kalerkantho


চিকিৎসক মিললেও ওষুধ পেতে দেরি

সামসুল হাসান মীরন, নোয়াখালী    

৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:৪৯



চিকিৎসক মিললেও ওষুধ পেতে দেরি

সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের চররশিদ গ্রামের নুরুল হুদা (৬২) সন্তানকে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসক দেখাতে। বহির্বিভাগে টিকিট কেটে যথাসময়ে চিকিৎসকও দেখালেন।

কিন্তু ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওষুধ নিতে এসে তাঁকে অপেক্ষায় থাকতে হলো। হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ বিভাগে দায়িত্বরত কাউকে পাচ্ছিলেন না।

গতকাল সোমবার নোয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে এ চিত্র দেখা গেল। যদিও হাসপাতাল নিয়ে কালের কণ্ঠে দুই কিস্তি খবর প্রকাশের পর গতকাল কিছুটা হলেও পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী সুলতানা রাজিয়া প্রায়ই সকাল ১০টার পর আসেন। গতকালও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সেখানে প্রত্যুষা আলমের নেতৃত্বে কনিষ্ঠ দুজন কর্মচারী কাজ করছিলেন। পরে নুরুল হুদা সারিতে দাঁড়িয়ে ওষুধ নেন।

জানা গেল, এ বিভাগে অফিস সহায়ক সোহেলই একমাত্র ভরসা।

তিনি এসে দরজা খুলে বসে থাকেন। এরপর ফার্মাসিস্ট প্রত্যুষা ও সুলতানা রাজিয়া আসার পর রোগীদের ওষুধ বিতরণ করা হয়।
আরো জানা গেল, হাসপাতাল থেকে রোগীদের বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। যাঁরা দায়িত্বে আছেন, তাঁরা ঠিকমতো আসেন না, শিক্ষানবিশ ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়ক দিয়ে বিভাগটি চলছে।

হাসপাতালের প্রধান ফটকে দেখা গেল একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ওষুধের দোকান। ভেতরে একই ধরনের মালিকানার আরো দুটি ওষুধের দোকান রয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। সরকারি বিধি অনুযায়ী হাসপাতালের ভেতরে ন্যায্যমূল্যের একটি ওষুধের দোকান থাকার কথা। কিন্তু এখানে দেখা গেছে তিনটি দোকান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। এ বিষয়ে তদন্তও হয়েছে। কিন্তু আইনি জটিলতার সুযোগে দোকানিরা জোর করে রয়েছে।

হাসপাতালের কর্মকতা-কর্মচারীরা জানান, অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর কিছু অকেজো হয়ে আছে। আবার কিছু যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীরা সরবরাহ করলেও তা স্থাপন না করায় বাধ্য হয়ে রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়।

এ ছাড়া হাসপাতালের গাইনি বিভাগ ছাড়া অন্য কোনো বিভাগে জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা নেই। শনিবার দুপুরে সার্জারি বিভাগে ভর্তি হওয়া এমন একজন রোগীকে বুধবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। এ কারণে বাধ্য হয়ে রোগী চলে যায় বেসরকারি হাসপাতালে।

জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করে এক রোগী বলেন, হাত কেটে যাওয়ায় তিনি চিকিৎসা নিতে এসে এক কর্মচারীকে টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় এ ধরনের কয়েকটি অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণেই দালালদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ অভিযান চালালে তাদের দাপট কিছুটা কমে। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দালালরা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কমিশন পেয়ে থাকে। তারা হাসপাতালে ঘুরে রোগীদের ভালো চিকিৎসা কিংবা রোগ পরীক্ষার কথা বলে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। আবার কখনো তারা হাসপাতালে চিকিৎসক আসেন না বলে রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যায়।

হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও রোগীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আবুল হোসেন বলেন, খাবার খুবই নিম্নমানের। মাছের মধ্যে রুই-কাতলা দেওয়ার কথা বলা থাকলেও তাঁদের ছোট মাছ বা পাঙ্গাস দেওয়া হয়।

খামারের মুরগি বেশি দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাসি ও গরুর মাংস দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেগুলো দেওয়া হয় না। অবশ্য মাঝেমধ্যে ছোট ছোট দুই টুকরা খাসির মাংস দেওয়া হয় বলে রোগীরা জানায়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আ ন ম সামসুল করিম বলেন, 'কিছু অভিযোগ সত্য। তবে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি থাকে। সকলকে খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না। ' তবে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।

জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সামসুল করিম আরো বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। যদি কেউ এ ধরনের কাজ করে থাকে তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান ডা. সামসুল করিম।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের বাইরে আবদুল মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। কলেজের অনেক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের হাসপাতালে রোগী দেখার ইচ্ছা থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং বসার জায়গা না থাকায় তাঁরা হাসপাতালে আসতে চান না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের অন্তবিভাগে হাসপাতাল ও আবদুল মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক মিলিয়ে কমপক্ষে ১০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করার কথা। এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রতিদিন ওয়ার্ডে রোগী দেখার কথা থাকলেও তাঁরা সপ্তাহে এক দিনও ওয়ার্ডে আসেন না। নোয়াখালী ছাড়া অন্যান্য জেলা থেকে পদায়ন করা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অনিয়মিত। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার রয়েছেন। তাঁদের একজন বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য কুমিল্লায় অবস্থান করছেন। অন্যজন ডা. মহিউদ্দিন চৌধুরী দুপুর ১২টার আগে আসেন না। গতকালও তাঁকে ১২টা পর্যন্ত দেখা যায়নি।

এ ছাড়া হাসপাতালের সার্জারি, গাইনি, শিশু, অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজির পর্যাপ্ত সংখ্যক সহকারী রেজিস্ট্রারের পদ সৃজন না হওয়ার কথা স্বীকার করলেন সহকারী পরিচালক ডা. মো. খলিল উল্লাহ।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী বলেন, হাসপাতালের ১০ তলা নতুন ভবনের কাজ কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে। পুরনো ভবন ভেঙে ফেলা হবে।

চিকিৎসকদের অনিয়মের বিষয়ে সংসদ সদস্য বলেন, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে বলবেন তিনি। অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা কমিটির বৈঠক করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলেও তিনি জানান।

পরিবর্তন ও স্বস্তি : গতকাল সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হাসপাতালে গিয়ে ভিন্ন ছবি দেখা গেছে। প্রধান ফটকে আনসার সদস্যদের কড়া দায়িত্ব পালন নজর কাড়ল। কোনো রিকশা বা রোগী বহনকারী যানবাহন আসার সঙ্গে সঙ্গে রোগী নামিয়ে যানবাহনকে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বলছিলেন তাঁরা।

জরুরি বিভাগে কর্মরত ব্রাদার গোলাম রসুল বললেন, 'কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আজকে সবাই একটু দায়িত্বসচেতন হয়েছে। '

সকাল সাড়ে ৮টা থেকে প্রশাসনিক কাজ শুরুর এবং বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার খোলার কথা থাকলেও সকাল ৮টা ১৫ মিনিটেই দেখা গেল টিকিট কাউন্টার খোলা। দায়িত্বপ্রাপ্ত যথারীতি কাজ করছেন।

অবশ্য সকাল ৯টার মধ্যে দেখা গেল সব বিভাগের চিকিৎসকরা এসে গেছেন, রোগীও দেখতে শুরু করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, এভাবে যদি প্রতিদিন চিকিৎসকরা সময় দিতেন তাহলে রোগীদের দুর্ভোগ অনেক কমে যেত।

হাসপাতালের বহির্বিভাগে সন্তানকে চর্মরোগের চিকিৎসক দেখাতে নিয়ে এসেছেন নেয়াজপুরের নূর বানু (৩৪)। যথারীতি চিকিৎসক দেখিয়ে এবং হাসপাতাল থেকে বিনা মূল্যে ওষুধ পেয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় তাঁকে খুশি মনে বাড়িতে ফিরে যেতে দেখা গেল।

গতকাল কালের কণ্ঠে খবর প্রকাশের পর অবহেলিত ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দুজন চিকিৎসক রোগীদের দেখভাল করেন। সকাল ১০টায় আসেন শিশু মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনুল ইসলাম। এরপর আসেন ডা. খোকন দেবনাথ।

এ বিষয়ে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স সিটু রানী বলেন, গতকাল সকাল ও দুপুরে দুই দফায় চিকিৎসকরা ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন।


মন্তব্য