kalerkantho

মাদক মেলে হাত বাড়ালেই

নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে পাচারকারীরা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



মাদক মেলে হাত বাড়ালেই

মাদকে ভাসছে চট্টগ্রাম! হাত বাড়ালেই মেলে ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইনসহ বিদেশি মদ। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশ। তাদের সঙ্গে বেকার ও শ্রমিক পর্যায়ের বেশ কিছু মাদকসেবী নিয়মিতভাবে মাদক গ্রহণ করছে। এর ফলে চট্টগ্রামের অবস্থা ভয়াবহ ধারণ করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক উদ্ধার অভিযানের চিত্র পর্যালোচনা করে এবং কয়েকটি মাদকের আখড়া ঘুরে মাদকের আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে।

তবে এমন চিত্র পরিবর্তন করে চট্টগ্রামকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চট্টগ্রামকে অবশ্যই মাদকমুক্ত করা হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে মাদক পাচারে চট্টগ্রামকে ট্রানজিট রুট হিসেবে আর ব্যবহূত হতে দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী র‌্যাব অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী র‌্যাব এখন থেকে মাদকের বিষয়ে আরো কঠোর হবে। চট্টগ্রামকে মাদকমুক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে র‌্যাব।’

সমপ্রতিক সময়ে মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় রাষ্ট্রের সব মহল থেকে উদ্বেগ উত্কণ্ঠা প্রকাশ করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত শুক্রবার রাতে নগরের বরিশাল কলোনিতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন মাদক পাচারকারীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে একই স্থানে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গিয়েছিল বাইট্টা ফারুক। এছাড়া ২০১৫ সালের জুলাই মাসে পতেঙ্গা এলাকায় ইয়াবা পাচারকারী জাফর মাঝি ও  আগস্ট মাসে জাহিদুল ইসলাম আলোর মৃত্যু হয়েছিল।

শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারীদের কয়েকজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ার পরও চট্টগ্রামে মাদকের পাচার ও বিস্তার কমেনি। অধিকন্তু অভিনব পন্থায় মাদকপাচারীরা ইয়াবা পাচার করতে থাকে। সেই সঙ্গে নগরের বরিশাল কলোনি ঘিরে ফেন্সিডিল ও গাঁজার রমরমা ব্যবসা চলতে থাকে। বরিশাল কলোনি ছাড়াও নগরের ১৬ থানা এলাকায় শতাধিক মাদকের আখড়ায় নিয়মিত মাদক বিকিকিনি চলে। একটি আখড়া ধ্বংস করলে নতুন আস্তানা তৈরি করে কারবারিরা।

মাদকের আগ্রাসনের এই ভয়াল চিত্র ওঠে এসেছে নগর পুলিশের মাদক উদ্ধার চিত্রে। ২০১৬ সালে যেখানে নগর পুলিশ, র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, এপিবিএন, বিজিবির অভিযানে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছিল ৯৬৭টি। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একই সংস্থা মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা করেছে চার হাজার ২৬০টি। যা আগের বছরের চেয়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

মাদকের রুট : চট্টগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইয়াবা আসছে মিয়ানমার থেকে। সড়কপথের চেয়ে বেশি আসছে জলপথে। ফেন্সিডিল ও গাঁজা আসছে ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে। কুমিল্লা, আখাউড়া ছাড়াও ফেনী এবং খাগড়াছড়ি সীমান্ত পার হয়েও চট্টগ্রামে আসছে ফেন্সিডিল। আর বিদেশি মদ ও বিয়ার আসছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহন করে আনা সামুদ্রিক জাহাজে। বহির্নোঙরে থাকা অনেক জাহাজ থেকেই মাদক পাচারকারীরা কৌশলে বিদেশি মদ ও বিয়ার পাচার করে চট্টগ্রামে আনছে। এছাড়া দেশীয় মদ আসছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে।

মাদক পাচারের এসব রুটের তথ্য জানিয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উপ-কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ মাদক উদ্ধারের সর্বাত্মক অভিযান চালাচ্ছে বলেই মাদকের বড় বড় চালানগুলো ধরা পড়ছে। অতীতের চেয়ে পুলিশের মাদক উদ্ধারের সাফল্য এখন বেশি।’

মামলা ও মাদক উদ্ধার পর্যালোচনা : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ২০১৭ সালের মাদক উদ্ধার চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে সিএমপিতে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছিল ৯৬৭টি। কিন্তু ২০১৭ সালে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে চার হাজার ২৬০টি। এসব মামলায় পুলিশ পাঁচ হাজার ৩০৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে চোলাই মদ ৩৪ হাজার ২৯৯ লিটার, গাঁজা এক হাজার ৭৮৪ কেজি, ইয়াবা ৭৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৫টি, ফেন্সিডিল ৯ হাজার ৯৪২ বোতল ও হেরোইন ৯০৪ গ্রামসহ অন্যান্য মাদক রয়েছে। যার মূল্য প্রায় ২১৮ কোটি টাকা।

একই চিত্রে দেখা গেছে, সর্বাধিক তিন হাজার ৯৩৫টি মাদক উদ্ধার মামলা করেছে নগর পুলিশ। সিএমপির উদ্ধারকৃত মাদক ৫৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকার। সবেচেয়ে বেশি মাদক উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৭। নগরীর থানাগুলোতে র‌্যাব মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা করেছে ৪২টি। মাদক উদ্ধারের পরিমাণ প্রায় ১৫১ কোটি টাকার।

কর্মকর্তার ভাষ্য : মাদক উদ্ধারের চিত্র পর্যালোচনা করে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৬ সালের চেয়ে ২০১৭ সালে মাদক উদ্ধার বেশি হয়েছে, আসামিও বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। এটা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সুফল।’

তিনি বলেন, ‘বরিশাল কলোনিসহ নগরীর মাদকের আখড়াগুলোতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালায়। অনেক আখড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাদকসেবীরাও আর বসে নেই। তাই তারাও নতুন নতুন আখড়া করছে। এ কারণে যেখানেই আখড়ার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।’

মাদকের সরবরাহ বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাদক পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। পাচারকারীরা নিত্য নতুন কৌশলের মাধ্যমে পাচার করছে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা দুরুহ। মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করতে হবে।’


মন্তব্য