kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আতিফ আতাউরের গল্প 'হেডফোন'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৮:২০



আতিফ আতাউরের গল্প 'হেডফোন'

জীবন হলো হেডফোনের মতো। বুঝতে পারছো, জীবন হলো হেডফোনের মতো! কথাটা বলে কয়েকবার মাথা ঝাঁকালেন জাকির স্যার।

পুরো নাম ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন তালুকদার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসের ইউভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। মনোবিদ্যায় তাঁর তুখোড় রেজাল্ট। মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে দিতে পারেন মনের অবস্থা।

আমি আসলে গিয়েছিলাম মনোবিজ্ঞানের আরেক তুখোড় অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম ম্যামের কাছে। আমার সঙ্গে সামান্য পরিচয় আছে তার। সেটাও সাংবাদিকতার কারণে। বেশ কয়েকবার আমার রিপোর্টের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। ম্যাম এত সুন্দর করে কথা বলেন না। শুনতেই ইচ্ছে করে। আমার ফোনে তাঁর যতগুলো সাক্ষাৎকার নিয়েছি সবগুলো রেকর্ডিং রেখে দিয়েছি। যখন মন খারাপ হয় আমি হেডফোন কানে লাগিয়ে শুনি। কিন্তু আঁখি চলে যাওয়ার পর থেকে আর কিছুতেই মন ভালো হচ্ছিল না। ম্যামের রেকর্ড করা সাক্ষাৎকারের সমাধানমূলক কথা শুনেও না। কয়েকবার আত্মহত্যা করতে গেলাম। আমার বাসার পাশেই রেল লাইন। গিয়ে দাঁড়ালেই হয়। ঘন্টায় ঘন্টায় ট্রেন আসে। কয়েকবার গিয়েও ছিলাম। রেল লাইনের পাশেই হালিম বেচে কালু মামা। পাঁচ বছর ধরে পরিচয়। এতসুন্দর হালিম বানায়। খাওয়ার পর মুখে লেগে থাকে। আমি যতবারই আত্মহত্যা করতে গেছি ততবারই তাঁর দোকান থেকে বিশ টাকার হালিম খেয়ে চলে এসেছি। আমার সামনে দিয়ে চট্টলা এক্সপ্রেস, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, নান্দাইল এক্সপ্রেস আসছে-গেছে বাট তার নিচে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস হয় নাই।

আত্মহত্যা আমি কোনোদিন করতে চাই নাই। কিন্তু বাধ্য হয়েই কয়েকবার সিন্ধান্ত নিছি। রেললাইন ব্যর্থ হওয়ায় ছাদ বেছে নিলাম। আমার বাসার ছাদ থেকে চমৎকার আকাশ দেখা যায়। একদিন গিয়ে ছাদে দাঁড়ালাম। মনে মনে মা বাবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। যেহেতু তারা এখনো বেঁচে আছেন। শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলাম। আকাশ ভরা তারা। তার মাঝে এক ফালি রুপালি চাঁদ। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ আমার ভাতিজার ডাকে মুগ্ধতা ভঙ্গ হলো।
কাকা, তুমি এত রাতে ছাদে কেন? সেই কখন থেকে তোমাকে আমি খুঁজে বেরাচ্ছি।
কেন, কি হয়েছে?
আরে শোনো, তুমি যাকে ভালোবাসতে না সেই মেয়েটাকে দেখলাম। ১ নং গেটে সেই ছেলেটার সঙ্গে বসে গল্প করছে।
তাতে আমার কী? এসব আমাকে শোনাচ্ছো কেন?
আরে বাবা, তুমিই না বললা মেয়েটাকে যেন খেয়াল রাখি। কোথায় যায়, কী করে। এখন আবার রেগে যাচ্ছো কেন?

রেগে কেন যাচ্ছি সেটা তো ওকে বলতে পারছি না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত বাজে বারোটা। ব্যাটা এসে আমার আত্মহত্যার প্ল্যানটাই ভেস্তে দিছে।

চলো চলো, খেতে চল। আমি এখনো খাইনি। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। একসাথে খাব। আরিফ আমাকে টেনে নিয়ে এলো।

