kalerkantho


মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বাংলাদেশ

কাল মুক্তি পাবে আবু আকতারুল ইমানের জঙ্গিবাদবিরোধী ছবি ‘মিস্টার বাংলাদেশ’। এতে অভিষেক হবে নতুন নায়ক-নায়িকা জুটির—খিজির হায়াত খান ও শানারেই দেবী শানু। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন মীর রাকিব হাসান

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বাংলাদেশ

‘মিস্টার বাংলাদেশ’ ছবিতে খিজির হায়াত খান ও শানারেই দেবী শানু

খিজির মূলত পরিচালক। নিজের পরিচালনায় প্রথম ছবি ‘অস্তিত্বে আমার দেশ’-এ প্রথম অভিনয় করেছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি খুব বেশি আলোচনা তৈরি করতে পারেনি। ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র ছবি ‘জাগো’ নির্মাণ করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। এবার তিনি নায়ক হিসেবেই বেশ আলোচনায়। পরিচালক থেকে অভিনেতা বনে যাওয়ার গল্প বললেন আড্ডার শুরুতেই, “প্রথম ছবিতে লিড রোল করেছিলাম, ‘জাগো’তে অতিথি চরিত্র। তবে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’-এ অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল না। পরিস্থিতি বাধ্য করেছে। যাঁকে চূড়ান্ত করেছিলাম শেষ মুহূর্তে তিনি আসেননি। তা ছাড়া ছবির বিষয়বস্তু খুবই সেনসেটিভ। পূর্বপ্রস্তুতিতে অনেক সময় দেওয়ার দরকার। প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাদের কাছ থেকে সেই সময় এক্সপেক্ট করা যাচ্ছিল না। তার ওপর এত বেশি পারিশ্রমিক দেওয়াটা সম্ভব হচ্ছিল না। আরেকটা অপশন ছিল নতুন কাউকে নেওয়া। নতুন কাউকে দিয়ে এত বড় রিস্ক আমি নিতে চাইনি। সে কারণে নিজেই ক্যামেরার সামনে চলে আসছি।’

শুটিংয়ের আগে আট মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। গত নভেম্বরে নামলেন শুটিংয়ে। সমুদ্রের মধ্যে ফাইট সিকোয়েন্স আছে বেশ কয়েকটা। অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য একজন ট্রেনার ছিলেন—এডওয়ার্ড ফ্রান্সিস গোমেজ। খিজিরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনিই। অভিনয়ের জন্যও আলাদা করে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নায়ক হেসে বললেন, ‘ভাগ্যিস নাচ ছিল না! বড় বাঁচা বেঁচেছি। নইলে নাচটাও শিখতে হতো। আর ছবিতে আমি অভিনয় করার চেষ্টা করিনি। গল্পের নায়কের সঙ্গে যা যা ঘটেছে, আমার সঙ্গেও যদি এমন ঘটত তাহলে আমি কী করতাম, ওটাই করার চেষ্টা করেছি।’

খিজিরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন শানু। এবারই মুখ খুললেন। প্রথমেই বললেন এই ছবিতে তাঁর যুক্ত হওয়ার কথা, ‘স্ক্রিপ্ট পড়ে আমার মনে হয়েছে, একজন শিল্পী হিসেবে এই ছবি না করার কোনো কারণ নেই। হলি আর্টিজানের নৃশংস ঘটনার পরপরই সারা দেশে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিল। জঙ্গি হামলায় পুরো দেশ একটা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। তখনই প্রথম গল্পটা শুনি। ওরা আরো অনেককেই এই চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। এমন একটা গল্পে কাজ করতে চায়নি কেউই। খিজির হায়াত খানই আমাকে কল দিয়েছিলেন। উনি তখনই বলেছিলেন, এটা কিন্তু একটা রিস্কি প্রজেক্ট, সেনসেটিভ ইস্যুর ছবি। আমার কেন যেন মনে হয়েছিল, ছবিটা আমার করা উচিত। বাংলাদেশ নামটার সঙ্গে কানেক্টেড হয়ে গিয়েছিলাম। এক ধরনের দেশাত্মবোধ ও দায়িত্ববোধ থেকেই রাজি হয়েছিলাম।’ 

ছবিতে শানুর চরিত্রের নাম কুমু। মিস্টার বাংলাদেশের মনের মানুষ। যার সঙ্গে প্রেম, পরিণয়, বিয়ে এবং সংসার পর্যন্ত গড়ায়। খিজিরের ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ শানু। শানুর চোখে এই ছবির সেরা দৃশ্য কোনটি? ‘আমি ও আমার মেয়ে অদিতি লাশ হয়ে পড়ে ছিলাম মর্গে। ইব্রাহিম [খিজির] যখন মর্গে স্ত্রী এবং মেয়েকে এসে দেখে, সেই দৃশ্যটা। পিনপতন নীরবতায় শটটা নেওয়া হয়েছিল। ডিরেক্টর কোনো ধরনের ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছিলেন না। খিজির ভাই যখন লাশ দুটো জড়িয়ে কান্না করছিলেন, আমার তো চোখ বন্ধ ছিল। খিজির ভাইয়ের কান্নার যে ভাইব্রেশনটা পেয়েছি, তাতে আমার চোখে পানি চলে আসছিল। এটা খুব অন্য রকম একটা অনুভুতি’, বললেন শানু।

