দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বরইতলী নতুন রাস্তার মাথা এলাকার মামুনুর রশীদ নামে এক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে জানান, মহাসড়কে চার চাকার ছারপোকা গাড়ি নিষিদ্ধ থাকলেও রহস্যজনক কারণে এসব গাড়ি প্রতিদিন চলাচল করছে মহাসড়কে। একইভাবে মঙ্গলবার পৌনে ১২টার দিকে যাত্রীবোঝাই করে চিরিঙ্গা থেকে লোহাগাড়ার দিকে বেপরোয়াভাবে যাচ্ছিল ছারপোকা গাড়িটি। পথিমধ্যে বরইতলী নতুন রাস্তার মাথায় গাড়িটি পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়াভাবে আসা স্টার লাইন পরিবহনের যাত্রীবাহী অপর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ছারপোকা গাড়ি দুমড়ে-মুচড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলে কয়েকজন এবং তিন নারীসহ সাতজন ছারপোকার যাত্রী নিহত হন। আহত হন দুই গাড়ির অন্তত ১০ যাত্রী।

মহাসড়ক লাগোয়া স্থানীয় কয়েকজন সচেতন বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার ২৯ কিলোমিটার অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য নিয়োজিত রয়েছে বানিয়ারছড়াস্থ চিরিঙ্গা এবং মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি। এছাড়া চিরিঙ্গা সদরের জন্য রয়েছে থানা ট্রাফিক সার্জেন্টের নেতৃত্বে পুলিশ। কিন্তু হাইওয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্টরা দায়সারা দায়িত্ব পালন এবং সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন না করায় মহাসড়কে ছোট ছোট যানবাহনগুলো চলাচল করছে। অভিযোগ রয়েছে, ফাঁড়ির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মহাসড়কে ছোট যানবাহনগুলো চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করলেও অধস্তন কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তা না হলে সরকারের কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও কিভাবে ছোট যানবাহনগুলো মহাসড়কে উঠতে পারে? এজন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

এ ব্যাপারে বানিয়ারছড়াস্থ চিরিঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও সার্জেন্ট নূর-এ আলম পলাশ বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক মহাসড়কে যাতে তিন ও চার চাকার ছোট যানবাহনগুলো উঠতে না পারে সেজন্য আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। অতিসম্প্রতি সরকারের কঠোর নির্দেশনার পর হাইওয়ে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে।’

তাহলে আজ (গতকাল) কিভাবে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ইজিবাইক টমটম মহাসড়কে দুর্ঘটনার শিকার হলো?-এমন প্রশ্নের জবাবে নূর-এ আলম বলেন, ‘মহাসড়ক লাগোয়া অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়ক-উপ-সড়ক রয়েছে। সেই সড়ক দিয়ে এসে হুট করে মহাসড়কে উঠে পড়ে এসব যানবাহন। আর এতেই দুর্ঘটনা ঘটছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের জনবল একেবারে স্বল্পসংখ্যক। তাই মহাসড়কের এই বিশাল অংশের পুরোটা একচোখে পাহারা দেওয়াটা বেশ কষ্টকর। আর এর সুযোগ নিচ্ছে তিন ও চার চাকার ছোট ছোট যানবাহনগুলো। তবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে আরো বেশি কঠোর হব আমরা।’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চকরিয়া শাখার সভাপতি সোহেল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিনের ব্যবধানে পর পর দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের যেমন বেপরোয়া ভাব ছিল, তেমনিভাবে নিষিদ্ধ তিন ও চার চাকার ছোট যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করায়।’ তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত হাইওয়ে পুলিশ কঠোরভাবে পালন না করায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে।



মন্তব্য