আমি ওর সঙ্গে ছাদ থেকে নেমে এলাম। ভাত পেটের ভেতর গেল না। বারবার আখির কথা মনে হতে লাগল। মেয়েটাকে তিন বছর ধরে শুধু পছন্দের তালিকায় রেখেছি। বলব বলব করেও ভালোবাসি বলা হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যেই সে একজনের গলায় ঝুলে গেল! ঝুলে গেল কথাটা বলা শ্লীল হচ্ছে না বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার রাগ মাথায় উঠে গেছে। ওকে সামনে পেলে মেরেই ফেলতাম আমি। এটা অবশ্য কথার কথা। আঁখিকে খুন করা আমার পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব না। কিন্তু তাই বলে এরকম একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম করবে ও। দুনিয়ার তাবৎ সুন্দর মেয়েরা কী বখাটে ছেলেদেরই প্রেমে পড়ে। যতবার ভাবী মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমার চেয়ে যোগ্য কারো সঙ্গে আখি প্রেম করলে কোনো আপত্তি থাকত না আমার। ওর পছন্দ এক নিচু লেভেলের ভাবতেই রাগ দ্বিগুণ হয়ে যায়। নিচের প্রতিও রাগ হয় এরকম লয়ার লেভেলের একটা মেয়ের প্রেমে পড়লাম কী করে! আবার ভাবী প্রেম তো স্বর্গ থেকে আসে। আমার কী দোষ! হা হা হা।

যাই হোক, মূল কথায় ফিরে আসি। আঁখিকে ভুলে যেতে গিয়ে দেখলাম ভুলতে পারছি না। ঘুম থেকে উঠে ওর কথা মনে পড়ে। শুতেও যাই ওর কথা ভাবতে ভাবতে। ঘুমাইও ওর কথা ভাবতে ভাবতে। কোনো কাজেই মন বসে না। আড্ডা ভালো লাগে না। ঘুরতে ভালো লাগে না। খেতে ভালো লাগে না। মাথার ভেতর সব সময় ভোতা যন্ত্রণা বিধে থাকে। অসহ্য।

এই অসহ্য জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই আত্মহত্যা করতে গেছিলাম। কিন্তু পারি নাই। শেষবার তো মিরাকল ঘটে গেল। অফিস থেকে সেদিন ফিরতে রাত হয়ে গেছে। রাত বাজে দশটা। সেই সময় দেখি আখি ওর বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে অন্ধকারে রাস্তায় বসে গল্প করছে। কারো প্রেমে পড়লে এমন হয় কীনা আমি জানি না। আমি বাসায় কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইলাম। এরপর সোজা ছাদে উঠে গেলাম। কার্নিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ঝাপ দেওয়ার আগে নিচে তাকিয়ে দেখি আঁখি বাসায় যাচ্ছে। সাদা নিয়নের আলোয় এত সুন্দর লাগছিল ওকে দেখতে। ওর রুপে আগে থেকেই মুগ্ধ হয়ে ছিলাম। আবার নতুন করে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বারবার মনে হতে লাগল এই রুপ দেখার জন্য হলেও বেঁচে থাকা যায়! আমি ছাদ থেকে নেমে বেসিনে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ভাত খেতে বসলাম। গরুর মাংশের ঝাল দিয়ে ভাত। পেট ভরে খেয়ে ল্যাপটপে থ্রি ইডিয়ট মুভিটা ছেড়ে দিয়ে দেখতে শুরু করলাম।

পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই আবার ওর কথা মনে হতে লাগল। সঙ্গে বুকের ভেতর এক ধরনের যন্ত্রণা। সুচ বিধার মতো বিঁধে থাকে। সব সময়। সহ্য হয় না। তখনই মনে হলো একবার মেহতাব খানম ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করা যেতে পারে। পত্রিকায় এত সুন্দর করে ছেলেমেয়েদের চিঠির উত্তর দেন। আমার মানসিক যন্ত্রণাতেও তিনি একটা সমাধান দেবেন। কয়েকবার আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের তার ডিপার্টমেন্টের সামনে গেছি। আবার লজ্জায় ফিরে আসছি। প্রেমে পড়েছি যার সে আমাকে নয় অন্যকে ভালোবাসে। প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষ হয়েও কেন বিষয়টা মেনে নিতে পারছি না। এই লজ্জাতেই ম্যামের সামনে দাঁড়াতে পারিনি। এই ডিপার্টমেন্টের আরো কয়েক জন শিক্ষক আমাকে চেনেন। ডিপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ায়ে থাকতে দেখে হেসে জানতে চেয়েছেন কি সাংবাদিক সাহেব, নতুন কোনো রিপোর্ট করছেন নাকি? আরে গুলশান হামলার মতো হামলায় বড়লোকের ছেলেগুলো কেন জড়াচ্ছে তা নিয়ে একটা রিপোর্ট করুন না। কে তাদের মন-মানসিকতা চেঞ্জ করে দিচ্ছে। কেনই বা তারা এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। আমি মিষ্টি হেসে জবাব দিয়েছি করব স্যার। শিগগিরই করব।

