kalerkantho


ফরীদি হওয়ার স্বপ্ন

বাসায় শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছেন ঈদের সর্বাধিক নাটকের অভিনেতা আফরান নিশো। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মীর রাকিব হাসান। ছবি তুলেছেন অপূর্ব অভি

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০




ফরীদি হওয়ার স্বপ্ন

দুই বছর আগে মাবরুর রশীদ বান্নাহর ধারবাহিক ‘তিনি আমাদের বকরভাই’র শুটিংয়ে বাইক অ্যাকসিডেন্টে হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল। এখনো জোড়া লাগেনি। ব্যথাটা বারবার ফিরে আসে। ঈদের ১০ দিন আগে ব্যথাটা মারাত্মক আকার ধারণ করে। ঈদের নাটক ‘ট্যাটু’, ‘লালাই’, ‘জীবন এখানে এমন’-এর শুটিং করেছেন ব্যথা নিয়েই। ইউনিটের লোকজন তাঁকে ধরে এখান থেকে ওখানে নিয়ে যেত। কোমরে ব্যথার কারণেই ‘এবার তোরা মানুষ হ’ নাটকের চরিত্রটা হুইলচেয়ারে বসানো হয়েছে। ‘আমার সঙ্গে অনেক মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। ইচ্ছা করলেই কাজ বন্ধ করতে পারি না, বিশ্রামও নিতে পারি না।  ঈদের ছুটিতে কিছুটা বিশ্রাম নিয়েছি। ফোন পর্যন্ত রিসিভ করিনি। বাসায় শুয়ে-বসে কাটিয়েছি’—বললেন নিশো।

ঈদ গেল, এখন শুরু হয়েছে বিজয় দিবসের নাটকের তোড়জোড়। এর আগে নিজেকে যতটা বিশ্রাম দেওয়া যায় দিচ্ছেন। ‘ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র করতে গেলে মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় বেশি। এ কারণেই বিশ্রামটা দরকার।’

ইদানীং এমন একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, নতুন ধরনের চরিত্র একটু বেশিই করতে হচ্ছে নিশোকে, ‘কাদায় মাখা কৃষকের চরিত্র থেকে শুরু করে পাগলের চরিত্র—সব যেন আমাকেই করতে হবে! দুই দিনের মধ্যে পাঁচটা লুক নিতে হবে, ডাক পড়বে আমার। আমি মাঝেমধ্যে রাগ করে বলি, তোমরা তো আমাকে মেরে ফেলবা। সময়ও দিবা না! পাঁচ দিন নাও পাঁচটা লুকের জন্য, পরে করবা এই দুই দিনেই। তখন বাজেটের বিষয়টা চলে আসে। পারলে দুই দিনেরটা এক দিনে করে ফেলে।’

নিশোর কষ্টটা বৃথা যায়নি। গেল কয়েক বছর আলোচিত নাটকের বেশির ভাগই তাঁর। ‘আমি আসলেই পরিশ্রম করি খুব। চাইলে কিন্তু এসির বাতাস খেয়ে কয়েকটা রোমান্টিক সংলাপ বলে পার পেয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমার মন মানে না। এসব কাজে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই।’

সারা দিন বাসায় শুয়ে-বসে কাটালেন বললেন, এবার ঈদের নাটক কেমন দেখলেন? কেমন হচ্ছে নাটক? ‘এখনকার নাটকের গল্পই হিরো। আগে পুতুপুতু প্রেমের নাটকই বেশি আলোচনায় আসত। এখন দর্শকের রুচি অনেক বদলেছে। খেয়াল করলে দেখবেন, সিনেমার মতো নাটকেও জনরা তৈরি হচ্ছে। যেটা আমরা বিশ্ব সিনেমায় দেখি। নির্মাতারাও নানা জনরা নিয়ে কাজ করার সাহস পাচ্ছেন। এখানে উদাহরণ টানতে পারি, মেহজাবীন সুন্দরী হোক বা না হোক, তাঁকে পারফরমার হতেই হবে। শুধু সুন্দরী বলে সে পার পাবে না। সৌন্দর্য হয়তো প্লাস পয়েন্ট, কিন্তু অভিনয় না জানলে টিকবে না। লেখক, ডিরেক্টর, দর্শকরা এখন অভিনয়শিল্পীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। আমরা সেটা গ্রহণ করেছি। এটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই পজিটিভ। একটা সময় ছিল ক্লিন শেভড একটা ছেলে আর সুন্দরী একটা মেয়ে মডেল হবে। আফজাল ভাইরা সেটা করেছেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কিংবা অমিতাভ রেজা ভাইরা যখন এলেন, বিজ্ঞাপনের ভাষাই বদলে গেছে’—বললেন নিশো।

