kalerkantho

গল্প : কান

সাফায়েতুল ইসলাম   

১ মার্চ, ২০১৭ ২১:১৯



গল্প : কান

পৃথিবীর যত জল রাশি আছে, সব একত্র করে তৃষ্ণা মেটাতে ইচ্ছে করছে। যার অনেকটাই মনের তৃষ্ণা।

তার পাশাপাশি বাজে অনুভূতি কাজ করছে। কিছু দিন ধরে লিখতে পারছি না। চিন্তা গুলো উইপোকাদের মতো মাঝ রাতে কিলবিল করে উঠে। খুব অগোছালো,  হঠাৎ মনে হয় -এই বুঝি জগত সংসারের সমস্ত কিছু নামিয়ে আনবো লেখনীতে। সব উচ্চমার্গীয় চিন্তা, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়ে উঠছে না।

 

চিন্তা করতে করতে একটা মুভি দেখে ফেললাম, মুভিটা দেখে খুব অস্বস্তি বোধ করছি, মাথায় এত পরিমাণে চাপ সৃষ্টি হয়েছে হঠাৎ পেট মোচড় দিয়ে উঠলো, যেন রাতের খাবার সব বেড়িয়ে যাবে। যাক, পিল খাওয়ার পর কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে। এইতো মাথায় কিছু একটা খেলা করছে, মনে হচ্ছে কিছু একটা লেখা যাবে। যাই হোক- মূল প্রসঙ্গে আসা যাক;
 