সেদিন চৌদ্দবারের চেষ্টায় মেহতাব ম্যামকে সব খুলে বললাম। লজ্জার মাথা খেয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুলে বললাম। ম্যাডামের পাশেই ছিলেন বসে ছিলেন জাকির স্যার। মেহতাব ম্যাম সব শুনে মিষ্টি করে হাসলেন। আমার মন ভালো হয়ে গেল। সাহসও পেলাম। জানতে চাইলাম ম্যাম, এখন আমি কী করব?
ম্যাম বললেন তুমি একজন ছেলে। ছেলেদের মানসিক অবস্থা একজন ছেলেই ভালো বলতে পারবে। পাশে বসা জাকির স্যারকে দেখিয়ে বললেন, ওনার কাছে সমাধান চাও। ভালো বলতে পারবেন আমার চেয়ে। বলেই তিনি আবারো হাসলেন। আমি ঘুরে জাকির স্যারের দিকে তাকালাম। সৌম্য চেহারা। দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। এতবার এই ডিপার্টমেন্টে এসেছি। আগে দেখিনি এই স্যারকে। স্যার আমার মুখের দিকে কয়েকবার তাকালেন। আগাগোড়া দেখে নিলেন। তারপর বললেন, তুমি আমার রুমে এসো।

জাকির স্যারের রুমে বসে আছি। স্যার ফ্রেশ হতে গেছেন। ফিরে এলেন অল্প সময় পরেই। তারপর টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বললেন দেখো ছেলে। তুমি বড় হয়েছো। গ্রাজুয়েট বয়। ভালো পত্রিকায় সাংবাদিকতা করছো। যোগ্যতা আছে বলেই সেখানে তুমি সুযোগ পেয়েছো। আমাদের দেশে লাখ লাখ গ্রাজুয়েট ছেলেমেয়ে বেকার বসে আছে। সুযোগ পাচ্ছে না। তুমি সেখানে পড়াশোনা শেষ না হতেই জব করছো। একটা কলেজ পড়–য়া মেয়ের প্রেমে পড়ার মধ্যে দোষের কিছু নেই। আর তুমি তো তাকে বলোও নি যে তুমি তাকে ভালোবাসো। যখন বলেছো, সে তখন অলরেডি তার ক্লাসের একজনের সঙ্গে প্রেম করছে। এটা অসম প্রেম। এই প্রেমের কোনো মানে নেই। তুমিও নিশ্চয়ই কলেজে পড়ার সময় কারো সঙ্গে প্রেম করতে। সে এখন হয়তো অন্য কারো ঘরনি। তাই নয় কি?
আমি মুচকি হেসে বললাম জি স্যার।
তাহলে ওই মেয়ের জন্য এত ভেঙে পড়ছো কেন? আত্মহত্যা করা তো কোনো সমাধান নয়। বরং এটা একটা সমস্যা। তুমি সচেতন ছেলে হয়ে সমস্যা সৃষ্টি করবে কেন?
স্যার চেয়ারে বসলেন। আধাঘণতা আমাকে কাউন্সেলিং করালেন। সর্বশেষ বললেন, এই যে তোমার গলায় হেডফোন দেখছি না, জীবনটাও আসলে হেডফোনের মতো। এতে তুমি যত সুন্দর গানই দাও না কেন সেটার সুর শোনার জন্য হেডফোনটাকে কানে লাগাতে হবে। তবেই না তুমি সুরের স্বাদ পাবে। জীবন নানা সময়ে নানা কারণে দুঃখের দুয়ারে দাঁড়ায়ে যেতে পারে। এর জন্য জীবন দায়ী না। এর জন্য তুমি দায়ী না। আমরা কেউই দায়ী না। জীবনটাকে হেডফোনের মতো মনে করার চেষ্টা করো। দেখবে জীবন সুন্দর। সুন্দর আর আনন্দের অনেক কিছু আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে জীবনের পরিচয় করিয়ে দাও। যেমন করে ভালো একটা গানকে হেডফোনের সাহায্যে কানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। তারপর যত হট্টোগোলের মধ্যেই তুমি থাকো না কেন হেডফোন তোমাকে সুরই উপহার দেবে। সেটা কান থেকে নামালেই আবার তোমার চারপাশে বিরক্তিকর হট্টোগোল। ট্রাই টু আন্ডারস্যান্ট।
ইয়েস স্যার।
ওকে, সি ইউ লেটার এগেইন বয়েজ।
আমি হেসে বললাম ওকে স্যার। থ্যাঙ্কু ইউ।

কলা ভবন থেকে নিচে নেমে দেখি কিসের যেন হট্টোগোল। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হবে হয়তো। আমি মোবাইলে লতা মুঙ্গেশকরের একটা গান ছেড়ে দিয়ে হেডফোন কানে দিলাম। নিমেষে হট্টোগোল দূর হয়ে গেল। আমার পৃথিবীতে তখন সুখের সুর ছড়িয়ে দিচ্ছেন ভুবনজয়ী এক সংগীতশিল্পী।

ভাবছি জীবনটাকেই একটা হেডফোন বানিয়ে ফেলব।


মন্তব্য