kalerkantho


সীতাকুণ্ডে অর্ধশতাধিক অরক্ষিত রেলক্রসিং

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সীতাকুণ্ডে অর্ধশতাধিক অরক্ষিত রেলক্রসিং

সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো পার্কে আসা-যাওয়ার পথে রেলক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান নেই। আছে শুধু সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। ঝুঁকি নিয়ে চলেন পর্যটকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘দেখুন শুনুন চলুন’ ‘সামনে দুটি রেলপথ’ ‘নিজ দায়িত্বে পার হোন’ সীতাকুণ্ডে গেটম্যানবিহীন অরক্ষিত অর্ধশতাধিক রেলক্রসিংয়ে সাইনবোর্ডে এ ধরনের সতর্কবার্তা লিখেই কর্তব্য শেষ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ! কিন্তু দ্রুতগতিতে আসা যানবাহনের চালকের অধিকাংশই এসব সাইনবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে খোলা গেট পেয়ে দ্রুত গন্তব্যে যেতে চেষ্টা করেন। ফলে ঘটে দুর্ঘটনা।

স্থানীয় ও রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার বড়দারোগারহাট থেকে সলিমপুর পর্যন্ত রেল লাইনের পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাশে রয়েছে বেশ কিছু বসতবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, সরকারি ইকোপার্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফলে সাধারণ মানুষসহ অসংখ্য যানবাহন রেললাইনে উভয় পাশে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে অনেক রেলক্রসিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসীর মতে, সীতাকুণ্ড উপজেলায় রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০টি।

কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের জনবল সংকটের কারণে মাত্র ১৫টির মতো গেটে গেটম্যান নিয়োগ করা আছে। অবশিষ্টগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৩০-৩৫টি ক্রসিংয়ের সামনে ‘দেখুন শুনুন চলুন’ ‘সামনে দুটি রেল পথ’ ‘নিজ দায়িত্বে পার হোন’ ইত্যাদি সতর্কতামূলক বার্তা লিখেই কর্তব্য শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া গ্রামবাসীর চলাচলের কারণে সৃষ্টি হওয়া আরো অনেক ক্রসিং রয়েছে যেখানে কোনো গেটম্যান তো দূরের কথা সতর্কবার্তাও নেই! আবার যেসব গেটে গেটম্যান রয়েছেন সেখানেও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মেলে বারবার। আর এতে বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা।

গত ১০ বছরে এখানে ট্রেন-জিপ, জিএনজি অটোরিকশা, ট্রাক প্রভৃতির সংঘর্ষে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছে ২০ জনেরও অধিক। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে কর্মকর্তাদের জিপের দুর্ঘটনা। ওই ঘটনায় প্রগতির ৫ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাড়বকুণ্ডের এস কে এম জুট মিলস এলাকায় অরক্ষিত একটি গেটে কিছুদিন পর পর ট্রেনের সাথে ট্রাক, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এখানে গত দুই বছরে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেলসম্যানসহ দুজন নিহত ও আরো ৪-৫ জন আহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনায় বারবার জানমাল হানির ঘটনা ঘটছে উপজেলার ফৌজদারহাট সিডিএ রেলক্রসিংয়েও। এখানে গত পাঁচ বছরে ট্রাক ও বিভিন্ন যানবাহনের সাথে ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৪ বার। এতে দুজন নিহত হয়েছেন। ২০১৪ সালে ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশা দুমড়ে গিয়ে সীতাকুণ্ড হাসপাতালের পেছনে এক অটোরিকশাচালক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইকোপার্ক গেট, সীতাকুণ্ড পৌরসদর হাঁসমুরগির খামার ও ছোটদারোগারহাট রেলক্রসিং ও বড়দারোগারহাট ফুলগাজী গ্রাম এলাকায় ট্রেনের সাথে বিভিন্ন যানবাহনের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন আরো ৪ জন। এ ছাড়া রেলক্রসিংয়ে আরো বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় আহত হলেও সেসব ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি।

