kalerkantho


৫২ লাখ টাকা গেল কোথায়?

অভিযোগের তীর নাটোরের এমপির দিকে

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর   

৪ আগস্ট, ২০১৭ ১১:৩৯



৫২ লাখ টাকা গেল কোথায়?

এক হাজার ৩২৭ কেজি গমের বাজারদর ৩৮ হাজার ৪৭৫ টাকা। অথচ এর বিপরীতে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার টাকা। বাকি ২৪ হাজার ৪৭৫ টাকা করে ২১৩ জনের কাছ থেকে কাটলে পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ টাকা। নাটোর-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) শফিকুল ইসলাম শিমুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ২১৩টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে জিআরের (জেনারেল রিলিফ) ডিও (আদেশ) বিক্রির মাধ্যমে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়। এগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণের জন্য এমপি একটি তালিকা দেন। সেই তালিকা অনুসারে ২১৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে ডিও প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা অনুসারে প্রতি টন চালের পরিবর্তে সমমূল্যের এক হাজার ৩২৭ কেজি করে গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১৬ জুলাই এমপি আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ জন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানের হাতে প্রতি এক হাজার ৩২৭ কেজি গমের বিপরীতে ১৪ হাজার টাকা করে একটি খাম তুলে দেন। পরে আওয়ামী লীগের অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ডেকে নিয়ে ১৪ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।

নলডাঙ্গা উপজেলার পিপরুল বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সভাপতি এবং পিপরুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ আলী বলেন, বরাদ্দ করা দুই হাজার ৬৫৪ কেজি গমের বিপরীতে আমার হাতে ২৮ হাজার টাকা তুলে দেন এমপি। প্রকৃত মূল্য চাইলে এমপি আমাকে অনুরোধ করেন বিষয়টি নিয়ে আর কোনো কথা না বলতে। তিনি আরো বলেন, এমপি শিমুল নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দের বিপরীতে কম টাকা দেওয়া অন্যায় ও অবৈধ।

পিপরুল খাঁপাড়া মসজিদ কমিটির সভাপতি সাহেব আলী বলেন, কোনো ডিও পাইনি। এমপি আনুষ্ঠানিকভাবে দেবেন বলে পিআইও ডিওর পেছনে আমাদের স্বাক্ষর নিয়েছেন। পরে এমপি আমার হাতে ১৪ হাজার টাকা তুলে দেন।

পিপরুল সরদারপাড়া কবরস্থান কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম সরদার বলেন, আমাকে দুই টন ৬৫৪ কেজি গমের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার টাকা। অনুরূপ কথা বলেন পিপরুল পশ্চিমপাড়া কবরস্থান ঈদগাহ কমিটির সভাপতি শেখ ইস্কান্দার আলী। নাটোর সদরের পিআইও ও নলডাঙ্গা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত পিআইও আয়েশা সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মধ্যে ডিও দেওয়া হয়েছে। এরপর ডিওগুলো প্রতিষ্ঠানের সভাপতিরা কী করেছেন, তা আমি জানি না। কোনো অনিয়ম করলে তা দেখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তারা তদন্ত করে দেখতে পারে।

নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আকতার বানু বলেন, ‘সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ১০টি টিআর এবং জিআরের ডিও বিতরণ করে পিআইওকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে চলে যান এমপি। ’

নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান বলেন, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। এক হাজার ৩২৭ কেজি গমের ডিওর বিপরীতে তাঁরা মাত্র ১৪ হাজার টাকা পেয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে আমি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। কারণ এমপি ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা এত বেশি প্রভাবশালী যে এ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।

নাটোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শাহিনা খাতুন বলেন, এ অনিয়মের তদন্ত করা হবে। যারাই দায়ী হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি ডিও দিয়েছি মাত্র। এগুলো কোথায় বিক্রি হয়েছে, তা জানি না। রাজনৈতিক কারণে আমার প্রতিপক্ষ এরূপ মিথ্যা অভিযোগ করছে। তা ছাড়া এই ডিওর বিপরীতে এখনো কোনো গম সরবরাহ করা হয়নি। তাহলে দুর্নীতি হলো কিভাবে?

 



মন্তব্য