kalerkantho


সমন্বিত বলের খোঁজে

মাহমুদ হাসান আরিফ   

৩ এপ্রিল, ২০১৭ ১৯:৫১



সমন্বিত বলের খোঁজে

শত বছর ধরে বলের ঐক্যপ্রক্রিয়ার সন্ধান করছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি ওই ঐক্যবদ্ধ বা সমন্বিত বলের বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাঙালি বিজ্ঞানী ড. তাজ।

জার্মানির ল্যাম্বার্ট একাডেমি ড. তাজের আইনস্টাইন : ইউনিফিকেশন থিওরি অ্যান্ড ইউনিফিকেশন অব ফোর ফোর্সেস নামের ১৬৮ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আমেরিকান জার্নাল অব ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনে তাঁর এ বিষয়ক একাধিক লেখা ছাপা হয়েছে। তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা প্রকাশ হয়েছে ভারতের একটি জার্নালেও।

মহাকর্ষ বল কিভাবে অন্য তিনটি বলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ বল সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, জার্মানি থেকে প্রকাশিত ওই গ্রন্থে তিনি সে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

১৯৫২ সালে গাজীপুরে জন্ম নেওয়া ড. তাজউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করার পর ভারতের বরোদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। কয়েক বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন ড. তাজ। বহু দিন ধরেই তিনি বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ড. তাজ তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, মহাকর্ষ বল এতই দুর্বল যে, এর পক্ষে এককভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। মহাকর্ষ চারটি বলের মধ্যে দুর্বলতম।

অন্য তিনটি বল হলো, বিদ্যুত্চুম্বকীয়, দুর্বল পারমাণবিক ও সবল পারমাণবিক বল। মহাকর্ষ বল অন্য তিনটি বলের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধ সৃষ্টি করে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। মহাকর্ষ বলের মান ১ ধরলে বিদ্যুত্চুম্বকীয় বলের মান ১০৩৬, দুর্বল পারমাণবিক বলের মান ১০২৫ ও সবল পারমাণবিক বলের মান ১০৩৮। ঐক্যবদ্ধ বলের মান সব বলের যোজন ফল। প্রতিটি পরমাণুতে এ শক্তি নিহিত রয়েছে।

পৃথিবীর মতো প্রতিটি গ্রহে অজস্র পরমাণু রয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ বল যে বিরাট শক্তি সৃষ্টি করে, তার প্রভাবে গ্রহগুলো প্রচণ্ড বেগে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। একই নিয়মে ঘোরে ছায়াপথ। অন্য বলগুলো মহাকর্ষ বল থেকে বেশি শক্তিশালী—প্রচলিত বিজ্ঞান সেটা নির্ণয় করেছে। কিন্তু মহাকর্ষ বল সেসব বলকে যুক্ত করে বৃহত্ ঐক্য সৃষ্টি করে, তা উদঘাটন করতে পারেনি। ড. তাজ সেখানেই আলোকপাত করেছেন।

প্রচলিত বিজ্ঞানে বলা হয়েছে, মহাকর্ষ ভর ও জড় ভর সমান (Gravitational mass and inertial mass are equal)। আর বলের ঐক্য সূত্রে বলা হয়েছে, মহাকর্ষ বিভিন্ন বস্তুকে ভর অনুপাতে আকর্ষণ করে (Gravitation interacts body proportionate to the density of mass)। অন্য তিনটি জড় বলকে মহাকর্ষ বল ভর অনুপাতে আকর্ষণ করে, এটি একটি প্রমাণ। পানিতে বিভিন্ন হালকা বস্তু ভর অনুপাতে ভাসে, সেটি আরেকটি প্রমাণ। মহাকর্ষ বল বিভিন্ন বস্তুকে ভর অনুপাতে আকর্ষণ করে বলেই ঐক্যবদ্ধ বল সৃষ্টি হয় এবং এর মাধ্যমে বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত হয়।

সব জীব ও জড় মহাকর্ষ শোষণ করে পরিপুষ্ট হয় বলে জড় জগতে মহাকর্ষ বল ও ঐক্যবদ্ধ বলের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। মহাকর্ষ হচ্ছে দূরপাল্লার বল, আর বাকি তিনটি স্বল্পপাল্লার।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আইনস্টাইন ইথারবিষয়ক মতবাদ বাতিল করে মহাকর্ষ বিষয়ক মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে মহাশূন্যে ইথারের অস্তিত্ব আর থাকল না। ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ মতবাদ ইথার মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইথার মতবাদ বাতিল হয়ে যাওয়ায় মহাশূন্যে ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুত্চুম্বকীয় মতবাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গ মতবাদ পরমাণুর মধ্যেই প্রযোজ্য থাকল। ঐক্যবদ্ধ বলের বিষয়গুলোকে আরো স্পষ্ট করার পাশাপাশি মহাকর্ষ বল কিভাবে অন্য তিনটি বলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ বল সৃষ্টি করে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে ড. তাজের বইয়ে।

