kalerkantho


আজকাল করবী

ইলিয়াস কামাল রিসাত   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:৫৪



আজকাল করবী

মার নতুন ভাললাগার নাম- ইয়োভাল নোয়াহ হারারি। ‘সেপিয়েন্সঃ আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড’ বইটার প্রেমে না পড়ে উপায় নেই।

যত আবেগঘন মুহূর্তই হোকনা কেন, সেই আবেগের বশে সেপিয়েন্স বই দূরে সরিয়ে রাখবে এমন পাঠক অন্তত আমি নই। প্রিয় মুরাকামির ‘নরওয়েজিয়ান উড’ বইটা পর্যন্ত পড়ায় ব্রেক দিয়েছি এই ‘সেপিয়েন্স’ এর জন্য। এটা বিশাল ত্যাগ স্বীকার আমার জন্য। মুরাকামির পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবে এই ত্যাগ স্বীকারের গুরুত্ব।

 

প্লেন ছাড়ার পরে এয়ার হোস্টেস এসে জিজ্ঞেস করল আমার কোনও ড্রিংকস দরকার কিনা। একটা কোক অর্ডার দিলাম। ১০-১৫ মিনিট পরে বিমানের সিটের সাথে অভিযোজন করার পর ‘সেপিয়েন্স’ হাতে নিলাম। ‘ধরা যাক এবার দু’একটা ইঁদুর’(!)
২১০ পৃষ্ঠায় রোমান সাম্রাজ্যের বয়ান দিচ্ছিলেন প্রিয় হারারি। রোমান সাম্রাজ্য যখন তাদের দিগবিজয়ের চরম তুঙ্গে তখন ১৩৪ খ্রিস্টপূর্বে ছোট শহর নুমানশিয়ার কাছে মোটামুটি প্রায় ধারাশয়ী হতে হয়েছিল রোমানদের।