আর খিজিরের চোখে তাঁর করা সেরা দৃশ্য দুটি, ‘প্রথমটা ফিজিক্যালি খুব চ্যালেঞ্জিং। সমুদ্রের মধ্যে একটি ফাইট সিকোয়েন্স, যেখানে আমাকে ভেসে থাকতে হয়। মনে আছে, জানুয়ারি মাসের ঠাণ্ডার মধ্যে আট ঘণ্টা পানিতে ভেসে থাকতে হয়েছিল। আর সবচেয়ে ইমোশনাল মর্গের ভেতরের দৃশ্যটা, যেটার কথা শানু বলল।’

সিনেমাটি করতে গিয়ে পদে পদে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। অর্থের জোগানটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। ‘আর হ্যাঁ, আমার এবং আমার ইউনিটের কিছু সদস্যের ওপর তো জীবনের হুমকি আছেই। এটা একটা যুদ্ধের মতো। যুদ্ধের ময়দানে আছি, হুমকি তো আসবেই। সেটা মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত। তবে কেউ ছবিটা সম্পর্কে না জেনে, না বুঝে মন্তব্য না করলে খুশি হব। আমি বলব, আগে সিনেমাটি দেখুন, তারপর বিচার-বিশ্লেষণ করুন। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো সিনেমা রিলিজের পর হুমকি আসবে, আগেই চলে এসেছে’, বললেন খিজির।

সঙ্গে যোগ করলেন নায়িকা, ‘ছবিটার বক্তব্য ইসলাম ধর্মের বিপক্ষে নয়, এটা জোর দিয়েই বলছি। আমরা দেখাতে চেয়েছি কিভাবে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে তরুণদের লক্ষ্যভ্রষ্ট করে অন্ধকার জগতে নিয়ে যাওয়া হয়।’

এমন গল্পই বা কেন বাছলেন? ‘খুবই ব্যক্তিগত কারণ। আমার খুব কাছের বন্ধুকে হলি আর্টিজানে হারিয়েছি। আমার আরো কিছু বন্ধু, ছোট ভাই জঙ্গিবাদের দিকে চলে গেছে। যখন এমন একটা ইস্যুতে আপন মানুষজনকে হারাতে শুরু করবেন, তখন আপনারও কিছু একটা করতে ইচ্ছে করবেই। আমি ফিল্মমেকার। আমি আর কী করতে পারি! ফিল্মই বানাতে পারি। আমি তো অস্ত্র নিয়ে প্রতিহত করতে পারব না। ফিল্মটাই আমার অস্ত্র’, বললেন খিজির।

পরিচালক আবু আকতারুল ইমানের প্রথম ছবি এটি। ‘মাটির ময়না’য় তিনি ছিলেন তারেক মাসুদের প্রধান সহকারী। এ জে মিন্টু, সোহানুর রহমান সোহান, শাহ আলম কিরণের মতো পরিচালকের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র সহকারী পরিচালকও তিনি। একটা অভিমানে এত দিন সিনেমা বানাননি। ব্যস্ত ছিলেন তথ্যচিত্র নির্মাণে। আন্তর্জাতিক মার্কেটের জন্য ১৫০টির বেশি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছেন। ৫২ বছর বয়সী ইমানকে পরিচালনায় এনেছেন খিজির, ‘তাঁর সঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কাজ করেছি। আমার প্রডাকশন হাউসের ডকুমেন্টারিগুলো উনি করেন। আমার মনে হয়েছে একজন মানুষ যিনি সারা জীবন কমার্শিয়াল মুভির মধ্যেই ছিলেন। কিন্তু নিজের সিনেমাটা বানাননি। তাঁকে বলেছি, আপনি কমার্শিয়াল স্ট্রাকচারে সিনেমাটি বানান। ফাইট থাকবে, গান থাকবে, কিন্তু দিনশেষে এই সেনসেটিভ মেসেজটাও থাকবে। উনি শতভাগ দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতে পেরেছেন।’

শানুর সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন? ‘খুবই হার্ডওয়ার্কিং অভিনেত্রী। সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলার। আমাকে প্রচুর হেল্প করেছে। গল্পের চরিত্রটার জন্য শানুর মতো একজন অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর দরকার ছিল। রোমান্টিক সিনে তো আমার হাত-পা কাঁপছিল। চুমুর দৃশ্যও ছিল। ও যথেষ্ট হেল্প করেছে। সমুদ্রের মধ্যে ফাইট যতটা না কঠিন আমার জন্য, তার চেয়ে বেশি কঠিন ছিল রোমান্টিক সিন বা গানের দৃশ্যে অভিনয়। চলন্ত বাইকে চুমু। পর্দায় দেখে দর্শক বুঝবে না কত কষ্ট করেছি দৃশ্যটার জন্য। আরেকটা দৃশ্য ছিল ওকে কোলে তুলে লেকের মতো একটা জায়গা ক্রস করব। ১২-১৩ বার ওকে কোলে তুলতে হয়েছে’, বলেন খিজির।

নায়িকা তাই নায়ককে অ্যাকশনে এ প্লাস দিলেও রোমান্সে মার্ক খানিকটা কম দিয়েছেন। তবে পরিমাণটা বললেন না।



মন্তব্য