kalerkantho


নওশাদ জামিলের কবিতা : প্রাসঙ্গিক কথা

নাজিয়া ফেরদৌস   

১৬ জুলাই, ২০১৭ ১৮:২৫



নওশাদ জামিলের কবিতা : প্রাসঙ্গিক কথা

দ্বন্দ্ব জটিল জীবনাবর্তে সহজতার শিল্প অনুসন্ধান সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। সহজ কথা খুব সহজ করে বলার জটিলতায় পড়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। আধুনিক বিশ্ব জটিল চিন্তা চেতনার আবর্তে ঘূর্ণায়মান। সহজতার পরশ থেকে তা ক্রমেই দূরবর্তী পথের যাত্রী। জীবন জটিলতার গভীর থেকে সাহিত্যে সহজতার সূত্র যিনি তুলে আনতে পারেন তিনিই প্রকৃত সাহিত্যিক। সাধারণের মনস্তাত্ত্বিক পরিমণ্ডল প্রকাশে সহজতার সূত্র অপরিহার্য। আধুনিক কবি নওশাদ জামিল এক্ষেত্রে অনেকাংশেই সফল। তাঁর কবিতায় কাব্যভাষা লাভ করেছে অসাধারণত্ব আর সেখানে অভিনবভাবে খচিত হয়েছে বেদনার নৈবেদ্য।  

কবি নওশাদ জামিলের কাব্যগ্রন্থ 'ঢেউয়ের ভেতর দাবানল' বাংলা সাহিত্যে, কবিতার জগতে এক অসাধারণ সংযোজন। যে বাংলা সনেটের সূত্রপাত ঘটেছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে, কালের প্রবাহে পরিবর্তনের ঢেউয়ে সাঁতার কেটে তা আধুনিকে এসে লাভ করেছে নতুন রূপ। মধুসূদনের পর আরো অনেকে সনেট রচনা করেছেন, তবে সনেটিয় ভঙ্গিকে অক্ষুন্ন রেখে ভাবের গভীরতার সাথে সহজতার শিল্পকে গাঁথতে পেরেছেন খুব কম শিল্পীই। 'ঢেউয়ের ভেতর দাবানল' গ্রন্থটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে আছে চতুর্দশপদী কবিতার উত্তাল ঢেউ, একদিকে তা ঘোষণা করছে প্রাত্যহিক জীবনের গ্লানি, ব্যর্থতা, হতাশা, শঙ্কা, আকাঙক্ষার বেদনাহত সুর; অপরদিকে ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে কাঙ্খিত ভবিতব্যের। চতুর্দশপদী কবিতার অষ্টকে ভাবের প্রবর্তনা আর ষটকে পরিণতির কাঠামোকে ঠিক রেখেছেন কবি। কিন্তু উপস্থাপনায় এনেছেন পরিবর্তন। যুক্ত করেছেন নতুন শিল্প শৈলী। একই সাথে কবিতাগুলো হয়েছে সহজ অথচ গভীর বাণীভঙ্গির পরিচায়ক। আধুনিক যুগ বিভিন্ন ইজম দ্বারা প্রবলভাবে তাড়িত। বিচ্ছিন্নতা, দূরত্ব, একাকিত্ব ইত্যাদি বোধ নতুন রূপে আচ্ছন্ন করেছে পৃথিবীকে। পৃথিবীর সর্বত্রই তাই সংশয়, সন্দেহ। চতুর্দশপদীর কাঠামোবদ্ধতার মধ্যে এই বিষয়গুলোর শৈল্পীক উপস্থাপনে সক্ষম কবি নওশাদ জামিল। যুগের যন্ত্রণাকে ধারণ করেছেন তিনি কবিতায়। সহজ ভাষায় ঘটেছে তার উৎসারণ:

'দিনশেষে ঘরে ফিরে খুব
ক্লান্ত হই—দৃশ্যের বাইরে
বিশুদ্ধ প্রাণের বার্তা নিয়ে
জেগে ওঠে তীব্র কথাপুঞ্জ। ' (কথার সিম্ফনি)  

