kalerkantho


বই আলোচনা

নওশাদ জামিলের ভ্রমণগ্রন্থ অদেখা পৃথিবীর অপূর্ব কাব্যচিত্র

নাজিয়া ফেরদৌস   

৭ এপ্রিল, ২০১৭ ১৮:৪০



নওশাদ জামিলের ভ্রমণগ্রন্থ অদেখা পৃথিবীর অপূর্ব কাব্যচিত্র

মানুষ মাত্রই সৌন্দর্য পিপাসু। তবে এই যান্ত্রিক যুগ প্রকৃতির অনবদ্য সৌন্দর্যের অপার মহিমা অবলোকনে মানুষকে বিমুখ করে রেখেছে অনেকাংশেই। কর্মব্যস্ততার ভারে ন্যুজ মানব মন যখন বিশ্বের নৈস্বর্গিক স্বর্গশোভার কথা প্রায় বিস্মৃত, তখনই জাদুর বাক্সের মতো হাতে এলো কবি ও কথাসাহিত্যিক নওশাদ জামিলের অপূর্ব এক ভ্রমণকাহিনি ‘লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রি’। গ্রন্থটির অবয়ব ভ্রমণকাহিনির হলেও এর আবেদন সাধারণত্বকে ছাপিয়ে  হয়ে উঠেছে অদেখা পৃথিবীর অপূর্ব কাব্যচিত্র।

সাধারণভাবে ভ্রমণকাহিনি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একদল অভিযাত্রীর প্রতিচ্ছবি, যে বা যারা বর্ণনা করে যান ভ্রমণ স্থানের অভিজ্ঞতার আদ্যপান্ত। ভ্রমণকাহিনিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারেন এমন লেখক আমাদের দেশে খুব কমই আছেন। তাই যেসব লেখায় ভ্রমণ বৃত্তান্তের পাশাপাশি রসভোগ্য আলাপচারিতা, তুলনামূলক বিবৃতি, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ও উপস্থাপনার মাধুর্য যুক্ত হয় সেসব লেখাকে ভ্রমণকাহিনির অতিরিক্ত সাহিত্যিক মর্যাদায় উন্নীত করা যেতেই পারে। ‘লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রি’ এমনই একটি অভিনব সংকলন। এখানে যেমন আছে পৃথিবীখ্যাত দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার নৈসর্গিক সৌন্দযের্র পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা, তেমনি রয়েছে লেখকের নিজস্ব মনোভঙ্গির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। নতুন শব্দের ব্যবহার, ভাষা প্রয়োগ দক্ষতা, অসাধারণ উপস্থাপন কৌশল, আলাপচারিতার রসময় ভঙ্গি গ্রন্থটিকে দিয়েছে বিশেষত্ব।

লেখকের স্ত্রীর খন্দকার কোহিনুর আখতারের অনুরোধে শ্রীলঙ্কার এক কনফারেন্সে অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতে তারা পাড়ি জমান শ্রীলংকায়। সেই অসাধারণ রহস্যঘেরা দ্বীপ রাষ্ট্রের মনমাতানো সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক সব স্থানের অপূর্ব বর্ণনা স্থান পেয়েছে ‘লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রি’ গ্রন্থটিতে। এই গ্রন্থটির বিশেষত্ব হলো মূল বর্ণনার সাথে ছোট ছোট গল্প ও ইতিহাসের সন্নিবেশ। গ্রন্থটি মোটেও অন্যান্য ভ্রমণকাহিনির মতো বর্ণনার ভারে ভারাক্রান্ত নয়। এতে রয়েছে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন স্থানের মনোমুগ্ধকর বর্ণনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রত্ন-ঐতিহ্য অন্বেষণের অদ্ভুত সব ইতিহাস। কখনো কখনো মিথিক কাহিনি লেখনিতে সঞ্চার করেছে ভিন্ন ব্যঞ্জনা। প্রথম অধ্যায়ের শুরুতেই লেখকের বর্ণনা দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাঠকের — “সমুদ্রপাড়ে এক মায়াপুরীর দ্বীপে এলাম আমরা। চারদিকে ভারত মহাসাগরের স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি, ক্ষণে ক্ষণে তা ফেনিল হয়ে আছড়ে পড়ছে তীরে। তীরজুড়ে সবুজের হাতছানি। নারিকেল, পামগাছ, সারি সারি। ভারত মহাসাগরে ভাসতে ভাসতে হঠাত্ নাবিকের চোখে ভেসে ওঠে একটা সবুজ দ্বীপ। ’’ 

