kalerkantho


নায়ক যখন কারাতে প্রশিক্ষক

শুধু পর্দায় নন, বাস্তবেও তিনি ‘লড়াকু’। ১৯৮৩ ও ’৮৪ সালে পর পর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন কারাতে প্রতিযোগিতায়। এখন অভিনয় ব্যস্ততা খুব একটা নেই। নিজের ‘ইয়ং ড্রাগন মার্শাল আর্ট সেন্টার অব ফাইট স্কুল’-এ সর্বসাধারণকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখান নায়ক রুবেল। লিখেছেন সুদীপ্ত সাইদ

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০




নায়ক যখন কারাতে প্রশিক্ষক

ছাত্রদের শেখাচ্ছেন নায়ক রুবেল

চায়নিজ সিনেমা দেখে মার্শাল আর্টের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। “আমি তখন কলেজ ছেড়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময়ে মধুমিতা সিনেমা হলে ‘চায়নিজ বক্সার’ নামে একটি সিনেমা দেখেছিলাম। সেই ছবি দেখার পর ইন্সপায়ারড হয়েছিলাম, বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, একজন মানুষ একা এবং খালি হাতে অনেক মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে পারে। জানতে পারলাম মার্শাল আর্ট নামে একটা আর্ট আছে, সেটা জানলে একজন মানুষের পক্ষে পাঁচ-দশজন মানুষের সঙ্গে লড়াই করা ব্যাপার না। এর পরই কারাতে শেখা শুরু করলাম। এরপর তো কারাতে প্রতিযোগিতায় ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নও হয়েছি”, বললেন রুবেল।

নিজের অর্জিত এই বিদ্যার সফল প্রয়োগ ঘটান সিনেমায়ও। অভিষেক ছবি ‘লড়াকু’তে [১৯৮৬] তিনি হাজির হয়েছিলেন মার্শাল আর্টকে সঙ্গী করেই। ‘বিপ্লব’, ‘বজ্রমুষ্ঠি’, ‘বীরপুরুষ’, ‘লম্পট’, ‘চারদিকে শত্রু’, ‘ভণ্ড’সহ তাঁর অভিনীত বেশির ভাগ ছবিতেই থাকত মার্শাল আর্টের প্রয়োগ। সিনেমার বদৌলতে রাতারাতি জনপ্রিয়তা পাওয়া মার্শাল আর্টের এই বিদ্যাকে তিনি ছড়িয়ে দিলেন তরুণদের মাঝেও। গড়ে তুললেন ক্লাব। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত করলেন মার্শাল আর্টের স্কুল ‘ইয়ং ড্রাগন মার্শাল আর্ট সেন্টার অব ফাইট স্কুল’। ৩০ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করে আসছেন এই স্কুল। বর্তমানে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে অবস্থিত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের স্কুল মাঠে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। শুধু ঢাকায়ই নয়, সারা দেশেই রয়েছে তাঁর স্কুল, যার সঠিক সংখ্যা তিনি নিজেও মনে করতে পারলেন না। তাঁর হাতে গড়া ছাত্ররাই পরিচালনা করছেন এসব স্কুল। তিনিও মাঝেমধ্যে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসেন। 

‘বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারাতে ছড়িয়ে দিতেই এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। শারীরিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মরক্ষার জন্য এটা খুবই জরুরি। আমি ফিল্মে এটার প্রয়োগ করে সফল হয়েছি। চেয়েছি তরুণরাও মার্শাল আর্ট শিখুক।’ 

মেয়েদের জন্যও স্কুল খুলতে যাচ্ছেন। বলেন, ‘মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল খুলতে চাওয়ার পেছনেও কারণ আছে। মেয়েরা এখন যেভাবে পদে পদে বিপদগ্রস্ত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে—এসবের হাত থেকে তাদের রেহাই দিতে পারে মার্শাল আর্ট। একজন মেয়ে যদি নিজেকে রক্ষা করতে পারে তাহলে এসব অঘটনও কম ঘটবে। আমি মনে করি, এটা সবার শেখা উচিত।’

উদাহরণও টানলেন, ‘রূপা নামের একটি মেয়ে বাসে ধর্ষিত হয়েছিল মাত্র তিনজন পুরুষের হাতে। মেয়েটি যদি কারাতে জানত তাহলে সে ধর্ষিত হতো না। আমাদের দেশে পদে পদে চলছে সামাজিক অবক্ষয়। মার্শাল আর্ট এই অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে পারে। এই বিদ্যা আপনার আত্মবিশ্বাসকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবে, চিন্তাও করতে পারবেন না।’

মেয়েদের জন্য মার্শাল আর্টের প্রথম স্কুলটি খুলবেন বগুড়ায়। প্রিয় এক ছাত্রকে দিয়ে চালাবেন। ‘৩৫ বছর বয়সের ওপরের মহিলাদেরও কারাতে শেখাব। সাধারণত এই বয়সের বেশির ভাগ মহিলা সেভাবে হাত-পা চালাতে পারেন না। কেউ যদি কখনো বিপদে পড়ে কিভাবে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসবে, সেই কৌশল শেখাব। আগামী মাসের যেকোনো সময়ে গিয়ে এটার উদ্বোধন করে দিয়ে আসব। বগুড়ারটা সফল হলে ঢাকায় শাখা করব। তবে এই স্কুলের নামটা আলাদা হবে, এখনো ঠিক করিনি’, বললেন রুবেল।

মার্শাল আর্ট শেখার জন্য বয়সের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। যেকোনো বয়সে যে কেউই  শিখতে পারবে, জানালেন রুবেল।

স্বল্পমেয়াদি কোনো কোর্স করান না। ব্ল্যাক বেল্ট পেতে হলে শিক্ষার্থীদের পাঁচ বছরের কোর্স করতে হয়। কোর্স ফি সম্পর্কে জানতে চাইলে রুবেল বলেন, ‘টাকা-পয়সার জন্য এটা শেখাই না। ভর্তি ফির ব্যাপারে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। অনেককেই ফ্রি শেখাই। এক রিকশাওয়ালা এসে বলল সে মার্শাল আর্ট শিখবে। তাকে বললাম, তোমার টাকা দিতে হবে না। তুমি শিখতে চাও, এতেই আমি খুশি। আর আমি যে ন্যূনতম টাকাটা নিই সেটারও কারণ আছে। একেবারে বিনা পয়সায় শেখালে বিদ্যাটার প্রতি আগ্রহ থাকবে না। আমার ছাত্রের তালিকায় বেশ কয়েকজন সিএনজিচালকও আছে। আমি চাই সবাই শিখুক। রুবেল কোনো নির্দিষ্ট ক্লাসের না, আমি সবার।’

রুবেলের কাছে মার্শাল আর্ট শিখতে চাইলে যোগাযোগ করতে হবে এই ঠিকানায়—

১৪/১ নিউ ইস্কাটনে অথবা প্রতি শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, ইস্কাটনের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের স্কুল মাঠে।



মন্তব্য