kalerkantho


ভয়ংকর ৩ জুয়াসম্রাটের সন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ আগস্ট, ২০১৭ ১২:১৩



ভয়ংকর ৩ জুয়াসম্রাটের সন্ধান

গাজীপুরে তিন ভয়ংকর জুয়াড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। পৃথক এলাকার বাসিন্দা ও কর্মজীবনের শুরুতে ভিন্নতা থাকলেও এখন তাঁদের পেশা এক। একেবারে নিঃস্ব অবস্থা থেকে মাত্র দুই-তিন বছরে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। শুধু গাজীপুর নয়, সারা দেশে তাঁরা জুয়াড়িসম্রাট হিসেবে পরিচিত।

রাশিদুল আলম রানা
স্থানীয় লোকজন জানায়, শ্রীপুর উপজেলার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড (মাওনা মুষ্ঠাপাড়া) গ্রামের মৃত আবদুর রহিমের একমাত্র ছেলে রাশিদুল আলম রানা ওরফে রাশেদ (৪৫)। অভিনয়ের ঝোঁক থাকায় স্কুলে পড়া অবস্থায় যোগ দেন যাত্রাদলে। সেখান থেকে ঢাকার এক মঞ্চ নাটকের দলে। একপর্যায়ে আবার যাত্রাদলে ফিরে আসেন। ১৮-২০ বছর যাত্রাদলে থেকেও ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেননি তিনি। গত বছর শীতের শুরুতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে শ্রীপুরের মাওনা শিল্প এলাকাসংলগ্ন বেরাইদের চালা গ্রামে শুরু করেন জুয়ার আসর। মাত্র তিন-চার মাসে ভাগ্য বদলে যায় তাঁর।

বেরাইদের চালায় শুরু করলেও মালিক আরিফকে রাজেন্দ্রপুরের মাঠ থেকে হটিয়ে রানা আসর বসান। সম্প্রতি প্রায় কোটি টাকা দিয়ে বাড়ির কাছে জমি কিনেছেন এক বিঘা। বাড়ির জীর্ণ ঘর পাকা করেছেন। কিনেছেন দুটি প্রাইভেট কার ও দুটি বড় সর্বাধুনিক মডেলের মাইক্রোবাস। তাঁর দুই স্ত্রী রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী জানান, যাত্রাদলে থাকা অবস্থায় রানা জড়িয়ে পড়েন জুয়া-হাউজি খেলায়। একসময় যাত্রার কদর কমে গেলেও জুয়া-হাউজি খেলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। তাঁর ছিল নিত্য অভাবের সংসার। গত বছর জুয়ার আসর বসানোর পর ভাগ্য বদলে যায় তাঁর। রাতারাতি জমি, গাড়ি-বাড়ি হয়। শ্রীপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতা রানার জুয়ার মাঠের অর্থের জোগানদাতা ছিলেন। সব মহলকে ম্যানেজ রাখতে জুয়ার মাঠের পেছনে খরচ হতো প্রতিদিন ২৫-২৬ লাখ টাকা। লাভের টাকা থেকে ওই যুবলীগ নেতা প্রতিদিন নিতেন দুই লাখ টাকা।

আরিফ হোসেন
কাপাসিয়ার নওরোত্তমপুর গ্রামের আরিফ হোসেন আরিফের (৪০) বাবা দুলা মিয়া ছিলেন দরিদ্র কৃষক। অভাব-অনটনের কারণে দুই ছেলের মধ্যে বড় আরিফ অল্প বয়সে মুরগির ব্যবসা শুরু করেন। ঘুরে ঘুরে এলাকার পোল্ট্রি ফার্ম থেকে মুরগি কিনে পিকআপে করে ঢাকার আড়তে নিয়ে বিক্রি করতেন। ব্যবসার ফাঁকে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে গিয়ে জুয়া খেলতেন। একপর্যায়ে জুয়ায় পুঁজি খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। পাঁচ-ছয় বছর আগে নেত্রকোনার এক জুয়াড়ির অর্থায়নে শুরু করেন আসর। ঢাকার আশুলিয়া, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ হয়ে সর্বশেষ দুই বছর আগে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে গজারি বনে আসর বসান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি কোটিপতি। যাতায়াত করেন প্রাইভেট কারে।