এমন অবস্থায় রোমান সেনাপতি সিপিও এমালিনিয়াস ‘ব্লকেড কৌশল’ দিয়ে এই নুমানশিয়া শহরকে পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো অভিনব পথ বেছে নিলেন। এক বছরের মাথায় নুমানশিয়া শহরে খাদ্য সংকট, জীবন সংকট দেখা দিল। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের যাঁতাকলে যায় যায় অবস্থা। কিন্তু নুমানশিয়ার জনগণের দৃঢ়চিত্ত ভানুমতির খেল যেন আরো বাকি রেখেছিল। তারা যখন দেখতে পেল যে তাদের পরাজয় আসন্ন, তখন পুরো শহরের অধিবাসী সিদ্ধান্ত নিল নিজেরা নিজেদের পুড়িয়ে মারবে তবু রোমানদের দাস হবেনা। নিজদের পুড়িয়েই ফেলল তারা।
এই বয়ান পড়তে না পড়তেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। কানে বাজছিল জেমস ব্লান্টের নতুন গান ‘বার্টেন্ডার’। নুমানশিয়ার অক্ষর থেকে চোখ সরছিলনা। ঝাপসা ঝাপসা ভাবে মনে আসছিল কানের কোনায় জমা চুমুর আওয়াজ। মৃদু কিন্তু গভীর। মন তখন পড়ে আছে মস্কো’তে।
নুমানশিয়ার আত্মাহুতির সামষ্টিক যন্ত্রণার ছটাক আমার দেহে ছুঁয়ে গেল। করবীর জন্য বেদনা যেন নুমানশিয়ার জন্য চিৎকার করে কেঁদে উঠছিল। পাঠকমাত্রই প্রশ্ন ছুঁড়তে পারেন কিংবা তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে পারেন-‘করবীর জন্য বেদনা নিছক ব্যক্তিগত বেদনা, সেখানে নুমানশিয়ার বিদ্রোহী জনতার মত গৌরবান্বিত ব্যাপার ধারেকাছেই আসতে পারেনা। জনতার সংগ্রাম সবসময় সবকিছুর ঊর্ধ্বে’।
আমি জানি ইতিহাসের এই নৈর্ব্যক্তিকতা। মানব সমাজের সমগ্রতা আমি বুঝি। ঠিক যেমনভাবে আমার মগজে কিংবা মননে গেঁথে থাকে কার্ল মার্কসের মহান বাণী-“এ জগতের ইতিহাস হলো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’।
কিন্তু কেন জানিনা, মস্কো থেকে বাংলাদেশ গামী ঐ বিমানে ঠিক ঐ মুহূর্তে নুমানশিয়ার ইতিহাস পড়ার পরে আমার বার বার মনে পড়ছিল করবীর সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো। করবীর রুমে যে খাট তা দুইজনের জন্য বেশ ছোট হয়ে যায়। কোনরকম গাদাগাদি করে থাকা যায়। কিন্তু রুমটা অনেক বড়। তাই যে দিনগুলোতে আমরা গাদাগাদি করে থাকতে চাইনা সেই সময় আমি নিচে থাকি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তেমন কোন এক দিন আমি মোবাইলে ‘বার্টেন্ডার’ গানটা বাজালাম।
গানের সাউন্ডে ঘুম ভেঙে গেল করবীর। আমি ফ্লোরে গান বাজিয়ে তার দিকে চেয়ে আছি। কি এক অজানা কারণে আমরা দুইজনই বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম। করবীর বুকে চাপা কষ্ট। আমারো কি যেন বলার আছে। কেউ কিছু বলতে পারছিনা। মাঝে গানের কলি ভেসে আসছে।
এই গানের সাথে আমার ও করবীর বিচ্ছেদের মায়া জড়িয়ে আছে। ঠিক যতটুকু দূরত্ব তার বিছানা ও আমার ফ্লোরের ঠিক তার চেয়েও বেশি দূরত্ব আমাদের মনে। ইদানিং করবীর কথা ভাবলে মুরাকামির ‘স্লিপ’ গল্পের কথা খুব মনে পড়ে।
গল্পটা এরকমঃ এক মহিলা সুখের সংসারে স্বামী, পুত্র নিয়ে বেশ ভাল আছে। নিরুপদ্রব জীবন। ডেন্টিস্ট স্বামী, স্কুল পড়ুয়া পুত্র, গৃহিণী স্ত্রী :রুটিনবাঁধা জীবন।
হঠাত এক রাতে আর তার ঘুম আসলনা। টানা ১৭ দিন। ঘুম না আসায় তার কোন শারীরিক কষ্টও অনুভূত হচ্ছেনা। বরং রাতে একা একা সে আবিষ্কার করল, পুরনো অভ্যাস বই পড়া আর চকলেট খাওয়ায় সে আবার ফিরে পেয়েছে।
বৈচিত্র্যহীন, ছকে বাঁধা জীবনে তার মনে হল একটা গতি এসেছে! রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে সে তখন তলস্তয়ের 'আন্না কারেনিনা' নিয়ে বসে। বার বার পড়ে। নতুন কিছু আবিষ্কার করে। ভাবে, তলস্তয় কিভাবে এমন precision নিয়ে মানব চরিত্র অংকন করেছেন!
একটা সময় বাস্তব আর ঘুমহীন অবচেতন অবস্থার ভেদ ঘুচে যায়। রাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। দরজা বন্ধ রেখে বসে থাকে। হাজার চেষ্টা করেও সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসতে পারেনা।
দার্শনিক সমস্যা দেখা দেয়: মৃত্যু কি 'ঘুম' এর চিরস্থায়ী সম্প্রসারণ নাকি ঘুমের সাথে মৃত্যুর সম্পর্কই নেই?
--- like the deep,endless,wakeful darkness I am seeing now.
ঘুম, মৃত্যু, ভালবাসা, জীবন এসবের 'সীমাবদ্ধ' সংজ্ঞা না থাকলে জগতের বিশদ বৈচিত্র্যতা ঢের টের পাওয়া যেত।
গল্পটা পড়ার সময় মাঝে মাঝে মনে হয় মহিলা কি মারা যাবার পর এসব চিন্তা করছেন? নাকি অভিজ্ঞতার অন্য মাত্রায় পৌঁছে মুক্তি চাইছেন "জগতের সীমাবদ্ধতা" থেকে?
করবীর অবস্থা যদি কোনদিন এমন হয়? নিজেকে খুব অপরাধী লাগে। ব্যাপারটা অপরাধের থেকেও গুরুতর কিছু। এই অপরাধের লিগ্যাল কোনও সংজ্ঞা নেই। তবে এতটুকু বলা যায় যে, করবীর আর আমার মনের মাঝে যে দুই মহাদেশ সমান ব্যবধান তার শুরু কিন্তু আরও অনেক আগেই। মফস্বল শহরে তার বাড়ির পাঁচিল বেয়ে সিড়ি আর উঠানের মাঝে একটা লুকোনোর মতো জায়গায় তার শুরু । নতুন প্রেমের উদ্দামতায় সন্ধ্যার পর ছুটে যেতাম ঐ জায়গায়। ঐ স্পেসে। মন দেয়া নেয়ার পরে আমরা দুজন বুঝতে চাইতাম আমাদের মনের বাইরের ভূগোলটাকে। সে সময় করবী একদিন হঠাত বলে উঠেছিল- “যে ছেলে এমন মফস্বল এলাকায়, সন্ধ্যার পরে এমন ঝুঁকি নিয়ে আমাকে ভালোবাসতে আসতে পারে, তার মতো সাহসী ছেলেকে ভালোবেসে আমি সার্থক”
সেদিনই এই কমপ্লিমেন্ট’টা শোনার পর থেকে আমার মনে সন্দেহ ঢুকেছিল করবীর ব্যাপারে। করবীর মহাদেশ আর আমার মহাদেশের মধ্যে তুমুল ব্যবধান সেদিনই টের পেয়েছিলাম। টের পেলেও সাহস হচ্ছিলনা ফিরে আসার। নুমানশিয়ার জনতার মতো সাহস এখনো আমার হয়নি।

