kalerkantho


‘সমঝোতায়’ পার হয় সোনার চালান

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘সমঝোতায়’ পার হয় সোনার চালান

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সোনা চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। দুবাই, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে একের পর এক ঢুকছে কোটি কোটি টাকার বড় বড় সোনার চালান।

সোনা চোরাচালানে বাহক হিসেবে ব্যবহার হতে গিয়ে ধরা পড়া একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সোনার চালান পৌঁছার আগেই দেশে অবস্থানকারী তাঁদের চক্র বিমানবন্দর পুলিশ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে ‘সমঝোতা’ করে নেয়। সমঝোতা অনুযায়ী টাকা পেলে সোনার চালান ছেড়ে দেন কর্মকর্তারা। আর সমঝোতা অনুযায়ী টাকা না পেলে চালান ধরা পড়ে যায়।

এই চক্রে রাজনীতিক থেকে শুরু করে বিমানবন্দর পুলিশ, আনসার, কাস্টমস কর্মকর্তা, বিমানের ইঞ্জিনিয়ার, শ্রমিক নেতা এবং কথিত কয়েকজন সাংবাদিকের নামও আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যে যাঁর পদের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সোনা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাস্টমস কর্মকর্তা ও বিমানবন্দরের শ্রমিক নেতারা।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছরে  (২০১৭-১৮) শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবৈধভাবে আনা ১৯টি চালানে ৩৮ কেজি সোনা ধরা পড়েছে। যার মূল্য প্রায় ২০ কোটি ২০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। চলতি বছরের জুন থেকে গত রবিবার পর্যন্ত প্রায় সাত কোটি ৬১ লাখ টাকার ১৮ কেজি সোনা আটক করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরে প্রায় ১৬ কেজি ওজনের সোনার চালনসহ এক যাত্রীকে আটক করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। কিন্তু চোরাচালানের হোতারা প্রতিবারই আড়ালে থেকে যায়।

সোনা চোরাচালানের বাহক হিসেবে ব্যবহার হতে গিয়ে ধরা পড়া একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সোনা চোরাচালানের সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বসবাসকারী হারুন এবং শারজায় বসবাসকারী শওকত নামে দুই ব্যবসায়ী সোনা চোরাচালানের হোতা। তাঁরা অন্য ব্যবসার আড়ালে বাংলাদেশে সোনা চোরাচালান করে থাকেন। তাঁরা দুবাই থেকে বাহকের মাধ্যমে দেশে সোনা চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছেন।

ধরা পড়া ব্যক্তিরা বলছেন, সোনার চালান পৌঁছার আগেই দেশে অবস্থানকারী তাঁদের চক্র বিমানবন্দর পুলিশ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে ‘সমঝোতা’ করে নেন। অনেক সময় সোনার চালান আটক হলেও সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে ছেড়ে দেন কর্মকর্তারা। অনেক ক্ষেত্রে আটককৃত চালানে যে পরিমাণ সোনা থাকে তার চেয়ে কম দেখানো হয় আটকের সময়। এর সবই নির্ভর করে কর্তাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’র ওপর।

সমঝোতার বিষয়টি অস্বীকার করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. নূর উদ্দিন মিলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগটি সঠিক নয়। প্রতিটি ফ্লাইটে ১৫০ থেকে ২০০ যাত্রী থাকে। তাদের সবাইকে তো আমরা তল্লাশি করতে পারি না। আচরণ দেখে কিংবা চলাফেরায় সন্দেহ হলে সেই সব যাত্রীকে আমরা তল্লাশি করি। এ ছাড়া আমাদের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট যাত্রীকে তল্লাশি করি এবং এতে সফলতা পাওয়া যায়। যদি কেউ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলে তবে তা মিথ্যা কথা। এ ব্যাপারে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।’

সোনার বারসহ ধরা পড়া বাহকরা আরো জানান, দুবাই থেকে সোনা বহন করে আনলে বাহকরা পান দেশে ফেরার ফ্লাইটের টিকিট, শপিংয়ের জন্য কিছু নগদ অর্থ, আর প্রতিটি সোনার বারের জন্য ৫০০ টাকা। অন্যদিকে বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ‘সমঝোতা’ করে চালান নির্বিঘ্নে পার হয়ে যেতে সহায়তা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা নিজের কিংবা কার্যালয়ের গাড়িতে করে নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন সোনার বাহককে। এসব কর্মকর্তার সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও জড়িত বলে শোনা যায়। সে জন্য তাঁরাও পান ‘সমঝোতার’ ভাগ।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়ায় সোনা চোরাচালানকারী চক্রটি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায়ই কোনো ধরনের ঝুটঝামেলা ছাড়া সোনা পাচার করে চলেছে। বিমানবন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতা না হলে চালানের বাহক তাঁর লাগেজ (ব্যাগ) বিমানবন্দরেই ফেলে চলে আসেন বাইরে। এ সময় লাগেজ ট্যাগ দিয়ে আনা হয় বিমানের শ্রমিক নেতাদের হাতে। এরপর সেই লাগেজ বিমানবন্দরের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ শাখায় জমা হয়। পরবর্তী সময়ে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিমানের শ্রমিক নেতারা গোপনে তা ছাড় করিয়ে নেন। মূলত কাস্টমস কর্মকর্তারা যখন বিমানবন্দরে থাকেন না তখনই ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ শাখা থেকে লাগেজ সরান শ্রমিক নেতারা।

এ ছাড়া এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে শারজাফেরত এক যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ১০টার পর ডিউটিতে কাস্টমস কর্মকর্তারা তেমন একটা থাকেন না। এ সময় কোনো আন্তর্জাতিক (মধ্যপ্রাচ্যের) ফ্লাইট এই বিমানবন্দরে নামলে অনায়াসে কাস্টমস চেকআপ পেরিয়ে যায় যাত্রীরা। সম্প্রতি শারজা থেকে ফেরার সময় ফ্লাইট ডিলে করায় শাহ আমানতে সেই রাতে এমন ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখেছি।’

বিমানের সিবিএ সভাপতি এ এফ এম দিদারুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পান তবে ব্যবস্থা নিতে বলুন।’

আটককৃতরা জামিনে এসে আবারও জড়াচ্ছেন চোরাচালানে

সোনা চোরাচালানের সময় যাঁরা আটক হন তাঁদের খবর পরবর্তী সময়ে আর কেউ (সংস্থা) রাখে না। আটকের পর কিছুদিন কারাভোগ করে জামিনে বের হয়ে আসেন তাঁরা। পরে আদালতে আর হাজিরা দেন না। আবারও দুবাই কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে পাড়ি দেন এসব ‘বাহক’ পরিচয়ের ব্যক্তিরা। আবারও সোনা চোরাচালানের বাহক হন এসব ব্যক্তি। আটককৃত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেখে কাস্টমস কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।

 



মন্তব্য