মনোমুগ্ধকর এই বর্ণনার সাথে সাথে পাঠক লঙ্কাপুরীর ফেনিল সৈকতে প্রবেশ করে লেখকের সাথে। অপূর্ব এই রাজ্যকে জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয় পাঠকের। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে লেখকের কৌশলগত দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হতে হয়। প্রথম অধ্যায়ের প্রাকৃতিক বর্ণনা দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে ভিন্ন রূপ লাভ করে। এই অধ্যায়টি তিনি শুরু করেন এক অজানা ঐতিহাসিক পটভূমি দিয়ে যেন ঐতিহাসিক কোন গল্প লিখছেন তিনি। বাঙালি বীর রাজা বিজয় সিংহের সিংহল দ্বীপ পাঠকের পিপাসু মনকে আরো উত্সুক করে তোলে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, এই গ্রন্থে লেখক বড় বড় বিষয়ের পাশাপাশি ছোট ছোট মুহুর্তের বর্ণনা করতেও ভোলেন নি। যেমনঃ ‘মিহিন লঙ্কা এয়ার লাইন্সের একজন মহিলা জানান, বিমান উড়বে রাত ২টা ১০মিনিটে। কিন্তু বিমান উড়ল ২টা ৪০ মিনিটে। ৩০ মিনিট লেট হল কেন কে জানে। ’

অদেখা লঙ্কাপুরীর সৌন্দর্য অন্বেষণ শুরু হয় মূলত তৃতীয় অধ্যায় থেকে। মাউন্ট লাভিনিয়া হোটেলের সামনে স্থাপিত সিক্তবসনা অপূর্ব নারী মূর্তি লাভিনিয়ার বর্ণনা ও প্রদত্ত চিত্র পাঠককে অগ্রসর হওয়ার জন্য তাড়া দিতে থাকে। তার পরই শুরু হয় লঙ্কাপুরীর একের পর এক অপূর্ব  নিদর্শন বর্ণনা। মাউন্ট লাভিনিয়া সৈকত, বিস্ময়কর গল দূর্গ, গল স্টেডিয়াম, গঙ্গারামায়া টেম্পল, গল ফেস গ্রিন, জাদুঘর, ক্যন্ডির অনাথ হাতির আশ্রম, বুদ্ধের দন্তমোবারক, পাহাড় চূড়ার আজব প্রাসাদ, গুহাচিত্র, সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় রাজা কশ্যপের বিস্ময়কর সুইমিংপুল সব মিলিয়ে রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা চলতে থাকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।  

লেখকের অসাধারণ উপস্থাপন শৈলী পাঠকের মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্যও ক্ষুণ্ন হতে দেয় না। যখনই কোনো অংশের বর্ণনা দীর্ঘ হতে থাকে, তখনই তিনি এর মাঝখানে গেঁথে দেন অজানা গল্প। যেমনঃ “ রাতের খাবার খেয়ে চলে এলাম হোটেলে। মাউন্ট লাভিনিয়া হোটেলের লবিটা বেশ দীর্ঘ। খোলামেলা। একপাশে সমুদ্র অন্য পাশে হোটেল লবি। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি চলচ্চিত্রের পোস্টারে। ” 

তখন লেখক বর্ণনা করেন পৃথিবীখ্যাত এক চলচ্চিত্রের কথা, যেটির চিত্রায়ণ হয়েছে ওই দেশটিতে। পাঠককে তিনি এইভাবে নিয়ে যান শ্রীলঙ্কান হোটেলের আবহ থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্রের জগতে। লেখক এই গ্রন্থে চেষ্টা করেছেন দেশটির প্রায় সব জিনিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। খাবার টেবিলের দৃশ্য তিনি এমন ভাবে বর্ণনা করেছেন যে দেশি পরিচিত খাবারও শ্রীলঙ্কান পরিবেশের অভিনব পরিবেশনায় নতুন হয়ে উঠেছে। লেখক বলেছেন, “শ্রীলঙ্কান রুটি বিশাল সাইজের। ফালি ফালি করে কেটে দেওয়া হয়েছে, সুন্দর করে সাজানো হয়েছে প্লেটে। মাংসের কথা না বললেই নয়। লাল টকটকে মাংস। বোঝাই যায় তাতে মরিচের আধিক্য বেশি। ভেবেছিলাম খুব ঝাল হবে। তেমন নয়, রংটাই শুধু বেশি। ” এছাড়া সৈকতের মসলা পান, কাঁকড়া ভাজা আর পিঠা আকৃতির মিষ্টি পাঠককে দেয় নতুন জগতের সন্ধান।

গ্রন্থটির একটি বিশেষ দিক হল তুলনামূলক বর্ণনা। তিনি পরিচিত কোনো বিষয়ের সাথে তুলনা করে অপরিচিত বস্তুকে পরিচয় করিয়ে দেন পাঠকের সাথে। যেমন, অদ্ভুত এক বাহন হল টুকটুক। যদি লেখক না বলতেন “দেশের সিএনজি যেমন, শ্রীলঙ্কার টুকটুকও তেমনি। ” তবে এই অচেনা বাহনটি সম্পর্কে বুঝতে পাঠককে একটু বেগ পেতে হত। দুর্বোধ্য সবখানেই তিনি এ রকম তুলনার মাধ্যমে বস্তুটিকে সহজবোধ্য করে তোলেন। লেখকের অসামান্য রসবোধ ভ্রমণকাহিনিটিকে বিশেষভাবে উপভোগ্য করে তোলে।  

