kalerkantho


পঁচাত্তরে পা

১০ বছর বয়স থেকেই তিনি অভিনয় করেন। বলতে গেলে পুরো জীবনটা তিনি অভিনয় করেই কাটিয়েছেন। বাংলাদেশে খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে, যারা আবুল হায়াতকে চেনে না। সদা হাস্যোজ্জ্বল এই অভিনেতা ৭৪ পেরিয়ে ৭৫-এ পা দিলেন সম্প্রতি। তাঁকে নিয়ে বিশেষ আয়োজনে লিখেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু-সহকর্মী আলী যাকের এবং বড় মেয়ে বিপাশা হায়াত

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পঁচাত্তরে পা

আবুল হায়াত, জন্ম : ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪, ছবি : কাকলী প্রধান

শুভ জন্মদিন, আবুল হায়াত

আলী যাকের

‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’য় আবুল হায়াত ও আলী যাকের

আবুল হায়াত ৭৪ হলো। কেন যে লোকে বয়স বাড়িয়ে বলে ৭৫-এ পড়ল, আমার বোধগম্য নয়। জীবনের এই অধ্যায়ে এসে মনে হয়, এক বছর অনেক বয়স। সে যাকগে। আমি নিশ্চিত যে হায়াত সেঞ্চুরি করবে। আমি যখন থেকে ওকে জানি, তখন থেকে হায়াতের চেহারার খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। একই রকম দেখতে। আকর্ণ বিস্তীর্ণ টাক, শিশুসুলভ হাসি। খুব কম লোকই এমন দেখেছি যে মনে-প্রাণে হাসে, যখনই হাসে! হায়াত হাসলে ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কপাল থেকে শুরু করে চোখ হয়ে গোটা বদন হাসে। যদিও পরিচয় অনেক দিনের, ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছি মঞ্চে নাটক করতে এসে। নাটকের নাম ‘বাকি ইতিহাস’। নাট্যকার বাদল সরকার। আমার ওপরে দায়িত্ব পড়েছিল নির্দেশনা দেওয়ার। প্রধান চরিত্রে আবুল হায়াত। চরিত্রের নাম সীতানাথ চক্রবর্তী। সীতানাথের স্ত্রী কণা হিসেবে সারার প্রথম মঞ্চাভিনয় এ নাটকেই। মহড়াকক্ষেই বুঝতে পেরেছিলাম অভিনেতা কী করে চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। হায়াত সেটা অবলীলায় করে, যে চরিত্রেই অভিনয় করুক না কেন। বাংলাদেশের প্রচণ্ড শক্তিধর নট আবুল হায়াত, এ কথা অনস্বীকার্য। নির্দেশক হিসেবে একাধিক কাজ করেছি ওর সঙ্গে। ওকে নিয়ে কখনোই ভাবতে হয়নি, ব্যস্ত থেকেছি বাকি সব চরিত্র নিয়ে, মঞ্চসজ্জা নিয়ে, আলো নিয়ে। জানতাম এবং জানি যে হায়াতের দায়িত্বটুকু নিয়ে আমার ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই। কখনো বিমুখ হইনি।

শুভ জন্মদিন, বন্ধু! আরো অনেক ফুল ফোটাও মঞ্চের উদ্যানে এবং অভিনয়ের বিভিন্ন অঙ্গনে।

অনেক ভালোবাসা।

 

বাবার ঋণ কখনোই শোধ হবে না

বিপাশা হায়াত

আমার বয়স ৪৭ বছর। জীবনের এতটা সময়েও বাবা আমার মধ্যে কতটা উপস্থিত, সেটা বলে শেষ করা যাবে না। এককথায় বললে, অসাধারণ বাবা। আমার সব কাজেরই মূল প্রেরণা বাবার কাছ থেকে। বাবার মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি মনে করি, সেটা বাংলাদেশের মানুষই করেছে। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করে। জাতীয় পর্যায়ে যে পুরস্কারগুলো পেয়েছেন, সেগুলো অনেক বড় মূল্যায়ন তাঁর জন্য। আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন বলতে কিছু নেই। মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়ই বাবার সব মূল্যায়ন লুকিয়ে আছে। আমার বাবা ও মা একই সঙ্গে চিন্তা করেন, একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের মতামতও একই। বিভিন্ন সময়ে আমাদের নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কখনো তাঁদের মতপার্থক্য হয়নি। সুতরাং আমার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও মা-বাবা দুজনের কথাই বলতে হবে। আর আমি তাঁদের দেখানো পথেই চলেছি। কখনো বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। সব সময়ই বলেছেন বিনয়ী হতে। কখনো হয়তো বাধার সম্মুখীন হয়েছি, তখনো বলেছেন—থাক, তুমি কিছু বোলো না। খারাপ কিছু ভুলে যাও। এটা আমার মা-বাবা দুজনেরই দর্শন। আবার যখন আমরা প্রতিবাদ করি, তাঁদের পাশে পাই। হয়তো তাঁরা ভয় পান যে আমি কোনো বিপদে পড়ব কি না। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করার গুণটা তাঁদের কাছ থেকেই শেখা। অন্যায়কে মেনে নেওয়া যাবে না। তাঁরা সে শিক্ষাও দিয়েছেন। শুধু অভিনয়ের ক্ষেত্রে নয়, গান, ছবি আঁকার ক্ষেত্রেও বাবার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মা-বাবার পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট পেয়েছি। আমরা তো থিয়েটার করা মানুষ, একই সঙ্গে চারুকলারও মানুষ আমি। বন্ধুদের মধ্যে আমরা ছেলে-মেয়ে খেয়াল করে বেড়ে উঠিনি। আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে। ছেলে-মেয়ে-নির্বিশেষে বন্ধুদের সবার যাতায়াত ছিল আমার বাসায়। তারা আসত, বাবার সঙ্গেও আড্ডা দিত। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত হয়তো আমরা থিয়েটারের কাজ করেছি, শিল্পকলায় কাজ করেছি, চারুকলায় বহু রাত পর্যন্ত কাজ করেছি, শুটিংয়ের কারণে ভোররাতে বাসায় এসেছি—এ ধরনের জীবনচর্চার ভেতর দিয়েই আমরা গেছি। মা-বাবার আমাদের প্রতি সেই আস্থাটা ছিল। তৌকীরের সঙ্গে আমার বিয়েটা বন্ধুত্বেরই একটা উত্তরণ। বন্ধু হিসেবে সে বহুবার আমার বাসায় এসেছে। আমার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে, বাবার নাটকে অভিনয় করেছে।

