kalerkantho


কারাগারে রাজার হালে তুফান, কষ্টে ধর্ষিতা ও তার মা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও বগুড়া   

১১ আগস্ট, ২০১৭ ১১:০৬



কারাগারে রাজার হালে তুফান, কষ্টে ধর্ষিতা ও তার মা

বগুড়ার চকসূত্রাপুরে এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া শহর শ্রমিক লীগের (বহিষ্কৃত) নেতা তুফান সরকার কারাগারে আরাম-আয়েশেই দিন কাটাচ্ছে। কারা কর্মচারী-কর্মকর্তারা 'বিশেষ কারণে' তুফান ও তার সহযোগীদের সেবা-যত্নে কোনো ত্রুটি রাখছে না। বগুড়া কারাগারের একাধিক সূত্র এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

এদিকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার মেয়েটি রাজশাহীর সেফহোমে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকা তার মাও আছেন মানসিক যন্ত্রণায়। তাঁরা নিজেদের এই অবস্থাকে বন্দিজীবন বলে আখ্যায়িত করছেন। মেয়েটির মা বলছেন, তাঁরা মা-মেয়ে এক সঙ্গে থেকেই তুফান, মারজিয়া হাসান রুমকিসহ আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান।

অন্যদিকে আলোচিত এই ধর্ষণ মামলা তদন্তে গড়িমসি করার অভিযোগ উঠেছে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত সুপার) আরিফুর রহমান মণ্ডল তাঁকে ডেকে পাঠান। তিনি মামলার তদন্তের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

আরিফুর রহমান মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যেহেতু মামলার আইওর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে সে কারণে তাঁকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। পুলিশের দিক থেকে আলোচিত এই মামলাটি তদন্তে কোনো করম গাফিলতি করার সুযোগ নেই।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তরুণী ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করে মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা খাতুন, শাশুড়ি রুমি খাতুন, স্ত্রীর বড় বোন পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকি প্রকাশ্যে ও মিডিয়ার কাছে ঘটনার কথা স্বীকার করলেও পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার পরই তারা বদলে যায়। এ কারণে তুফানকে চার দফা, রুমকিকে তিন দফায় এবং অন্যদের এক দফা করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তার পরও এই চারজনকে আদালতে হাজির করা হলে তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করতে রাজি হয়নি। শেষবার আদালতে হাজির করার সময় তুফান এমনভাবে অভিনয় করে যেন মনে হয় পুলিশ তাকে পিটিয়ে অসুস্থ বানিয়েছে। শেষ দফায় আদালত তুফানের জামিনের আবেদন নাকচ করে দিলে তখনই বদলে যায় তুফানের চালচলন। আর যখন জেলখানায় নেওয়ার জন্য পুলিশ ভ্যানের দিকে নেওয়া হয় তখন সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে প্রিজন ভ্যানে ওঠে। রাজনৈতিক নেতার স্টাইলে হাত নেড়ে তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের উদ্দেশে বলে, 'মামারা চিন্তা করিস না, আবার দেখা হবে।'

ওই দৃশ্য দেখে অনেক আইনজীবী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনেরও দাবি তোলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বগুড়ার আদালতে বেশ কয়েকজন আইনজীবী বলেন, পুলিশই কি তবে তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি না দেওয়ার কথা বলে দিয়েছে!

গতকাল বগুড়া কারাগারের একাধিক সূত্র জানায়, তুফানের মতো বিত্তবান কারাবন্দিদের কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ গুরুতর অপরাধে যেসব কয়েদির দীর্ঘ সাজা হয়, সেসব কয়েদিকে কারা কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তাদের ম্যাট পদে নিয়োজিত করে। আর ম্যাটেরা বন্দিদের সার্বিকভাবে দেখাশোনার নামে নগদ সুবিধা নেয়। এর বিনিময়ে নিজেদের পছন্দের অন্য কয়েদি বা হাজতিদের দিয়ে কারা অভ্যন্তরেই নানা ধরনের বৈধ-অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। তুফান ও তার সহযোগীরাও সে রকম ‘রাজার হালেই’ আছে।

জানতে চাইলে বগুড়া কারাগারের সুপার মোকাম্মেল হক বলেন, আদালতের নির্দেশে তুফান যেদিন কারাগারে আসে সেদিনই তার নামে পিসিতে (প্রিজনস ক্যাশ) ২০ হাজার টাকা জমা হয়েছে। মঙ্গলবারও কেউ একজন ১০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। এ ধরনের ক্যাশ ডিপোজিট কারাবিধিতে বৈধ। কারাগারের ভেতরে এই পিসি থেকে অর্থ উঠিয়ে ক্যান্টিনে খাওয়া-দাওয়া করা যায়। আরো কিছু সুনির্দিষ্ট খরচ করা যায় এই অর্থ থেকে।

গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার দরিদ্র পরিবারের মেয়েটি ও তার মা ভালো নেই। রাজশাহীতে সোফহোম ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে তাঁরা খাবারসহ অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছেন ঠিকই, তবে আলাদা করে রাখায় মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন দুজন।

গতকাল বিকেলে মেয়েটির মা মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা ভালো নাই। আমার বেটিটাও ভালো নাই। আজ দুপুরে মোবাইল ফোনে কথা হইছে, কান্নাকাটি করে। কোনো দিন একা থাকে নাই। এখন শরীর আর মনের কী অবস্থা! এর মধ্যে ও আমারে ছাড়া কেমনে থাকবে!'’ তিনি আরো বলেন, 'আমরা গরিব মানুষ হলেও একমাত্র সন্তানটারে যত্নে রাখি। ও মোটা চাউলের ভাত খেতে পারে না।' তিনি আরো বলেন, নিরাপত্তা হেফাজতে তাঁদের যত্ন নিচ্ছেন পুলিশ ও সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে মা-মেয়েকে আলাদাভাবে আটকে রাখার কারণে তাঁরা নিজেদের বন্দি বলে মনে করছেন। সুখ-দুঃখের অনুভূতি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁরা পরামর্শ করতে পারছেন না। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই তাঁরা কিভাবে চালাবেন তাও বুঝতে পারছেন না।

ধর্ষিতা মেয়েটির মা বলেন, তাঁর মা ও বোন আজ (বৃহস্পতিবার) তাঁদের দেখতে গেছেন। কাল (আজ শুক্রবার) মেয়েটির বাবা দেখতে যাবেন। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা একসঙ্গে থাকার জন্য আদালতে আবেদন করবেন বলেও জানান তিনি।

 



মন্তব্য