kalerkantho


গানে বেঁধেছেন প্রাণ

‘পোড়ামন ২’-এর ‘ওহে শ্যাম’-এর পর ‘দহন’ ছবির ‘প্রেমের বাক্স’ গানটি লিখেও বাজিমাত করেছেন গীতিকার শাহ আলম সরকার। তিনি একজন গায়ক-সুরকারও। তাঁর জনপ্রিয় গানের সংখ্যা অনেক। লিখেছেন আতিফ আতাউর

৮ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গানে বেঁধেছেন প্রাণ

প্রায় সাড়ে ছয় শ অ্যালবামে গান করেছেন তিনি। চলচ্চিত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও অ্যালবাম মিলিয়ে শাহ আলম সরকারের গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। ৩৫ বছর আগে গানের সঙ্গে প্রাণ বেঁধেছিলেন। পোস্তগোলায় নিজের বাসায় দিন-রাতের বেশির ভাগ সময় কাটে গানে ডুবে। সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। চলচ্চিত্রের গল্প লিখছেন তিনি। গ্রামীণ পটভূমির গল্পটি লেখার কাজ প্রায় শেষ। এখন সংলাপ সাজাচ্ছেন নিজের মতো করে। তার পরই তুলে দেবেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের হাতে। গানের মানুষ হঠাৎ গল্পে কেন—জানতে চাইলে শাহ আলম সরকার বলেন, ‘অনেক গল্প মনের মধ্যে খেলা করে। তা ছাড়া চলচ্চিত্রের জন্য গান লিখতে গিয়ে গল্পের দৈন্যদশা আমাকে খুব হতাশ করেছে। গ্রামীণ পটভূমির এত ঐশ্বর্য থাকার পরও চলচ্চিত্রকাররা কেন গল্প খুঁজে পান না ভেবে অবাক লাগে। এর আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক কাহিনিকারকে গল্পের প্লট বলে দিয়েছি। এবার একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাব পাওয়ায় নিজেই লিখতে বসে গেলাম। চেষ্টা করলে যে ভালো কিছু করা যায়, চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সুন্দর সুন্দর মেসেজ মানুষকে দেওয়া যায় সেটা তুলে ধরতেই গল্প লেখা।’ চলচ্চিত্রটির গানগুলোও লিখবেন তিনি। তার পরই শুরু হবে শুটিং। তাঁর লেখা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের সংখ্যাও কম নয়। এ বছর মুক্তি পাওয়া ‘পোড়ামন ২’-এর ‘ওহে শ্যাম’ গানটিও তাঁর লেখা। গানটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। সেই ধারাবাহিকতায় সিয়াম-পূজা জুটির দ্বিতীয় ছবি ‘দহন’-এর জন্য লেখেন ‘প্রেমের বাক্স’। এটিও এখন বেশ আলোচিত।

এ প্রসঙ্গে শাহ আলম সরকার বলেন, ‘শ্রোতাদের সব সময়ই নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। গ্রামীণ পটভূমির গান বেশি করি। এই ছবি দুটিও গ্রামীণ পটভূমির। এ জন্য কাজটা আনন্দ নিয়ে করতে পেরেছি। একটা গান করার পরে সাধারণত সেই গানের খোঁজ রাখি না। অন্য গানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। মানুষের কাছে শুনেছি নতুন প্রজন্মের তরুণ শ্রোতারা গান দুটি পছন্দ করেছে।’

এযাবৎ শতাধিক চলচ্চিত্রে দুই শতাধিক গান লিখেছেন তিনি। তালিকায় জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘খড়কুটার এক বাসা বাঁধলাম’, ‘বান্ধিলাম পিরিতের ঘর’, ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ প্রভৃতি গান। শুধু চলচ্চিত্রই নয়, বাউল,  জারি-সারি, মুর্শিদি, মারফতি, ভাব, বিচ্ছেদী সব গানেই সমান পারদর্শী শাহ আলম সরকার। বিশেষ করে গ্রামবাংলার পালাগানে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। কিভাবে শুরু হয়েছিল এই সংগীতযাত্রা? ‘আমাদের পরিবারের সবাই গান করতেন। দাদা, বাবা ও চাচারা একসঙ্গে গান নিয়ে বসতেন। কেউ হারমোনিয়াম, কেউ ঢোল, কেউ তবলা বাজাতেন। বাইরের কাউকে ডাকা লাগত না। পরিবারে গান চর্চার পাশাপাশি তখন তাঁরা বিভিন্ন দরবার শরিফে গান করতেন। আমিও তাঁদের সঙ্গে গাইতাম। আমার ছোট চাচা আবদুস সাত্তার ও বড় চাচা গোলাম মহিউদ্দিনের গানে বেশ নামডাক ছিল। তাঁদের কারণেই গানের জগতে জড়িয়ে পড়ি।’ শাহ আলমের বাপ-দাদারা যখন গান করেন তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল একেবারেই অপ্রতুল। বরিশাল থেকে গয়নার নৌকায় করে ঢাকায় আসতেন তাঁরা। কোনো লঞ্চ ছিল না। গয়নার নৌকা কী? ‘যাত্রী পরিবহনের জন্য সে সময় ভালো কাঠ দিয়ে সুন্দর করে দাঁড় টানা নৌকা বানানো হতো। এরপর সাজানো হতো সেই নৌকা। দূর থেকে মানুষ দেখলেই টের পেত ওটা যাত্রীবাহী নৌকা। ওটার নাম ছিল গয়নার নৌকা। সেই নৌকাতেই প্রথম মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানার কুড়িগাঁও গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তাঁরা। ভিটা গড়েন পোস্তগোলায়। এখান থেকেই পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় গান করতে যেতেন। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক আসতে শুরু করে ক্যাসেট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। দুই হাত খুলে গান লেখা শুরু করেন শাহ আলম।

ফোকসম্রাজ্ঞী মমতাজের জন্য অনেক অ্যালবাম করেছেন। তাঁর সঙ্গে পালাগান করেও পেয়েছেন বিপুল শ্রোতাপ্রিয়তা।

জীবনের খেরো খাতায় এত গান থাকলেও সব গানই তাঁকে শান্তি দেয় না। দরবার শরিফ এবং বাউল অনুষ্ঠানের গানগুলোই তাঁকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। ভাব বিচ্ছেদী গানের নামে এখন যা হচ্ছে সে বিষয়ে বললেন নিজের অভিমত, ‘আমরা যে বিচ্ছেদী গান করি সেগুলো মূলত স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির দূরত্ব নিয়ে। স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম ও বিচ্ছেদ নিয়ে। কিন্তু কিছু মানুষ মনে করে এগুলো বোধহয় একটা ছেলে আর একটা মেয়ের ভালোবাসার গান। এখন কিছু গীতিকার না বুঝেই প্রেমের চেয়ে কামকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে বিচ্ছেদ গান লিখছেন। ওগুলো আমাদের গান নয়। দরবারের গানগুলোই আমাদের গান।’

স্ত্রী আর দুই ছেলেকে নিয়ে পোস্তগোলায় থাকেন। বড় ছেলে ডাক্তারি পড়ছেন, ছোট ছেলে ব্যবসা করেন। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। গান নিয়ে কোনো স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে হেসে বললেন, ‘স্বপ্নের মধ্যেই তো থাকি সারাক্ষণ। আমাদের কি স্বপ্নের শেষ আছে। দেহ থেকে যেদিন প্রাণ উড়ে যাবে সেদিনই স্বপ্নের শেষ হবে।’



মন্তব্য