২.
অনেক দিন ধরে ভাল ঘুম হচ্ছেনা। ঘুম হচ্ছেনা বলতে ভুল বলছি। ঘুমাইনা বললেই চলে। সারারাত জেগে থাকি। বেডরুম এর ছাদের দিকে টিকটিকির আসা যাওয়া দেখি। ঘুমের স্বপ্ন কিংবা দিবাস্বপ্ন কোনটারই তফাৎ খুঁজে পাচ্ছিনা ইদানীং। এই তো আজকেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে ডেকে বললেন- ‘গতকালকে তোমাকে যে এসাইনমেন্ট টা দিয়েছিলাম তার কি অবস্থা?’
আমি বললাম,‘স্যার, কালকে দেননি, আজকেই দিলেন মাত্র’।
আমার দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে স্যার তার স্মার্টফোনে ‘টু ডু’ লিস্টে আমার নাম, এসাইনমেন্ট, ও তারিখ দেখালেন। আমি চুপ মেরে গেলাম। ঘুম না হলে আজ-কাল এর ব্যবধানটা ঘুচে যায়। নিজেকে অসহায় লাগে তখন।
করবীর শেষ দিনগুলোতে ‘আজ নাকি কাল’ এ নিয়ে প্রচণ্ড ঝগড়া লাগত আমার সাথে। করবী গুলিয়ে ফেলত আজ কিংবা কালের গতিধারা। আমি বুঝতে পারতামনা এই গুলিয়ে ফেলার অর্থ। আমার স্যারের চেয়েও গাঢ় বিরক্তি চোখে আমি তাকিয়ে থাকতাম তার দিকে।

৩.
আজ অব্দী সব অর্থ ধরতে পেরেছি একটা ছাড়া। নুমানশিয়ার জনতার বিদ্রোহের সাথে করবীর সম্পর্কটার যোগসূত্র আজও ঘটাতে পারিনি। মুরাকামির ‘স্লিপ’ গল্পের মতো ধোঁয়াশা লাগছে সব। আজ কিংবা কালের কোন কিছুই থাকবেনা আর।


মন্তব্য