কবির মধ্যে গভীর অনুভূতির সঞ্চারণ ঘটায় একাকিত্ব। বিচ্ছিন্নতা আর দূরত্বের বোধ থেকে তিনি নিজেকে পৃথক করতে পারেন না। উদভ্রান্ত হয়ে ঘোরেন শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে, লোকচক্ষুর অন্তরালে পাখির ডানায় ভেসে ঘরে ফেরার চেষ্টায় ব্রতী হন কিন্তু 'কোথায় সে ঘর?' বলে সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন মুহূর্তে। এসে দাঁড়ান মহাশূণ্যের সিঁড়িতে। তিনি বুক ভরা বেদনা নিয়ে যাত্রা করেন অনিশ্চিতের পথে। তাঁর মর্মলোকে ধ্বনিত হয়—'যেতে যেতে মনে হয় আজ আমি দুয়ারবিহীন'। বেদনাহত মন নিয়েই তিনি পাড়ি দেন দীর্ঘ পথ। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও অনুভব করেন মনের গভীরে কারো আলোছায়া। কবি বারবার নিজেকে পৃথক করে তোলেন পৃথিবীর যাবতীয় সম্পর্কের কাছ থেকে। হৃদয়ের গোপন আঘাত তাঁকে প্রতিনিয়ত দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় এক ঘোর লাগা পরিমণ্ডলের দ্বারে। সেখানে তিনি দেখেন কেবল বিষণ্ন আঁধার। ভারাক্রান্ত তাঁর হৃদয় কাঁদতে চায় তীর্থতলে। মম হন্তরত স্মৃতি নিয়ে তিনি হেঁটে যান গভীর লোকালয়ে। চারদিকে তীব্র হাহাকার, ব্যাথাময় স্মৃতি আর বিরহের অনুভূতি নিয়ে রচনা করেন বেদনার সিম্ফনি। তিনি তাঁর চর্তুদিকে শোনেন বিচিত্র স্বর আর সুরের প্রতিধ্বনি। ছুটে চলেন অজানা রহস্যের পথে, রঙহীন চৌরাস্তায়। সেখানে তিনি খুব গভীরভাবে অনুভব করেন তীব্র একাকিত্ব, বেদনার নব্য অভিধা। তাঁর কবিতায় বেদনার সুর লাভ করে নতুন মাত্রা। জীবন প্রবাহে হারানো মানুষের মত যে সুর স্মৃতি হয়ে ঘুরে ফিরে তার মমার্থ বোঝে না কেউ, বোঝেন না কবি নিজেও। তবু তার পরশ লেগে থাকে মনে। কবিতায় কবির সহজ স্বীকারোক্তি।  

'শিশির সকালে ঘুরে ফিরে
বেজে চলে অসমাপ্ত সুর
কিছু বুঝি, কিছু সংগোপনে
থেকে যায় বেদনার মত। ' (রবীন্দ্রাথ)

মনের গভীরের অনুভূতিকে সহজ করে বলার অসাধারণ ক্ষমতা আছে তাঁর। মর্মবেদনার প্রতি পদের নিপুণ চিত্র তিনি ধারণ করেন কবিতায়। কখনো তা গভীর ব্যঞ্জনায় ধ্বনিত হয় 'কান পেতে শুনি—ধীরে ধীরে / লুপ্ত হচ্ছে শব্দের পুরাণ / জন্ম নিচ্ছে নৈঃশব্দের হাসি। ' আবার কখনো একেবারে স্বাভাবিক বিবৃতির ভেতর দিয়ে কবি ব্যক্ত করছেন প্রতিনিয়ত ঝরে যাওয়া নিজের ইতিহাস। তাঁর স্বাভাবিক বিবৃতি 'ধূলিরেখা ধরে হেঁটে যেতে যেতে ভাবি—এইসব আত্মইতিহাস / কী অদ্ভুত স্বাভাবিকভাবে ঝরে যায়। ' 

