kalerkantho


৫০ শয্যার সরঞ্জাম, সেবা ১০০ শয্যার

চিকিৎসক না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

কাজল কায়েস, লক্ষ্মীপুর    

১৬ আগস্ট, ২০১৭ ১০:২৭



চিকিৎসক না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

১০০ শয্যা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পরও লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল আগের ৫০ শয্যার সরঞ্জাম দিয়েই চলছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আগের তুলনায় এখন ভালো বলে ভর্তি হওয়া রোগীরা খুশি। তবে চিকিৎসক না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে বহির্বিভাগে আসা রোগীদের। সেবা না নিয়েই ফিরে যাওয়ার নজিরও কম নেই। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে মেঝেতে থাকতে হয়।

এ ছাড়া একসময় এই হাসপাতালে দালাল এবং বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের ব্যাপক আনাগোনা ছিল। দালালদের হাতে রোগী ও তাদের স্বজনদের নাজেহাল হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। সম্প্রতি কয়েক দালালকে হাতেনাতে আটক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড দেওয়ায় এখন তারা কৌশল পরিবর্তন করেছে। রোগীর স্বজন সেজে এখনো কিছু দালালের বিচরণ রয়েছে। ওষুধ কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সপ্তাহে তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বিনা মূল্যে রোগীদের সেবা দেওয়া হয়।

সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত চিকিৎসকরা রোগী দেখেন। এ সময় জরুরি বিভাগে ১৬ জন ভর্তি ও ১৩ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে। বহির্বিভাগে দুই শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ সেবা গ্রহণ করেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৫০ শয্যার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক-কর্মচারীর পদ রয়েছে ১২৪টি। এর মধ্যে কর্মরত ৬৯ জন। পাঁচজন চিকিৎসকসহ ৫৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সরকার ২০০৩ সালের ৪ জুন ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় হাসপাতালটি উন্নীত করে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও নির্দিষ্ট জনবল পাওয়া যাচ্ছে না।

গতকাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১৩ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নির্দিষ্ট সময়েই কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে অপেক্ষা করেছে। একজন চিকিৎসকও ঠিক সময়ে আসেননি বলে অভিযোগ করে তারা। ২০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা দেরিতে এসেছেন চিকিৎসকদের অনেকে দাবি করে রোগীরা বলে, এ কারণে চেম্বারের সামনে লাইন পড়ে দীর্ঘ। সাধারণ কর্মজীবী পেয়ারাপুর গ্রামের মো. ইউছুফ ও চর রুহিতার জব্বর মাস্টারের হাট এলাকার আবদুর রহিম জানান, সন্তানদের চিকিৎসক দেখাতে এসে তাঁদের দিনের কাজ শেষ। সকাল সাড়ে ৭টায় তাঁরা হাসপাতালে এলেও বের হয়েছেন ১১টার দিকে। এতে তাঁদের দিনের কাজের সময়ও ফুরিয়ে গেছে।

হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় মেঝেতে বসে বাবা ননী গোপাল দাস জ্বর আক্রান্ত ছেলে শান্ত রায়ের সেবা করছিলেন। তিনি বলেন, কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে সোমবার রাতে ভর্তি করা হয়। বেড খালি না থাকায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

সদর মডেল থানার পুলিশ সদস্য ফরিদ উদ্দিন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার থেকেই পেয়িং রুমের ৯ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, বাথরুমসহ হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে। তবে বেশির ভাগ রোগী বাইরে থেকে আনা তাদের স্বজনদের খাবার গ্রহণ করে।

পুরুষ ও মহিলা এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, থাকার বেড পরিষ্কার রয়েছে। বাথরুমগুলো ব্যবহারে রোগীদের বেগ পেতে হয় না। তবে নিচতলায় দক্ষিণে জরুরি বিভাগের পাশের ওয়াশরুম ব্যবহারের অনুপযোগী। বেসিনগুলো নোংরা।

১০ টাকা বাসভাড়া নিয়ে হাসপাতালে আসেন উপজেলার লাহারকান্দি ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের নুরুজ্জামান (৬৫)। শ্বাসকষ্ট আর জ্বরে আক্রান্ত তিনি। কাউন্টার থেকে বিনা মূল্যে (শোক দিবস উপলক্ষে) টিকিট নিয়ে কক্ষে গিয়ে চিকিৎসক দেখান। এরপর তাঁকে তিন পাতা সলবিউটামল, ক্যালসিয়াম ল্যাকটেট ও প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে চিকিৎসা পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

হাসপাতালের ওপর আস্থাহীনতা থেকে অনেকে ঝুঁকি নিয়ে নিজেই ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলে। পৌরসভার মটকা মসজিদ এলাকার রিকশাচালক মো. হাসেম বলেন, 'হাসপাতালে গেলে ডাক্তার পাই না। এ জন্য সময় ব্যয় না করে বাড়ির সামনের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে নেই। তাতেই প্রতিকার পাওয়া যায়।' সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর ৪৫০ টাকার ওষুধ কিনে খেয়েছেন।

এক্স-রে বিভাগের (কক্ষ নং-এ ১৩১) কক্ষের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, দরজা ও জানালায়  নোটিশ : 'এক্স-রে ফিল্ম সরবরাহ না থাকায় সকল প্রকার এক্স-রে বন্ধ রয়েছে'। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) মো. ছেফায়েত উল্যা জানান, ৭ আগস্ট থেকে এক্স-রে ফিল্ম নেই। বিষয়টি জেলা সিভিল সার্জন ও আরএমওকে জানানো হয়েছে। ওই কক্ষে প্রতিবেদক অবস্থানকালে উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের মো. সুমন পায়ে সমস্যা হওয়ায় টিকিট নিয়ে এক্স-রে করাতে আসেন। হাসপাতালে ফিল্ম না থাকার কথা জেনে তিনি ফিরে যান। পরে বেসরকারি উপশম হাসপাতালে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এক্স-রে করান।

উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার জাকির হোসেন শিবলুর সঙ্গে দুপুরে তাঁর কক্ষেই কথা হয়। তিনি বলেন, 'সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছি। প্রতিদিন আমি ১২০ থেকে ১৫০ জন রোগী দেখি। অনেক সময় চাপে হাঁপিয়ে উঠতে হয়। চিকিৎসক সংকটের কারণেই রোগীর চাপ বেশি থাকে।'

সকাল ১১টা ২০ মিনিটে আসেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার মোস্তফা খালেদ। তিনি আধাঘণ্টা অবস্থান করে বেরিয়ে যান। হাসপাতালের সমস্যাগুলো নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেছেন, 'আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি আন্তরিকভাবে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে। চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকট থাকার কারণে তা পুরোপুরি দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আগের তুলনায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বেড়েছে এবং চিকিৎসার স্বাভাবিক পরিবেশ আনতে আমরা সক্ষম হয়েছি।'

সিভিল সার্জন আরো বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের একটি টেন্ডার এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে রোগী কিছুটা বেশি সুবিধা পাবে। চিকিৎসকদের কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 



মন্তব্য