kalerkantho


পাঠ্য বই থেকে বাদ পড়া লেখা নিয়ে 'যা আমাদের পড়তে দেয়নি'

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল   

১০ মার্চ, ২০১৭ ১৩:২০



পাঠ্য বই থেকে বাদ পড়া লেখা নিয়ে 'যা আমাদের পড়তে দেয়নি'

চলতি বছরের শুরুতেই দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে ছিল পাঠ্যবই। এ বছরের পাঠ্যবইয়ে অসংখ্য ভুলের পাশাপাশি বাদ দেওয়া হয়েছে প্রগতিশীল লেখদের গল্প-কবিতা।

সুকৌশলে প্রবেশ করানো হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। এসব নিয়ে গত ৫ জানুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায় আজিজুল পারভেজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন 'পাঠ্য বইয়ে এসব কী' ছাপানো হয়। দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা এই প্রতিবেদনটি নজরে এসেছিল গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী সমুদ্র সৈকতের। তখন থেকেই তার মাথায় ঘুরতে থাকে একটি পরিকল্পনা। যার ফসল 'যা আমাদের পড়তে দেয়নি'।

কালের কণ্ঠর সঙ্গে আলাপকালে এই তরুণ বলেন, "বিষয়টি নিয়ে বছরের শুরু থেকেই সমালোচনা হচ্ছিল। তবে, কালের কণ্ঠের রিপোর্টটি থেকে বিস্তারিত জানতে পারি। এরপর কিছু একটা করার তাগিদ থেকে বিষয়টি আমার বাবার সঙ্গে শেয়ার করি। "

জানুয়ারির ৭ তারিখে সমুদ্র সৈকত তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন, "বাবা একটু আগে বলেছে- যে গল্প-কবিতাগুলো এবার টেক্সটবুক থেকে বাদ দিয়েছে, ওইগুলোর একটা সংকলন করে পরিচিত বাচ্চাদের বিতরণ কর।

যা খরচ লাগে, আমি দিচ্ছি!"

অতপরঃ বাবা মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র নাথ মণ্ডলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন সৈকত। সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী মারুফ রসুল, ইব্রাহিম খলিল সবাক, নাহিদা নিশি, শোভন মজুমদার, রাকেশ মণ্ডল প্রমুখ। অতঃপর বাদ পড়া লেখাগুলো সংগ্রহ শুরু হয়। লেখকের মূল বই থেকেই লেখাগুলো আবারও মুদ্রণের জন্য সংগ্রহ করা হয়। যে প্রেসটি থেকে মুদ্রণ করা হয়েছিল; তারাও খুব স্বল্প খরচে বইটি ছাপানোর সুযোগ দেয়।

বইটিতে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়া ১৬টি লেখা। এর মধ্যে ১১টি কবিতা এবং ৫টি গল্প-প্রবন্ধ আছে। কবিতাগুলো হলো- অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের 'বই', গোলাম মোস্তফার 'প্রার্থনা', রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বাংলাদেশের হৃদয়', সানাউল হকের 'সভা', জসীম উদ্দীনের 'দেশ',  ভারত চন্দ্র রায় গুণাকরের 'আমার সন্তান', জ্ঞান দাসের 'সুখের লাগিয়া', বাউল লালন সাঁইয়ের 'সময় গেলে সাধন হবে না', সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সাঁকোটা দুলছে' এবং রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লার 'খতিয়ান'। আর গল্প-প্রবন্ধগুলো হলো সত্যেন সেনের 'লাল গরুটা' এস ওয়াজেদ আলীর 'রাঁচি ভ্রমণ', রণেশ দাশগুপ্তের 'মাল্যদান', কাজী নজরুল ইসলামের 'বাঙালির বাংলা', এবং সঞ্জীবচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের 'পালামৌ'।

বইটি প্রকাশের পর অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারীর পাশাপাশি ড. জাফর ইকবাল, ড. ইয়াসমিন হক, ড. অজয় রায়, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাদুকর জুয়েল আইচসহ বরেণ্য শিক্ষাবিদগণ সৈকতের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বইটির প্রচারে সহযোগিতা করছে দেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবং সৈকতের বন্ধুবান্ধব-শুভাকাঙ্খীরা।

বই ছাপানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কালের কণ্ঠ কে সমুদ্র সৈকত জানান, "সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আসতেই পারে। তবে সেটা সার্বজনীন ও প্রগতির পক্ষে হতে হবে। কিন্তু অসংখ্য কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত ধ্বংস করে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা আমি সমর্থন করি না। "

উল্লেখ্য, পাঠ্যবইয়ে এই পরিবর্তনের পর মৌলবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসালাম সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাদের 'দাবি পূরণ হয়েছে' বলে বিবৃতি দেয়। যা সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে 'যা আমাদের পড়তে দেয়নি' বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। অনলাইনেও একটি পিডিএফ ফাইল উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি জেলায় বইটির প্রিন্ট কপি চলে গেছে। তবে সৈকতের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা আছে। এই সীমাবদ্ধতার মাঝে থেকেও যতদূর সম্ভব তিনি এই কাজটি চালিয়ে যেতে চান। এছাড়া যে কেউ বইটি পুনরায় ছাপাতে পারে; তবে শর্ত হলো বিনামূল্যে বিতরণ করতে হবে।


মন্তব্য