একদা সমাজে এক ভদ্র লোক বাস করতো।

নাম তাঁর মোহিত। তিনি মোটামুটি শিক্ষিত, সম্পদ বলতে বাবার রেখে যাওয়া দুতলা বিশিষ্ট একটি জরাজীর্ণ বাড়ি, আর কিছু দুঃসম্পর্কের আত্মীয় ছাড়া আপন বলতে তেমন কেউ নেই। আয়ের এক মাত্র উৎস বাড়ি ভাড়া,এতেই চলছে তাঁর সুন্দর জীবন। ছাঁদের উপর তঙ্গি একটা কামরায় থাকেন তিনি, পাশেই টয়লেট আর পাকের ঘর। রান্না করার জায়গাটা এতোই ছোট যে তাঁর অপুষ্ট শরীরটাও সংকুলান হয় না। রুমটা ভীষণ অগোছালো, হরেক রকমের বই আর কাপড়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে।
আজ জানালা দিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে, বসন্তের মৃদু মলয় বইছে। প্রফুল্ল বাতাসের ঝাপটা এসে মোহিতের গায়ে আছরে পড়ছে, ঝিকিমিকি সূর্যের স্পষ্ট আলোয় তাঁর ঘুম ভেঙে গেলো। প্রতিদিনের অভ্যাস, হাতে সিগারেট নিয়ে টয়লেটে ঢুকে যায়। ধূমপান না করলে তার টয়লেট ভালো হয় না, তারপর প্রক্ষালন থেকে বের হয়ে চিনি ছাড়া চায়ের পেয়ালা হাতে নেন, চা খেতে খেতে আয়নায় চোখ রাখেন, তাঁর দুটি কানের একটি বড় আরেকটি ছোট, এক রাশ বিরক্তের ছাপ নিয়ে দুই কানে হাত রাখেন। কি জঘন্য বেপার। মানুষের কান আবার ছোট বড় হয় নাকি বলেই এক গাল হেসে দিলেন। তারপর খুশ মেজাজে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলান।
একদিন পত্রিকা পড়ার পর খুব ক্লান্ত বোধ করছিলেন, শুয়া অবস্থায় ব্যক্তিগত ডায়রি নিয়ে ছোট্ট করে নোট করলেন; এই সমাজে সহস্র নষ্ট স্রোত বয়ে বেড়াচ্ছে, কলা গাছের ভ্যালার মত আমিও ভেসে ভেড়াচ্ছি। কলা গাছ যেভাবে ধীরে ধীরে পচেঁ যায়, ঠিক সেভাবে আমার অন্তর্দেশটাও পচেঁ যাচ্ছে, আর ক্ষয়ে ক্ষয়ে গলে যাচ্ছে সব কিছু।
এতটুকু লিখেই কি মনে করে যেনো লাইন গুলো কেটে দিলেন, চিন্তার মোড় ঘুরে গেল। মোহিতের খুব ঘুম পাচ্ছে, গত রাতে ঘুম হয় নি। এক ঘুমে প্রায় সন্ধ্যা পার করে দিলেন। এক ললনার কণ্ঠে ঘুম ভেঙ্গে গেল। কে যেন ডাকছে, কণ্ঠটা খুব তিক্ত ও কর্কট। যেনো মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। চোখ খুলে দেখে তার সামনের চেয়ারে এক অপূর্ব যুবতী মেয়ে বসে আছে। পড়নে শারী, বেশ লম্বা চওড়া। পুষ্পিত মায়াবতী চেহারা। রক্ত মাখা গায়ে অস্বাভাবিক অবস্থা, মাথার চুল গুলো এলোমেলো।
মোহিত ভাই আমি খুব বিপদে পড়েছি, আপনার সাহায্য দরকার।
কি হয়েছে, আপনার এই অবস্থা কেন ? কে জেনো আপনি ?
আমি তৃনা, আপনার ভাড়াটিয়া, নিচ তলায় থাকি।
মোহিত উত্তরটি তেমন ভাল করে শুনেনি। হঠাৎ করেই তাঁর খেয়াল জানালার বাহিরে চলে গেলো, ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি নামছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ছাঁদে কিছু কাপর শুকাতে দেওয়া হয়েছিল, ভিজে যাবে। নিয়ে আসা দরকার।
ততোক্ষণে আবার খেয়াল করলেন মেয়েটির দিকে।
কি যেন বললেন আপনি ? কিসের বিপদ ?
তৃনা মেয়েটি চেয়ারটা ধরে আরেকটু কাছে টেনে বসলো, আস্তে আস্তে করে বলতে শুরু করলো;
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আনুমানিক পাঁচ বছর হয়ে গেছে। আমার বিয়ে হয়েছে ফ্যামিলির সিদ্ধান্তে। ঠিক দু বছরের মাথায় বাবা-মা দুজনেই মারা যান। তাই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে আসি। উনি ছোটখাটো একটা চাকরি করেন। প্রতিদিন খুব সকালে বেড়িয়ে পড়েন। মকুল গভীর রাতে বাসায় ফিরে, বুঝতে পারছেন তো ? আমার স্বামীর কথা বলছি। মাঝে মাঝে রাতেও ফিরেন না। এমন কি দুই তিন দিনের জন্য লাপাত্তা হয়ে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলেই রেগে যান। তেরে এসে মারতে আসেন। অনেক দিন হয়ে গেলো, ভয়ে আর তেমন কিছুই জিজ্ঞেস করি না।  
আজকে হঠাৎ দুপুরে বাসায় ফিরেন। আমি বেশ অবাক হয়েছি। কারণ মানুষটা তো কখনও অবেলায় বাসায় আসেন না। আমি খুব আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
আজকে অফিসে যান নি ?
গিয়েছি, ভাল লাগছিল না, তাই চলে এসেছি। কেনো, তোমার কোন সমস্যা ?
না, এমনিতেই জিজ্ঞেস করছি । এই বেলাই দেখে খুব অবাক হলাম।
এত বকবক করিস কেন ?
আপনি এইভাবে কথা বলছেন কেনো ?
আমি এইভাবেই কথা বলবো, পোষায় ? একদম চুপ, কোন কথা হবে না।
আমি প্রশ্ন করলেও সমস্যা, আমি কি ভালমন্দ কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারবো না ? কি আজব বেপার ! এইভাবে কি ঘরসংসার করা যায় !
কি বললি ? বলেই, আমার গালে চড় বসিয়ে দিলো। সাথে সাথে আমারও গিয়েছে মাথা খারাপ হয়ে। রান্না ঘর থেকে বটি নিয়ে গর্দানে বসিয়ে দিলাম এক কুপ। রক্তের ফিনকিতে পুরো ঘর বেসে গেলো। বেশ অনেকক্ষণ কই মাছের মত ধড়পড় করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর নেড়েচেড়ে দেখি, আর প্রাণ নেই। তাড়াতাড়ি লাশটা বাথরুমে ঢুকিয়ে ফেললাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় নিয়ে মেজেতে লেগে থাকা রক্ত গুলো পরিষ্কার করি।
 মোহিত ভাই- লাশটা কিভাবে কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না, এই জন্য আপনার কাছে আসছি। এই বলেই মেয়েটি ভীষণ ভীতু হয়ে মাথা নিচু করে গোঙাতে গোঙাতে কাঁদতে শুরু করলো। অঝোর শব্দে কেঁদে উঠলো। আর মোহিত হা করে তাকিয়ে ছিল। এই মুহূর্তে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
মোহিত অনেকক্ষণ ভাবার পর বললো; তৃনা আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুলিশ কে খবর দেওয়া দরকার। কি বলেন ?
না না, আপনি পাগল নাকি, পুলিশ কে কেনো খবর দিবো ? পুলিশ কে জানালে তো অনেক আগেই জানাতাম, আর পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে কি আপনার কাছে আসতাম।   আমি চাই -আমরা মিলে লাশটার কিছু একটা ব্যবস্থা করি। পুলিশ কোন ভাবেই যেনো না জানতে পারে। মোহিত ভাই আপনি আমাকে বাঁচান, আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। এই বলে মোহিতের পা ধরে বসলেন তৃনা। মোহিতের মায়া হতে আর দেরি হলো না।
তৃনা- ধরেন আমরা লাশ গোরস্থানে কবর দিয়ে আসলাম, কাক পক্ষীও কেউ জানলো না। তারপর আপনি কোথায় যাবেন ?
আমরা বিয়ে করে ফেলবো। আপনার কোন আপত্তি আছে ?
মোহিত বিভ্রম হাসি দিয়ে হ্যাঁ না কিছুই বলেন নি।
সে রাতের ঘটনা কতদূর গড়িয়েছিল জানা নেই, হয়তো মোহিত তৃনার মোহে পড়েছিল।
 সে ঘটনার অনেক দিন পর খবরের কাগজে অবাক করা শিরোনাম হয়েছিল; 'বৃষ্টির পানিতে ভাসমান দুই অজ্ঞাত লাস' তার মধ্যে পুলিশ একজনকে নিয়ে নারাচারা করে দেখেন, যার একটি কান বড় আরেকটি কান খুব ছোট। যা বেশী চোখে পড়ার মত। তাছারা এতো অমানবিক ভাবে খুন করা হয়েছে যে চেহারা চিনার উপায় নেই। লাশ দুটির বাসা এলাকার আশে পাশেই, এই ব্যাপারে পুলিশের কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কীভাবে কখন কার দ্বারা খুন হয়েছে এই ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

 


মন্তব্য