বাবা প্রকৌশলী ছিলেন। যখন সাইটে যেতেন, প্রায়ই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আর প্রথম জীবন থেকেই বাবার সুন্দর গাড়ি ছিল। সে সময় বাবার সঙ্গে জিপে করে ঘুরতাম। মঞ্চের রিহার্সালে যেতাম। এত ছোট ছিলাম, তবু সেসব স্মৃতি এখনো কিছুটা মনে পড়ে। বাবার সঙ্গে আসলে আমার বন্ধুর সম্পর্ক। একটা বই পড়ে শেয়ার করা, গল্প পড়ে শেয়ার করা কিংবা আব্বু কোনো স্ক্রিপ্ট লিখছেন সেটা শেয়ার করছেন—এসব খুব ছোটবেলা থেকেই।

বাবার জন্মদিনে সব সময়ই কমন যে গিফটা থাকবে সেটা বই। আর আব্বুও ছোটবেলা থেকে প্রচুর বই কিনে দিতেন। বই পড়ার অভ্যাসটাও আব্বুর কাছ থেকেই পাওয়া। আসলে আব্বুকে আমার এমন একজন আদর্শ মানুষ মনে হয়, যাঁর সবটাই অনুসরণ করি।

বাবার সঙ্গে অনেক নাটকে অভিনয় করেছি, টিভি ও মঞ্চেও। সেখান থেকে আলাদা করে কিছু বলতে পারব না। বাবার সঙ্গে অভিনয় করাটাই আসলে আনন্দের ব্যাপার। মঞ্চে ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ করতাম একসঙ্গে। সেখানে বাবাকে আমি ‘ভাই’ বলে ডাকতাম। এটা একটা মজার ব্যাপার। আরেকটি নাটক ছিল ‘হিম্মতী মা’। আসলে আমরা যখন অভিনয়ের জন্য মঞ্চে উঠি, তখন আর বাবা-মেয়ে থাকি না, ওই চরিত্রটাকেই ধারণ করি।

তাঁর মূল্যায়ন নিয়ে আমি কখনো ভাবি না। কর্ম করে যাওয়াটাই আসলে আমার বা বাবার মূল্যায়ন। আর মূল্যায়নটা যে জীবদ্দশায় হবে এমনটাও নয়। পৃথিবীতে প্রচুর মানুষ আছেন বা আসবেন, যাঁদের মূল্যায়ন করবে সময়। মূল্যায়ন হলো কি হলো না, সেটা কোনো বিষয় নয়। কতটা সততা দিয়ে কাজটা করতে পারছি, সোসাইটিতে কিছু কন্ট্রিবিউট করতে পারছি কি না সেটাই বিবেচ্য। আমাকে কেউ মূল্যায়ন করল কি না সেটা নিয়ে মাথা ঘামালে তো আমি স্বার্থপর হয়ে গেলাম! শিল্পী সত্তা তো আর থাকল না।

এমন কিছু নেই, যেটা আমি বাবাকে সামনাসামনি বলতে পারি না। সব কিছু বলারই স্বাধীনতা আছে। আমি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা বাবার কারণেই। আমি শিল্পের পথে একজন যোদ্ধা। এই যে শিল্পকে ভালোবেসে যুদ্ধ করে যাওয়া, সেই অনুপ্রেরণা আমি সম্পূর্ণই পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। এই ঋণ কখনোই শোধ হবে না। বাবা আমাদের দুই বোনের সবটাই পছন্দ করেন। বিশেষ করে আমার লেখা তাঁকে একটু বেশিই মুগ্ধ করে।

ছবিতে আবুল হায়াত

স্ত্রী, দুই মেয়ে, মেয়েজামাই ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে

মঞ্চে ‘বাকি ইতিহাস’ [১৯৭৩], সঙ্গে সারা যাকের

১৯৫৩, যখন ক্লাস ফোরের ছাত্র

‘জয়যাত্রা’ ছবিতে তারিক আনাম খান ও হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে

প্রযোজক ও সহশিল্পীর সঙ্গে ‘বহুব্রীহি’র শুটিংয়ে

নাট্যকার, প্রযোজক ও সহশিল্পীর সঙ্গে ‘অয়োময়’-এর শুটিংয়ে

মাহফুজা খাতুন শিরিনের সঙ্গে বিয়ে, ১৯৭০

লিবিয়ায় স্ত্রী এবং দুই মেয়ে বিপাশা ও নাতাশার সঙ্গে

 



মন্তব্য