মাউন্ট লাভিনিয়া হোটেলে প্রবেশের সময় যখন তিনি বলেন “এত প্রাচীন হোটেলে থাকবো—মজা করার জন্য বলি, নিশ্চয় ভূত-প্রেতের সাক্ষাত্ পাব। ” তখন হাস্যরস পাঠকের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ‘লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রি’ গ্রন্থের নামটি যেমন আকর্ষণীয় তেমনি এর বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনাম নির্বাচনও লক্ষ্য করার মতো। শিরোনাম পড়লেই পাঠক আগ্রহী হয়ে ওঠে বিস্তারিত জানার জন্য। যেমন ‘বাঙালি বীর বিজয় সিংহের দেশে’; ‘বিস্ময়ের নাম গল দূর্গ’; ‘রূপকথার এক স্টেডিয়াম’, ‘জাদুটানা জাদুঘরে, জ্ঞানের সাগরে’ ইত্যাদি শিরোনামের মাধ্যমে পাঠ্য হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়।  

অসাধারণ সব বর্ণনার মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে লেখকের কাব্যিকতা। লেখক কবি বলেই হয়তো কাব্যিকতার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়নি এই গ্রন্থটি। তিনি যখন বলেন “ সমুদ্রের মাঝ বরাবর কয়েক বিন্দু আলো কাঁপছে তিরতির করে, রাতের রহস্যময় আলো-আঁধারিতে তা যেন রূপ নিয়েছে জাদুর গোলকে। ” তখন সাধারণ বিবৃতিকে ছাড়িয়ে বাক্যগুলো ছড়িয়ে দেয় এক অসামান্য কাব্যিক ব্যঞ্জনা।

বাংলাদেশের প্রকৃতির সাথে শ্রীলঙ্কার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির তুলনামূলক আলোচনা গ্রন্থটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। কথকের মতে বাংলাদেশের রাঙামাটি শহর ক্যাণ্ডি সৌন্দর্য থেকে কোন অংশে কম নয়, কোন  অংশেই অসম্পূর্ণ নয় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ‘গল ফেস গ্রিনের’ সৈকত থেকে। তবে শ্রীলঙ্কানদের পরিচ্ছন্নতা, পর্যটক বান্ধব পরিবেশ, আচার-ব্যবহার, সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশের সাথে তুলনীয় নয়। সে দিক থেকে তারাই সেরা।  

নানা বিষয় বর্ণনা করতে গিয়ে কথক অনেক সময় হয়ে পড়েন নস্টালজিক। ঢাকা শহরের হর্ণ আর কালো ধোঁয়ার অত্যাচারের পরেও তিনি প্রচণ্ড আকর্ষণ বোধ করেন মাতৃভূমির প্রতি। তাঁর মনে হয় “ শ্রীলঙ্কার বৃষ্টি যত সুন্দর হোক, জন্মভূমি ময়মনসিংহের বৃষ্টির মতো এত সুন্দর নয়। ” এই গ্রন্থে অদেখা লঙ্কাপুরীর পরিপূর্ণ বর্ণনা পাঠকের সামনে তুলে ধরে এক অনন্য জগত। যেখানে কোনো ভীড় নেই, কোলাহল নেই, কালো ধোঁয়া নেই, নেই কোনো যানজটের বিরক্তি। শুধু আছে মনোমুগ্ধকর, হূদয় শীতলকরী সৈকতের ঠাণ্ডা হাওয়া, অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাজার বছরের সংরক্ষিত ইতিহাসের অবাক করা সব নিদর্শন।

ভারত সাগরের শীতল সমীরের বর্ণনা আর পর্বত চূড়ায় বিস্ময়কর সব স্থাপত্য গ্রন্থটির পরতে পরতে ছড়িয়ে দিয়েছে বিস্ময়। লেখক যেমন প্রেমে পড়েছিলেন গল সৈকতের, তেমনি যে কেউ এই গ্রন্থ পড়লে প্রেমে পড়ে যাবে শ্রীলঙ্কার। যারা ভ্রমণ পিয়াসু তাদের জন্য এই গ্রন্থটি একটি অদেখা রাজ্যের কপাট খুলে দেবে। অসাধারণ লিখনশৈলী আর উপযুক্ত সন্নিবেশের সমন্বয়ে ‘লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রি’ ভ্রমণগ্রন্থটি হয়ে উঠেছে এক অদেখা পৃথিবীর অপূর্ব কাব্যচিত্র।  


লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রি
নওশাদ জামিল
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল
দাম: ১৭২ টাকা


মন্তব্য