kalerkantho


পুরান ঢাকায় অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা

ডিবির এসিকে গুলি করে সন্ত্রাসী কচির সহযোগীরা

রেজোয়ান বিশ্বাস    

১৬ আগস্ট, ২০১৭ ১১:১০



ডিবির এসিকে গুলি করে সন্ত্রাসী কচির সহযোগীরা

পুরান ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে 'কচি বাহিনী'। এই সন্ত্রাসী দলের প্রধান সাইফুল ইসলাম কচি ওরফে পেটকাটা কচি। তার দল এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, হত্যা ও গুমের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সন্ত্রাসীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে পুলিশকেও ছাড়ছে না। গত শনিবার তারাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার (এসি) রাহুল পাটোয়ারীকে গুলি করে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা কচি ও তার সহযোগীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। একসময় এলাকাটির অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ডাকাত শহীদ নিহত হলে তারই সহযোগী কচি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশ কচি ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কারণ তার পেছনে আছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদ! স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পুরান ঢাকার কয়েকটি থানা পুলিশের খাতায় অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। এরা সবাই কচির সহযোগী।

 
গত সোমবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এসি রাহুল পাটোয়ারীকে দেখতে গিয়ে পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, 'এসি রাহুল পাটোয়ারীর ওপর যারা গুলি করেছে, তারা স্থানীয় সন্ত্রাসী। তাদের সম্পর্কে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।' চিকিৎসকরা বলেছেন, গুলিতে রাহুলের খাদ্যনালি ছিদ্র হয়ে গেছে। এ যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পেলেও দীর্ঘদিন ভুগতে হবে তাঁকে।    

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কচি বাহিনীর প্রধান সমন্বয়ক মাসুদ ও চিশতী। পুরান ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা ফরিদাবাদ, গেণ্ডারিয়া, বাহাদুরপুর লেন, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট আয়রন মার্কেট, ঢালকানগর লেন, ফায়ার সার্ভিসের গলি, পোস্তগোলা নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র গলি, নওজোয়ান ক্লাব ও জুরাইন মার্কেট এলাকা এই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। পোস্তগোলা শ্মশানঘাট পশুর হাটও তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রতিবছর কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয় এই বাহিনীর মাধ্যমে। জুরাইন মার্কেটে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে মাসুদ। আগে রহিম হাজির নিয়ন্ত্রণে ছিল এই মার্কেট। প্রতি মাসে সেখান থেকে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী বলেন, 'আমাদের করার কিছুই নেই। এই চাঁদা না দিলে ব্যবসাও করা যাবে না।' 

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, শ্যামপুর-জুরাইন এলাকার মাদকের সবচেয়ে বড় স্পট হলো আর্সিনগেট। সেখানকার চাঁদা চিশতী ও জাহাঙ্গীরের কাছে পৌঁছে যায়। প্রতি মাসে অর্ধকোটি টাকা চাঁদা তুলে কচির কাছে পাঠায় তারা। কচি এই টাকার ভাগ সহযোগীদের দেয়।   

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, সাইফুল ইসলাম কচি ওরফে পেটকাটা কচির দল অবৈধ অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করে চলেছে। পুরান ঢাকার সব সন্ত্রাসী গ্রুপ কচি বাহিনীর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া নেয়। এই গ্রুপটি নাইন এমএম পিস্তল ও টুটু বোরের রিভলবারের গুলি বিক্রি করে। এদের কাছে অস্ত্র ও গুলি কেনার জন্য সোর্সের মাধ্যমে ছদ্মবেশে ফাঁদ পাতে ডিবি পুলিশ। গত শনিবার রাতে ডিবির এসি রাহুল পাটোয়ারীর নেতৃত্বে একটি দল সেখানে যায়। অস্ত্র কিনতে আসা ব্যক্তিরা যে পুলিশের সদস্য, তা সন্ত্রাসীরা টের পেয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগে সন্ত্রাসীরা ডিবি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ পুলিশের সোর্সের নাম মৃদুল বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁর নাম সোহেল। একসময় সোহেল কচি বাহিনীর সদস্য ছিল। সোহেলের চাচা স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় পুরান ঢাকার মূর্তিমান আতঙ্ক ছিল কুখ্যাত সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ। ২০১২ সালের ৪ জুলাই লক্ষ্মীবাজার এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ডাকাত শহীদ নিহত হয়। এরপর পুরান ঢাকার একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে কচি বাহিনীর হাতে। কচিও আগে ডাকাত শহীদের সহযোগী ছিল। পরে সে মাসুদ, মুহিত, চিশতী, রনি, শান্ত, জাহাঙ্গীরসহ অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী নিয়ে গড়ে তুলেছে 'কচি বাহিনী'।

 



মন্তব্য