সীতাকুণ্ড উপজেলায় সর্বশেষ ২৫ জুলাই সুবর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেন ও ট্রাকের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বাড়বকুণ্ডের এস কে এম জুট মিলসের রেলক্রসিংয়ে। এতে দুজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হয়ে সীতাকুণ্ড রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির এস আই মো. দেলোয়ার হোসেন লোকজন নিয়ে ক্রসিংয়ের উভয় দিকে লোহার খুঁটি পুঁতে বড় গাড়ির যাতায়াত বন্ধ করে দিলেও তাঁরা চলে যাওয়ার পর এর পূর্ব পাশে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন তাঁদের পণ্য আনা নেওয়ার সুবিধার্থে পুনরায় সেগুলো উপড়ে ফেলে। এসব কারণে সীতাকুণ্ডে বারবার ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে।

বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছাদাকাত উল্লাহ এস কে এম এলাকায় মাঝে-মধ্যেই ট্রেনের সাথে অন্য গাড়ির সংঘর্ষের কথা জানিয়ে সেখানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দ্রুত গেটম্যান নিয়োগ করা দরকার বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

এদিকে গত রবিবার ভোরে মিরসরাইয়ে ট্রেন দুর্ঘটনার পর সীতাকুণ্ডে ঘুরে দেখা যায়, এখনো এখানে গেটগুলো অরক্ষিত অবস্থায় ট্রেন চলাচল করছে।

গতকাল সোমবার সরেজমিনে উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে রেলক্রসিং অরক্ষিত দেখা গেছে। উপজেলার একমাত্র সরকারি পর্যটন স্পট ফকিরহাট ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাতায়াতের পথের রেলক্রসিংয়ে গিয়ে দেখা গেছে, কার, টেক্সিসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করলেও এদেরকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার কেউ নেই। তবে রেলক্রসিংয়ের কাছে গিয়ে সতর্কবার্তা লেখা বিভিন্ন সাইনবোর্ড দেখা গেছে।

ফকিরহাট ইকোপার্ক এলাকার বাসিন্দা মো. রবিউল হোসেন বলেন, ‘রেলক্রসিংয়ে এসব সাইনবোর্ড থাকলেও চালকরা দূর থেকে গেট খোলা দেখে দ্রুত চলে যায়। এসব সতর্কবার্তা পড়েও দেখেন না। ফলে এখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো গেটম্যান দেয়নি।’

এসব বিষয়ে সীতাকুণ্ড সদর রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার মতিলাল বড়ুয়া বলেন, ‘আমার এলাকায় সীতাকুণ্ড সদর গেটে গেটম্যান আছে।’ তবে শেখপাড়া মুরগির খামার গেট, কথাকলি স্কুল এলাকায় পরপর দুটি গেটে কোনো গেটম্যান নেই স্বীকার করলেও এগুলো তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই বলে জানান।

তিনি আরো বলেন, ‘সীতাকুণ্ড উপজেলায় মানুষের যাতায়াতে অনেক রেলক্রসিং গড়ে ওঠছে। এগুলোতে তো গেটম্যান নেই। তাই সবার সতর্ক হওয়া উচিত। এজন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সাইনবোর্ড দিয়ে সতর্ক করেছে। এসব দেখে চললে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।’

ফৌজদারহাট রেলওয়ের স্টেশনমাস্টার মো. শাহআলম বলেন, ‘আমার এলাকার কাছাকাছি বেশ কয়েকটি গেট আছে। এর মধ্যে কোনটির গেটম্যান আছে আবার কোনটির নেই। যেগুলোতে গেটম্যান নেই সেগুলোর সংখ্যা জানা নেই।’

এদিকে ঠিক কতগুলো গেট অরক্ষিত রয়েছে এর হিসাব রেলওয়ের স্টেশনগুলোতে না থাকলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে এর সংখ্যা অন্তত ৮৫টি হবে। তাই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব গেট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ট্রেন দুর্ঘটনায় যেকোনো সময় আরো অনেক প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

 



মন্তব্য