কবি নওশাদ জামিলের কবিতাকে বেদনাহত কবির মর্মবাণী বললেও ভুল হবে না। তাঁর কবিতার চরণে চরণে বেদনার সুর, সংশয়ের বাণী। জীবনের গভীরতম মর্মবেদনার সহজ স্বীকারোক্তি তাঁর কবিতা। জীবনের ক্ষয়িত প্রেম আর ইটের দেয়ালে বন্দী জীবন তাঁর কাছে কোন অর্থ বহন করে না। তিনি সর্বদা নির্লিপ্ত, কখনো স্মৃতিকাতর। তিনি প্রতীক্ষা করেন ইট কঠিন জীবনের আবছায়া সরে যাবার। তাঁর চোখে শুধু ধরা পড়ে ভাসমান মুখ আর—'ইট চাপা ঘাসের জীবন'। যখন তিনি শহর ছেড়ে দূর বানানীতে বা গারো পাহাড়ের দেশে নিজেকে আবিষ্কার করেন, সেখানেও তাঁর চিত্তজুড়ে থাকে বেদনার সুর। যে মাতাল মন্দিরার সুরে তিনি মোহিত হন তাকে তিনি ক্রমশ সরে যেতে দেখেন উপলব্ধি করেন 'তখন সে দূরাগত সুর, আলপথ। ' এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় ঘোষিত হচ্ছে জীবনের পাওয়া না পাওয়ার মধ্যেকার উপলব্ধি। কবি জানেন প্রিয় মানুষটি চলে গেছে, তবু তিনি হাতড়ে বেড়ান স্মৃতি, সেই স্মৃতির অসমাপ্ত সুর তিনি কখনো বোঝেন, কখনো তা রয়ে যায় বেদনার মতো সংগোপনে। তিনি বুঝে নিতে চান অনুচ্চারিত, গোপনে ভাষা লাভ করা সেই সুর যা মোহনিদ্রা ছেড়ে আত্মলীন স্বরে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় কবির মর্মলোকের বেদনাশিখরে। বুকের ভেতর জমানো বেদনাকে তিনি উপভোগ করেন গভীরভাবে। বেদনা কারো জন্য কিছু বয়ে আনে কী না কবি তার কথা ভাবেন না, শুধু ভাবেন জীবনের জন্য আপেক্ষমান মানুষ কী পায়? কী সুখ খরকুটো মুখে উড়ো বকের কিংবা একঠায় নিষ্ঠার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা সারসের? তিনি জানেন না, তবু লিখে রাখেন জলের জার্নাল। ইট পাথরের দালানে আবদ্ধ প্রাণহীন জীবন্ত মানুষের সাথে বর্ণহীন ঘাস এখানে একাকার হয়ে ঘোষণা করে বেদনার মর্মবাণী। আর কবি সৃষ্টি করেন বেদনার অপূর্ব শিল্পরূপ।

গভীর জীবনবোধ তাঁর কবিতায় বিশেষ প্রাণ সঞ্চার করে। কাব্যস্নানের পর জীবনবোধের লালিত্যটুকুই শুধু থাকে অবশিষ্ট। আর থাকে স্পর্শকাতর কাব্যের সুর। 'ঢেউয়ের ভেতর দাবানল' গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা গভীর জীবনবোধের বার্তা বহন করে। জীবন প্রবাহের সাধারণ আবহ থেকে তিনি তুলে আনেন অসাধারণ জৈবনিক উপকরণ। মর্মে মর্মে তিনি যে বাস্তবতার কঠোর স্পর্শ পেয়েছেন তারই ছায়াপাত ঘটে তাঁর কবিতায়। তিনি উপলব্ধি করেন 'বলে ফেলা অনেক সহজ / মেনে নেওয়া সহজ তো নয়। ' (আগুনের হাসি)। তিনি বোঝেন 'ফুলদানি ডোবে, ভাসে শুধু ঝরা ফুল (দুটি চোখ তাকিয়ে এখন)। পোড়খাওয়া জীবনের ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে তিনি পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অর্থ খোঁজেন। প্রতিটি পদক্ষেপে কষ্টের ছায়া সাথে নিয়ে তিনি পৌঁছে যান উপলব্ধির অতল গহ্বরে। কখনো উপলব্ধি করেন নিজের জীবনের অর্থ, খুলে বসেন হিসাবের খাতা। বুঝতে পারেন অক্ষরের পিছু পিছু ঘুরে তিনি যে অর্ধেক জীবন কাটিয়েছেন, সেখানে প্রাপ্তি কিছু নেই, আছে 'শৈশব-লাটিম' হারানোর বেদনা। তিনি জানেন না ভবিতব্য, জানেন না কোথায় তাঁর হিসাবের খাতা। কেবল সংখ্যার ভেতর শঙ্কা নিয়ে তিনি সাজান তাঁর দীর্ঘশ্বাস। নিজের সাথেই হয় তাঁর কথপোকথন। প্রতিটি ক্ষণ তাঁর সিক্ত হয় উপলব্ধির জারক রসে। যে পৃথিবীতে মর্মবাণী সঞ্চারণে পারস্পরিক সম্পর্কের বড়ই অভাব সেখানেও কবির গভীর উপলব্ধির ছাপ স্পষ্ট, যেখানে জীবন বিষবাণে জর্জরিত সেখানেও তিনি প্রত্যয়ী হন পাশাপাশি থাকার।

