kalerkantho


'কোনটা দালাল আর নেতা, কোনটা রোগী বুঝতে পারি না'

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী   

১০ আগস্ট, ২০১৭ ১০:৫৬



'কোনটা দালাল আর নেতা, কোনটা রোগী বুঝতে পারি না'

সকাল সাড়ে ৮টা। নরসিংদী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে জ্বর ও খিঁচুনির সমস্যা নিয়ে নীলা নামের ৯ মাসের একটি শিশুকে নিয়ে আসে তার বাবা। মেয়েকে নিয়ে অস্থির বাবা সুশীল দাস কর্তব্যরত চিকিৎসককে ডেকে নিয়ে আসেন। চিকিৎসক ডা. নাদিরুল আমিন শিশুটিকে অক্সিজেন লাগিয়ে একটি ইনজেকশন দেন এবং প্রয়োজনীয় অন্য চিকিৎসাও দেন। এরপর রুকু মিয়া নামের এক ব্যক্তি সুশীলকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা হবে না। যেকোনো সময় তাঁর মেয়ের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, এমনও ভয় দেখান। ফলে মেয়ের জীবন বাঁচাতে দালালদের সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালে ছোটেন সুশীল। জানা গেল, এই রুকু মিয়া একজন দালাল।

এটা নরসিংদী সদর হাসপাতালের খণ্ডচিত্র। জরুরি বিভাগে কে হাসপাতালের সেবক (ব্রাদার), আর কে দালাল তা কোনো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। পুরো বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দালালরাই রোগীদের নিয়ে ডাক্তার দেখাচ্ছে, কাটাছেঁড়া করছে। আর সুযোগ বুঝে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা উন্নত চিকিৎসার কথা বলে অসহায় রোগীদের নিয়ে বাণিজ্যে মেতে উঠছে। তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছে হাসপাতালের সেবক (ব্রাদার) ও কর্মচারীরা। স্থানীয় রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি ও ক্যাডারদের নাম ভাঙিয়ে দালালরা এই ‘রামরাজত্ব’ কায়েম করেছে। কিন্তু দালাল নির্মূলে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

গতকাল বুধবার সকালে জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছিলেন ডা. মহসিনা খান। তাঁর সঙ্গে তিনজন সেবক আবুল হাসেন, আনোয়ার হোসেন ও নজরুল এবং ওয়ার্ড বয় জাকারিয়া দায়িত্বে ছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টা। ততক্ষণে জরুরি বিভাগে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা। কিন্তু জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মহসিনা খানের কক্ষে বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড় জমেছে। তিনি ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে ব্যস্ত। অন্যদিকে টেবিলের সামনে বসা শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন।

রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ থেকে মাথাব্যথা নিয়ে জরুরি বিভাগে আসেন নূর নাহার বেগম (৫০)। চিকিৎসক তাঁকে রক্তসহ কয়েকটি পরীক্ষা করতে বলেন। সেখান থেকে তাঁর পিছু নেন শিউলি নামের এক নারী। তিনি রোগীকে ধরে জরুরি বিভাগ থেকে বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার পথে মুখোমুখি হন এই প্রতিবেদক। হাসপাতালে পরীক্ষা না করে বাইরের হাসপাতালে কেন যাচ্ছেন জানতে চাইলে অসুস্থ নূর নাহার বেগম বলেন, উনি আমাকে জোর করে বাইরে পরীক্ষা করতে নিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সটকে পড়েন শিউলি। আবুল মিয়াকে নিয়ে স্বজনরা জরুরি বিভাগে ছুটে এসেছে। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। ফলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দুপুর ১২টার দিকে জরুরি বিভাগে পাঁচজন রোগী খুঁজে না পাওয়া গেলেও কমপক্ষে ৪০ জন দালাল ও বহিরাগত ছিল। তারা নিজেদের মতো করে জরুরি বিভাগে আসা রোগীকে কাটাছেঁড়া, ইনজেকশন দেওয়াসহ সব ধরনের সেবা দিচ্ছে। এক রোগীকে সেলাই করার সময় কথা হয় বহিরাগত রুমন বিশ্বাসের সঙ্গে। হাসপাতালের কোন দায়িত্বে আছেন জানতে চাইলে নিজেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করে পকেট থেকে একটি কাগজ দিয়ে দেখতে বলেন। সেটি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও সিভিল সার্জনের সুপারিশ করা হাসপাতালের চাকরির আবেদনপত্র। এটা তো চাকরির নিয়োগপত্র না, জানালে রুমন দম্ভের সুরে বলেন, প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশের চেয়ে আর বড় কী আছে? টুকটাক সবই পারি। আমি প্রতিদিন জরুরি বিভাগের লোকজনকে সহযোগিতা করি।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের সঙ্গে এক থেকে দুই হাজার টাকা চুক্তিতে রুমন তাদের কাটাছেঁড়ার মতো স্পর্শকাতর কাজ করেন। এমনকি রোগীদের পরীক্ষা ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির নামে দালালি করার অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত এই ভয়ংকর অনিয়ম হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সূত্র জানায়, সদর হাসপাতাল ঘিরে তৈরি হওয়া হাসপাতালের এ দালালচক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শহরের দত্তপাড়া এলাকার জীবন আহমেদ শফিক। এ তালিকায় আরো আছে কালো মনির, মুন্না, লম্বা রাসেল, রুকু মিয়া, জলিল, রাশিদা, মনি, মুন্নি, আলেক, আকাশ, মহিউদ্দিন, নবী হোসেন বুলেট।