নওরোত্তমপুর গ্রামের এক ব্যবসায়ী জানান, তিন বছর আগেও আরিফ খুপড়ি ঘরে থাকতেন। দেনার দায়ে এলাকায় যেতেন না। এখন তাঁর সেই অবস্থা আর নেই। গ্রামে টিনশেড বাড়ি করেছেন। টিউবওয়েলের পরিবর্তে বসানো হয়েছে বৈদ্যুতিক মোটরচালিত পাম্প। স্ত্রীর নামে গ্রামে এক বিঘা কৃষিজমি কিনেছেন। গ্রামে পাকা মসজিদ ও মক্তব তৈরি করেছেন। টাইলসের ফিটিংয়ে তৈরি মসজিদটি বেশ সুরম্য। নানাবাড়ি চালার বাজারের কাছে পাঁচ কাঠা জমির ওপর পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। বারিষাব ইউনিয়ন পরিষদের বিগত নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আরিফ। তবে ভোট পেয়েছিলেন মাত্র হাজারখানেক।

শফিকুল ইসলাম শবি
গাজীপুর সদরের শিরিরচালা গ্রামের ক্ষুদ্র সবজি বিক্রেতা শরাফত আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম শবিকে (৪০) গ্রামের মানুষ চিনতেন ভবঘুরে হিসেবে। কারো কারো কাছে তিনি পরিচিত ফোরটুয়েন্টি শবি নামে। থাকতেন বনের জমিতে। ছোট থেকে দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন। বহু চেষ্টা করেও তাঁকে স্কুলে পাঠাতে পারেননি বাবা। সুযোগ পেলেই জুয়া খেলতেন। কয়েক বছরে আগে ধারাদেনা করে ছেলেকে সৌদি পাঠান বাবা। কিন্তু ওখানেও রোজগারের টাকায় জুয়া খেলে নিঃস্ব হয়ে তিন-চার বছর আগে ফিরে আসেন শবি। দেশে এসে জুয়া খেলতে গিয়ে পরিচয় হয় রাজেন্দ্রপুরের জুয়ার মাঠের মালিক আরিফের সঙ্গে। জুয়া খেলায় তাঁর দক্ষতা দেখে আরিফ তাঁর জুয়ার আসরের প্রধান সহকারী নিয়োগ দেন শবিকে। গত বছর তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে সদর উপজেলার বাঘেরবাজারে নতুন আসর বসান শবি। তাঁর আসরের অর্থের জোগানদাতা ছিলেন নেত্রকোনার একটি পৌরসভার দুজন কাউন্সিলর। একপর্যায়ে কৌশল খাটিয়ে আরিফের জুয়ার মাঠ বন্ধ করিয়ে একক আসর বসান শবি।

প্রতিবেশীরা জানায়, শবি গত বছর বনের জায়গার ভাঙাচোরা ঘর ভেঙে টিনশেড বাড়ি করেছেন। বাড়ির কাছে মিয়া চান হাজির কাছ থেকে পাঁচ কাঠা জমি কিনেছেন। ওই এলাকার প্রতি কাঠা জমির দাম পাঁচ-ছয় লাখ টাকা। কিনেছেন দুটি প্রাইভেট কার। সব মিলিয়ে বিয়ে করেছেন তিনটি। সর্বশেষ ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছেন তাঁর জুয়ার মাঠের ক্যাশিয়ারের স্ত্রীকে।

এ বিষয়ে রাশিদুল আলম রানা ওরফে রাশেদ বলেন, আমার জুয়ার ব্যবসা ছিল না। হাউজি ব্যবসাও ছিল না। তবে মাঝেমধ্যে হাউজি খেলতাম। আরিফ হোসেন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখেন। এ কারণে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শফিকুল ইসলাম শবি বলেন, ছয় মাস ধরে ব্যবসা বন্ধ। তার আগে এক মাস চলেছে। তবে জুয়া না, হাউজি চলত।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এ জুয়াড়িদের নিয়ে সম্প্রতি জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা হয়। গত ১১ জুলাই গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাহেনুল ইসলাম র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন), এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) ও আনসার সদস্যের নিয়ে অভিযান চালান। পুড়িয়ে দেন জুয়ার আসর। সম্প্রতি এঁরা নতুন করে আসর বসানোর চেষ্টা করছেন। আগে জুয়ার আসর থেকে পুলিশ প্রতিরাতে ১৭ লাখ টাকা পেত। ফলে জুয়া বন্ধে তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এ বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, তিন মাস ধরে যোগদান করেছি। এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিল। জুয়ার মাঠ ভেঙে দিয়েছি। সুন্দর গাজীপুর গড়ার লক্ষ্যে ভবিষ্যতে কোনো রকম অবৈধ কার্যকলাপ করতে দেওয়া হবে না।

 



মন্তব্য