'হিরের ছুরির মত যদি 
বিঁধে ফেলে বজ্রমণি, তবে,
ছাই হব পাশাপাশি বসে। ' (আগুনের হাসি)

তাঁর সহজতার সূত্র লুকিয়ে আছে তাঁর কাব্যের বয়ানে। কোন রাখ ঢাক নেই সেখানে, নেই কোন ভাবের ঘোরপ্যাঁচ। একেবারে সহজ স্বীকারোক্তির মধ্যে প্রকাশিত হয় গভীর জীবনানুভূতির দার্শনিক রূপ, মর্মবেদনার অন্তক্রন্দন। যখন তিনি বলেন 'চুপচাপ/ যখনই নিজের কাছে ফিরি / দেখি খুলে যায় অন্য চোখ। ' (অন্য চোখ)

তাঁর শব্দ নির্মাণ কৌশল তাঁকে ভাবের প্রগাঢ়তা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তিনি সৃষ্টি করেন নিজস্ব কাব্য পরিমণ্ডলে নিজস্ব শব্দ যা স্বাভাবিক অভিব্যক্তিকে ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে বিশেষ ব্যঞ্জনাময়। বাঘিনীকেশর, জলের জঙ্গল, রোদনক্ষণ, পতঙ্গমানুষ, নাগিনীশ্বাস ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার কাব্যের শৈলীকে বহুগুণে সমৃদ্ধ করে। শিরোনাম নির্বাচনের অভিনব কৌশল কবিতার প্রতি পাঠককে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। বেদনার সুর সঞ্চারিত হয় কবিতার শিরোনাম থেকেই। 'আগুনের হাসি'; 'বিভ্রমের হাসি'; 'শেষ ট্রেন'; 'পতঙ্গমানুষ; 'স্তব্ধতার গান'; 'সবুজ রক্ত', 'পাগল প্রলাপ'; 'তীর্থতল' ইত্যাদি শিরোনামের মাধ্যমে কবি পাঠককে পৌঁছে দেন তাঁর বেদনার নৈবেদ্য।