ততক্ষণে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মহসিনা খান নির্ধারিত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেছেন। ফলে আব্বাস নামে এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসক রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। জানতে চাইলে এ চিকিৎসক বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, রোগীর চাপে তিনি ডা. মহসিনা খানকে সহযোগিতা করছেন। আর কোনো জবাব না দিয়ে তিনি টেবিল ছেড়ে চলে যান।

এসব বিষয়ে জানতে ডা. মহসিনা খানের কাছে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক দালাল বহির্বিভাগের রোগী ধরে এনে জরুরি বিভাগ থেকে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে। জানতে চাইলে ডা. মহসিনা খান বলেন, হাসপাতালের জনবলের তুলনায় রোগী বেশি। এত রোগীর ভিড়ে কোনটা দালাল, কোনটা রোগী, কোনটা নেতা বুঝতে পারি না। এগুলো আমাদের পক্ষ থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তিনি আরো বলেন, এগুলো থেকে আমরাও পরিত্রাণ চাই।

তবে দুপুর দেড়টার দিকে জরুরি বিভাগের পরিবেশ স্বাভাবিক হতে থাকে। ওই সময় ডা. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন খান জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জরুরি বিভাগে লোকবল কম থাকায় চিকিৎসাসেবায় অনেক ব্যাঘাত ঘটছে। রোগীদেরও অনেক হয়রানি হতে হচ্ছে। জরুরি বিভাগ থেকে হাসপাতালের কোনো আয় হচ্ছে না, পুরোটাই দালালদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কম্পিউটারের মাধ্যমে রোগীদের টিকিট এবং অন্যান্য খরচাদি মনিটরিং করা হলে হাসপাতালের টিকিৎসার মান ও আয় বাড়বে। এর মাধ্যমে সদর হাসপাতাল মডেল হাসপাতাল হিসেবে রূপান্তরিত হবে। ’

সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতীয় তলায় পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের অভাবে গুমোট পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ১০ জন ইন্টার্ন করতে আসা ছাত্র-ছাত্রী রোগীদের শয্যার কাছে ঘুরছেন। জানতে চাইলে তাঁরা জানান, তাঁরা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থাপত্রে তা নোট করছেন। হাসপাতালের মেঝে কিংবা পায়খানার পরিবেশও নোংরা।

রায়পুরা উপজেলার রাজনগর গ্রামের রেনু বেগম গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু গত দুই দিনে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি জানিয়ে বলেন, ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বাইরে থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছি। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয় তা খাওয়ার উপযুক্ত না। তাই বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে খাবার আনতে হয়। পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেওয়া সদর উপজেলার বুইদ্দামারা এলাকার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, চিকিৎসাসেবার মান মোটামুটি ভালো। তবে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাইনি। বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।

জরুরি বিভাগের পাশাপাশি অ্যাম্বুল্যান্সসেবা চলে গিয়েছে সন্ত্রাসীদের দখলে। শহরের শিববাগ এলাকার কসাই বাবু নামে এক সন্ত্রাসীর মদদপুষ্ট সবুজ অ্যাম্বুল্যান্সের সিরিয়াল দিয়ে গাড়িভেদে ২০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত সেবক বা কর্মচারীরা ২০০ টাকার ভাগ পায়। আগে হাসপাতালে সার্বক্ষণিক সাত থেকে আটটি অ্যাম্বুল্যান্স থাকলেও বর্তমানে থাকছে মাত্র একটি। ফলে নিজেদের ইচ্ছামতো তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় ঢাকা পর্যন্ত রোগী পরিবহন করছে অ্যাম্বুল্যান্সের চালকরা। অথচ সিভিল সার্জনের নির্ধারিত ফি আড়াই হাজার টাকা। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে মা ও শিশু হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্সও। ৮৩০ টাকার নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাম্বুল্যান্সের চালকরা দালালদের সঙ্গে মিলে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ আমিরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, রুমন, শাকিব, রুবেল, সাগর, রাকিবরা মাদকাসক্ত। প্রভাবশালীদের মদদে তারা এলাকার প্রভাব দেখিয়ে হাসপাতালে বেপরোয়া আচরণ করছে। তারা চিকিৎসকদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করছে। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হাসপাতালের চিত্র পাল্টে যাবে।

 



মন্তব্য