kalerkantho


চলচ্চিত্রে খেলা

ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলা নিয়ে বিভিন্ন দেশে হরহামেশাই নির্মিত হয় চলচ্চিত্র। এখানে কেন অনুপস্থিত ‘খেলা’? জানিয়েছেন ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র ছবি ‘জাগো’র পরিচালক খিজির হায়াত খান

৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



চলচ্চিত্রে খেলা

‘জাগো’র দৃশ্য

‘জাগো’ বানিয়েছি ২০১০ সালে। তখন বাংলাদেশে একটাও ডিজিটাল সিনেমা হল ছিল না। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ওই সময় ‘জাগো’র জন্য প্রস্তুত ছিল না। আজকে যদি আমরা ‘জাগো’ রিলিজ দিতাম, মনে হয় রেজাল্ট অনেক ভালো হতো। তখনো একটা রেওয়াজ ছিল, এক বা দুজন স্টার ছাড়া অন্য কারো সিনেমা চলে না। যারা সিনেমা দেখে, তারা ওই এক বা দুজনের সিনেমাই দেখবে। অবস্থাটা এখন অনেকটাই বদলেছে। প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ হয়েছিল ছবিটি নির্মাণে।

যখন এ রকম ভিন্নধর্মী কনটেন্ট ব্যাবসায়িকভাবে অসফল হয় তখন অনেকে অনেক কথাই বলে—‘খেলা নিয়ে বানাইছিল, চলেনি’, ‘ওইটা তো হিট খায়নি’, ‘খেলাধুলা নিয়ে ছবি বানানো রিস্কি।’ আমি বলব, এখনো আমাদের মিডল ক্লাস এডুকেটেড অডিয়েন্স সিনেমা হলে যায় না। এই ধরনের সিনেমা তারাই দেখে, যারা ওয়ার্ল্ড সিনেমা দেখে। কিন্তু আমরা তো এখনো ওদের হলে নিতে পারিনি। সবচেয়ে বড় কারণ, ১৭ কোটি মানুষের জন্য সিনেপ্লেক্স আছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা। আমরা যাদের টার্গেট করে এমন সিনেমা বানাব, তারা তো সিনেমা হলে যেতে পারছে না। এসব কারণে প্রযোজকরা এ ধরনের ছবিতে ইনভেস্ট করেন না। একজন পরিচালক যতই ক্রিয়েটিভিটি দেখাতে চান না কেন, দিনশেষে তাঁকে প্রযোজককে খুশি রাখতেই হয়। ক্রিকেট নিয়ে এত দিনে কমপক্ষে ভালো মানের চার-পাঁচটা সিনেমা হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি।

স্পোর্টস নিয়ে ছবি বানানো খুবই কঠিন। লম্বা সময় লাগে। শিল্পীদেরও প্রশিক্ষিত হতে হয়। আমাদের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের হাতে এত সময় নেই। ‘জাগো’র সময় আরিফিন শুভ, রওনক, নাঈমসহ সবাইকে নিয়ে প্রায় দেড় মাস ফুটবল ট্রেনিং করিয়েছি। আজকে যদি শুভকে বলি দেড় মাস সময় দিতে হবে প্রশিক্ষণের জন্য, ইচ্ছা থাকলেও দিতে পারবে না। আরেকটা অপশন নতুনদের নিয়ে বানানো। নতুনদের নিয়ে সিনেমা বানিয়ে ব্যবসা করা খুবই ডিফিকাল্ট বাংলাদেশে।

এসব সমস্যাও সমাধান করা সম্ভব। তার আগে প্রেক্ষাগৃহ বানাতে হবে। তাহলে শুধু স্পোর্টস না, বিভিন্ন ঘরানার সিনেমার জন্যও সুবিধা হবে। সারা দেশে ৩০-৫০টি সিনেপ্লেক্স করতে পারলে এসব ছবির ব্যবসা করা সহজ হয়ে যাবে।

পশ্চিমবঙ্গের অল্টারনেট সিনেমা দাঁড়িয়ে গেছে মাল্টিপ্লেক্সের কারণেই। রেগুলার দর্শকশ্রেণি আছে ওদের। আমাদের নেই। সে কারণেই সাহস করে এ ধরনের ছবি আর বানাতে পারছি না। আমি তো জানি, পার্টিকুলার নায়ক না থাকলে আমার ছবি চলবে না। আমাদের দর্শক প্রিয় নায়ককে অচেনা গেটআপে দেখতে অভ্যস্ত হয়নি। এটা সাধারণ দর্শকেরও দোষ না। মেহনতি মানুষ জটিল কিছু দেখতে চায় না। এত রহস্য, ক্যামেরার কারসাজি, এমনকি মেসেজও পেতে চায় না। তারা চায় পুরো সময়টা যেন বিনোদনে ভরপুর থাকে। কিন্তু যারা বিশ্ব সিনেমার খোঁজ রাখে, তারা আবার অস্বাভাবিক কিছুই দেখতে চায় না।

‘জাগো’ বানাতে গিয়ে প্রযোজকই পাচ্ছিলাম না। শুরুতে বাজেটও দুই কোটি ছিল না। শুটিং করতে গিয়ে এত টাকা খরচ হয়ে যায়। ইন্টারস্পিডের কর্ণধার সারজিল করিম এবং আদনান করিম—এ দুই ভাইয়ের সাহস না পেলে সিনেমাটি বানানো সম্ভব হতো না। সে সময় টেকনোলজির সবচেয়ে বেশি সমস্যা ছিল। আমরা ডিজিটাল ক্যামেরায় শুট করি। স্টেডিক্যাম বাংলাদেশে ছিলই একটা। এটা আমরা ছবির একটা অংশে মাত্র ব্যবহার করতে পেরেছি। খেলার সিনেমার শুট করার জন্য মাঠে দর্শক দেখাতে হয়। কুমিল্লা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক বসানো যায়। শুটিংয়ে আমার তো কমপক্ষে তিন হাজার দর্শক লাগবে। ভিএফক্সের দক্ষতাও ছিল না প্যানেলে বসে করে ফেলব। সেই তিন হাজার দর্শক নিয়ে শুট করা মানে বিশাল ব্যাপার।

৬৭ দিন আমরা শুটিং করেছি। গরমের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। এখন পোস্ট প্রডাকশনে অনেক উন্নত হয়েছে বাংলাদেশ। তখন আমার ভারতে যেতে হয়েছে। পোস্ট প্রডাকশনেই খরচ হয়েছে প্রচুর। এত কিছু করেও সিনেমাটি হল পায়নি। পরে টিভি চ্যানেল, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দিতে হয়েছে।

স্পোর্টস নিয়ে আবার সিনেমা করব কি না জানি না। যদি বানাই, সিনেমাটির নাম হবে ‘আবার জাগো’।



মন্তব্য