কবি নওশাদ জামিলের কাব্যভাষা সংশয়, সন্দেহের দোলাচলে নব পরিবেশ সৃষ্টি করে। পাঠকের মর্মে আঘাত করে সংশয়ের পদঝংকার ধ্বনিত হয় কাব্য জুড়ে। কবির মতে 'দীর্ঘ বিস্মৃতির দিন এসেছে এখন'। সমস্ত চিন্তা চেতনা, স্বপ্ন আজ সাবলীল হয়ে মাথার ভেতর ঢুকে যায়, সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। তারপরও কবি জীবনের কাছে ফিরে আসেন। তাঁর সংশয়ের রেশ অটুট রেখে বলেন 'তবে কেন এসেছি এখানে? কিছু কি ছিল আমার আমাদের?' (পাগল প্রলাপ)। প্রবহমান জীবনের বেদনায় কবি আহত। যে অদৃশ্য মধ্যম পুরুষকে উদ্দেশ্য করে তিনি কাব্য রচনা করেছেন সেও আজ তথাগত। কবির তাই মনে হয় 'সামনে পাথরস্তর। কেন তবে কোমলতা?' (তীর্থতল-২)। কবি স্বীকার করেন তিনি কোন ধ্যানে নয় অচিন ঘোরে মন হারিয়েছেন। সেখানে তিনি দূরগামী শ্লোক, ভালোবাসি শব্দটি বলতে সন্দিহান। তাঁর সংশয়ের ভেতর দিয়েই কাব্য প্রবাহিত হয় সার্থকতার পথে। কবি শুধু অর্জন করেন ক্ষতহীন বেদনা। উপলব্ধি করেন জীবনের গভীর সত্যকে 'মোহ নয়, মুগ্ধতা থাকে না বেশিদিন। ' (তীর্থতল-৭)। তিনি ফিরে যেতে চান স্বাভাবিকতায় কিন্তু সেখানেও তাঁকে ঘিরে থাকে সংশয়। তিনি বলেন 'হারিয়ে গিয়েও যদি ফিরে আসি দিশাহারা মনে/ভাসবে কি সহজ প্রপ্রাতে?' (তীর্থতল-৯)। কবি তাঁর চারদিকে অহর্নিশ উপলব্ধি করেন বেদনার নিকষ অন্ধকার। কঠিন ছায়াপথে তিনি হারিয়ে যান। বৈপরীত্যের দোদুল্যমানতা তাঁকে নতুন কাব্যভাষা র্নিমাণে অনুপ্রাণিত করে। শৈল্পীক ভঙ্গিতে তিনি সহজ ভাষায় বলেন  'এ বড় কঠিন রাজনীতি। জয়ী হয়েও পরাজিত / মনে হয়। চিরদিন হেরেছি সবার কাছে শুধু / একবার জয়ী হয়ে বুঝেছি জয়ের হাহাকার। ' (তীর্থতল-১২)।  

তাঁর কাব্যে রয়েছে স্মৃতি কাতরতা। হারানো দিনের স্মৃতিকে স্মরণ করে কবি আচ্ছন্ন হন বেদনায়। কারো ফেলে যাওয়া চুল আর চিহ্নরাশি কবির হৃদয়ে যত্নে লালিত স্মৃতির ভারকে নাড়া দিয়ে যায়। কিছু স্মৃতি তঁকে ভাবায় আবার কিছু স্মৃতি বেদনার দাবানো দাবানলকে উস্কে দেয়। বেদনার রশ্মি ছড়িয়ে পড়ে তাঁর মনে। তিনি অনুভব করেন বুকের খুব কাছে তীব্র ব্যথা। স্মৃতির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন 'বুঝি না বুঝি না / তথাপি নিশ্চিত থাকি-ভাবি / কিছু স্মৃতি মম হন্তারক'। (বাতাসের বিদ্যালয়)। বেঁচে থাকা তাঁর কাছে জীবনের দীর্ঘভার বলে মনে হয়। প্রাণে প্রচণ্ড তিয়াসা নিয়ে তিনি পথ চলেন আর নিজের মধ্যে গেঁথে নেন বেদনার স্ফূলিঙ্গ। সহজ কথাকে গভীরতা দিয়ে সহজ করে বলার অসামান্য দক্ষতার পরিচায়ক তাঁর কাব্য। একদিকে তিনি বেদনাহত স্মৃতির কথা বলেন অন্যদিকে আত্মকথনে ধ্বনিত হয় তাঁর ব্যক্তিগত বেদনাবোধ।  

কবি ক্ষণস্থায়ী সুখের বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী বেদনার ছবি আঁকেন। তাঁর জীবনে বেদনাই সত্য। জীবনের স্মৃতি মধুরতা, প্রেয়সীর প্রেম, পারস্পরিক সম্পর্ক, ছুটে চলা সব কিছুই বেদনার সাগরে এক সময় নিমজ্জিত হয়। কবি তাঁর হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধির অন্তরালের বেদনাকেও প্রকাশ করেন নির্লিপ্ত ধ্বনিঝংকারে। পাঠকের কাছে নিবেদন করেন বেদনার অমূল্য নৈবেদ্য।  

ঢেউয়ের ভেতর দাবানল
প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল
দাম: ১০০ টাকা


মন্তব্য