ড. তাজ তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন গ্রিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মহাকর্ষ বল ভিন্নভাবে ও ভিন্ন নামে বিবেচিত হয়েছে। গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস পানিতে কোনো বস্তু ভাসিয়ে তার ঘনত্ব ও ভর পরিমাপ করতেন। পানিতে ভাসমান কোনো বস্তুর ভর পানির ভরের সঙ্গে তুলনা করা সহজ হয়। মহাকর্ষ বল বিভিন্ন বস্তুকে ভর অনুপাতে আকর্ষণ করে বলে পানিতে ভাসমান বিভিন্ন বস্তুর ভর তুলনা করা যায়।

গ্যালিলিও সপ্তদশ শতাব্দীতে পিসা ও বোলোনার হেলানো টাওয়ার থেকে ছোট-বড় দুটি বস্তু ছেড়ে দিয়ে দেখেন যে, দুটি বস্তু একই সঙ্গে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়। কেন দুটি বস্তু একসঙ্গে পতিত হয়, এর রহস্য গ্যালিলিও উদ্ধার করতে পারেননি। এর পেছনেও রয়েছে মহাকর্ষ বলের ক্রিয়া।

আইজ্যাক নিউটন বায়ুশূন্য টিউবে গিনি ও পালক পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, বায়ুশূন্য স্থানে সব বস্তু ওপর থেকে সমভাবে পতিত হয়। কিন্তু কেন একসঙ্গে পতিত হয়, সেটা উদ্ধার করা হয়নি। এখানেও রয়েছে মহাকর্ষ বলের ক্রিয়া। এটা মহাকর্ষের অভিন্ন বিধি। এ বিধির কারণে মহাকর্ষ ঐক্যবদ্ধ বল সৃষ্টি করতে পেরেছে যা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। জড় বিধি ও মহাকর্ষ বিধি মিলিত হয়ে অভিন্ন সূত্র তৈরি করে। কিন্তু নিউটন জড়তার সূত্র ও মহাকর্ষ সূত্র আলাদাভাবে দিয়েছেন।

আইনস্টাইন বিশেষ ও সার্বিক অপেক্ষবাদ প্রবর্তন করেন। একদিকে তিনি চিরায়ত বলবিজ্ঞানের জড়তার সূত্র আর মহাকর্ষ সূত্রকে সমতুল্য ধরে অপেক্ষবাদে প্রয়োগ করেন। অন্যদিকে আলোর গতিকে সর্বোচ্চ গতি ধরে অপেক্ষবাদে ব্যবহার করেন। কিন্তু মহাকর্ষ আলোর গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আইনস্টাইনের অপেক্ষবাদের একটি অনুমিত সিদ্ধান্ত্ম হলো, আলো সূর্যের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সূর্যের আকর্ষণে বেঁকে যায়। আলোর গতি প্রায় ৩০০০০০ কিমি/সে২। কিন্তু কোয়ার্ক জাতীয় কণাগুলোর গতি আলোর গতির প্রায় দ্বিগুণ। অপেক্ষবাদে আইনস্টাইন আলোর গতিকে সর্বোচ্চ গতি ধরেছেন, সমতুল্যতার নীতি ব্যবহার করেছেন, মহাশূন্যকে ফাঁকা স্থান (empty space) ধরেছেন এবং গণিতে শূন্য টেন্সর ব্যবহার করেছেন। এ কারণে তিনি চিরায়ত বলবিজ্ঞানকে অতিক্রম করতে পারেননি অর্থাৎ বলের ঐক্য সূত্র উদঘাটন করতে পারেননি।

আর্কিমিডিস, গ্যালিলিও, নিউটন ও আইনস্টাইনের বিজ্ঞান সাধনায় মহাকর্ষ যে ভর অনুপাতে ক্রিয়া করে সে ধারণা ফুটে ওঠেনি। মহাকর্ষ বল বিভিন্ন বস্তুকে ভর অনুপাতে আকর্ষণ করে, সেটা তাঁদের অগোচরে ছিল কিন্তু তাঁরা একটি বস্তু দিয়ে আরেকটি বস্তুর ভরের পরিমাপ করেছেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান, চিরায়ত বলবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান ও অপেক্ষবাদের সূত্রে একই চিত্র ফুটে উঠেছে। তাতে মহাকর্ষের একক চিত্র ফুটে ওঠেনি। মহাকর্ষ বল কিভাবে গ্রহ ও ছায়াপথকে নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রচলিত বিজ্ঞানে তার সঠিক ব্যাখ্যা নেই।

সবল পারমাণবিক বল পরমাণুর কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখে। কিন্তু মৌল কণা সবল পারমাণবিক বল দিয়ে আবদ্ধ হয় না। তাই নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে এটা নিয়ে আলোচনাও হয় না। ঐক্যবদ্ধ বলের ধারণা সুপার ফিজিক্সের সন্ধান দেয়, মৌল কণা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা এর কেন্দ্রীয় বিষয়।

- লেখক : সহসম্পাদক, কালের কণ্ঠ


মন্তব্য