kalerkantho


খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের দ্বারপ্রান্তে পুলিশ!

জড়িত সন্দেহে এবার জেএসএসকর্মী গ্রেপ্তার

দীঘিনালায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃত্তিকা ত্রিপুরা হত্যা

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জড়িত সন্দেহে এবার জেএসএসকর্মী গ্রেপ্তার

জেলার দীঘিনালায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃত্তিকা ত্রিপুরা ওরফে পুনাতি হত্যার রহস্য উদঘাটনে নতুন মোড় নিচ্ছে। ঘটনার পর ওই এলাকায় আসা-যাওয়া করা চার বাঙালিকে গ্রেপ্তার করা হলেও গতকাল শনিবার একই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জেএসএস (এমএন লারমা) এর যুব সংগঠন যুব সমিতির সদস্য শান্ত ত্রিপুরাকে।

পুলিশ জানিয়েছে, আগের গ্রেপ্তারকৃতরা ঘটনার সাথে জড়িত নয়। হত্যাকাণ্ডের মূল আসামিদের মধ্যে অন্যতম শান্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অপরদিকে গ্রেপ্তারকৃত শান্তকে নির্দোষ দাবি করে তাঁর মুক্তির দাবিতে তাত্ক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জেএসএস। জেএসএস দাবি করেছে, তাদের দলকে হয়রানি করতে মিথ্যা অভিযোগে তাদের কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত রবেন্দ্র ত্রিপুরা ওরফে শান্ত (৩২) খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি এলাকার পুদ্যানি পাড়ার পুণ্যধন ত্রিপুরা ওরফে ধন্যধন ত্রিপুরার ছেলে। কিন্তু তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, এম এন লারমা (পিসি জেএসএস, এম এন লারমা) পক্ষের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দীঘিনালায় দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি কৃত্তিকা হত্যা ঘটনার আগে পরে তিনি ঘটনাস্থল এলাকায় কালেক্টর (চাঁদা আদায়কারী) হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কৃত্তিকার নীরব ঘরটিকেই চাঁদা আদায়ের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে নিশ্চিত করেছেন কৃত্তিকা হত্যা মামলার তদন্তে জড়িত পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ঘটনার দিন কৃত্তিকার ঘরেই শান্তর অবস্থান ছিল। এছাড়া গ্রেপ্তারকৃত শান্ত জেলা সদরের একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।

অপরদিকে শান্তকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জেএসএস। সমাবেশ থেকে শান্তর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করা হয়েছে। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, দীঘিনালার ওসি শিশু শিক্ষার্থী কৃত্তিকা হত্যা ঘটনার সাথে জড়িয়ে জেএসএসকে হয়রানি করছেন।

এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মো. আ. সামাদ বলেন, ‘নয়মাইল এলাকায় বর্তমানে ইউপিডিএফের কোনো কার্যক্রম নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া ঘটনাস্থল এলাকায় শুধু জেএসএসের (এমএন লারমা) চাঁদাবাজদের সার্বক্ষণিক অবস্থান। এমনকি বাবাহারা কৃত্তিকার মা একজন জুমচাষি। কৃত্তিকার ফাঁকা ঘরটিই জেএসএসের চাঁদাবাজরা নীরব আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।’ ওসি জানান, ঘটনার সাথে জড়িতরা মদ্যপ ছিল। তারা এ ঘটনা ঘটানোর পর দলের বদনাম এড়াতে পথচারী বাঙালির ওপর দোষ চাপায়। তখন চার বাঙালিকে আটক করা হয়। যাঁরা এখনো জেলহাজতে রয়েছেন। কিন্তু ঘটনার শিকার কৃত্তিকার স্বজনরা বাঙালিদের নামে এমন অভিযোগ তখনো করেনি। শুধু দলের লোকরাই অভিযোগের তালিকায় নাম দিয়েছিল তাঁদের। অসহায় কৃত্তিকার মাও দলের ভয়ে মুখ খোলতে পারেননি। সর্বশেষ ঘটনার সবিশেষ কৃত্তিকার স্বজনরা লিখিতভাবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জানিয়েছেন। পুলিশ তা দীর্ঘদিন এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে তদন্ত করেছেন এবং ঘটনাস্থলে অবস্থানরতদের বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত হয়েছেন। এর পর পুলিশ অপরাধী গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। ঘটনার সাথে জড়িত শান্তর আরো সহযোগী রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারেও পুলিশ সার্বিক চেষ্টা করছে।

ওসি সামাদ আরো জানান, গ্রেপ্তারকৃত শান্ত এর আগে আটমাইল এলাকায় একই দলের হয়ে চাঁদা আদায়কারীর দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে এক দোকানদারের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর অবৈধ মেলামেশার দৃশ্য ওই দোকানদার দেখে ফেলার পর তাঁদের দল শান্তকে প্রত্যাহার করে। আর দলের বদনাম এড়াতে ওই দোকানদার দম্পতিকে এলাকা ছাড়া করা হয়েছিল। এর কিছুদিন পর এই শান্তকে আবার নয়মাইল এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পরই ঘটে কৃত্তিকা হত্যার ঘটনা।

পুলিশ জানায়, শান্ত ত্রিপুরা জেলা সদরের দীলিপ কুমার চাকমা ওরফে বিনয় হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি। জেলা সদরের হরিনাথ পাড়ায় চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিনয়কে হত্যা করা হয়। এর দুদিন পর জেলা সদর থানায় মামলা করেন নিহত বিনয়ের স্ত্রী ফুলিকা চাকমা।

জেএসএস (এম এন লারমা) দীঘিনালা উপজেলা শাখার সহসভাপতি লোচন দেওয়ান জানান, কৃত্তিকা হত্যার সাথে জেএসএস জড়িত নয়। জেএসএসকে হয়রানি করার জন্য জেএসএসের যুব সংগঠন যুব সমিতির সদস্য শান্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে লোচন দেওয়ান দাবি করেছেন, ‘শান্ত কোনো চাঁদাবাজ নয়, সে শুধু যুব সমিতির সদস্য।’

প্রসঙ্গতঃ গত ২৮ জুলাই দুপুরের দিকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় নয়মাইল ত্রিপুরাপাড়া গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কৃত্তিকা ত্রিপুরা ওরফে পুনাতিকে (১১)। ওই দিন রাত ১১টার দিকে তার বাড়ির সামনের বাঁশবাগান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পরদিন এলাকাবাসী, শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে নয়মাইল এলাকায়, উপজেলা সদরে এবং জেলা সদরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। নিহত কৃত্তিকা নয়মাইল ত্রিপুরাপাড়ার মৃত নন্দন ত্রিপুরার মেয়ে।

 



মন্তব্য