সময়টা নিয়ে নিশো খুবই খুশি। তিনি মনে করেন, টিভি নাটকের চরিত্র নিয়ে ভাঙাগড়ার খেলা শুরু হয়েছে। একজন প্রেমিক সব সময় রোমান্টিক সংলাপই বলবে, এটা বিশ্বাস করেন না তিনি, ‘আমি দেখতে হিরোর মতো বলে প্রতিটা গল্পেই হিরোইজম দেখাতে হবে, এর কোনো মানে হয় না। আমিও হারতে পারি। সেটা দেখাতে সমস্যা কী? একজন রিকশাওয়ালাও ঘটনাক্রমে হিরো হতে পারে। সেটা আমরা এখন নাটকে দেখছি, এটা ভালো দিক।’

এবার ঈদে ৩৫টির বেশি নাটকে দেখা গেছে তাঁকে। এত নাটকে অভিনয় করে নিজের মানটা ধরে রাখা সম্ভব? “ঈদে কিন্তু অনেক আগের করা নাটকও প্রচারিত হয়। এই যেমন ‘আঙুর বালা’ নাটকটি। প্রায় তিন বছর আগে শুটিং করেছিলাম। ‘আমার একটি গল্প বলার ছিল’ রোজার ঈদে করা। ‘লায়লা, তুমি কি আমাকে মিস করো’ করেছিলাম ভালোবাসা দিবসের জন্য। এত নাটকও যদি হয়, সমস্যা দেখি না। নিজেকে আলাদা করতে পেরেছি কি না সেটাই বিবেচ্য। একটা চরিত্রের সঙ্গে আরেকটা চরিত্রের মিল খুব কম নাটকেই পাবেন। সমসাময়িকদের মধ্যে একমাত্র আমিই এ ব্যাপারটি মেনে চলার চেষ্টা করি। আমাকে যেমন প্রেমিক হতে হবে, পাগল-মুচি-চাষি-রিকশাচালকও হতে হবে। এখানেই তো অভিনয়ের মজা”—বললেন নিশো।

অভিনয়ে এসেছিলেন গাজী রাকায়েতের হাত ধরে। তবে গুরু মানেন হুমায়ুন ফরীদিকে। অভিনয়ের প্রেরণা পেয়েছেন তাঁর কাছ থেকেই, ‘ফরীদি ভাইকে অনেক হ্যান্ডসাম বলব না। তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন, লুকটা অভিনেতার জন্য অত্যন্ত জরুরি না। তিনি আমার অভিনয়ের বাবা। আমি কখনোই তাঁকে ছাড়াতে পারব না। তবু স্বপ্ন, তাঁর মতো করে মানুষ আমাকেও মনে রাখবে, অভিনয়ের জন্য ভালোবাসবে।’

নতুন-পুরনো সব পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করেন। নতুনদের সম্ভাবনা নিয়ে বলতেও ভুললেন না, তবে কিছু পরামর্শও দিলেন, “নতুনদের সবাইকেই বলি, অসংখ্য কাজ করাটাকে মূল লক্ষ্য কোরো না। এখন হচ্ছে ভিউয়ের যুগ। রোজার ঈদে ‘বুকের বাঁ পাশে’ অনেক ভিউ পেয়েছিল। তখন বলেছিলাম, ভিউসংখ্যা গুনে কোনো নাটকের মান নির্ধারণ করবে না, প্লিজ। কখনো প্রত্যাশা কোরো না ঢালাওভাবে প্রশংসা পাবে। এবার যেমন পপুলার হওয়ার মতো কোনো কনটেন্টই বানায়নি বান্নাহ। ও যে প্রচেষ্টা শুরু করেছে, হয়তো পাঁচ বছর পর ফিডব্যাক পাবে। আমি যখন এটা শুরু করেছিলাম, সবাই বলত—কী করছ! আমি বলতাম, দেখো, পাঁচ বছর পর এটা দিয়েই আমি অনেকের চেয়ে এগিয়ে থাকব।’



মন্তব্য