kalerkantho


সঙ্গী তাঁর সেতার

শেখ সাদী খান, সুজেয় শ্যাম, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ও মো. খুরশীদ আলমের সঙ্গে এ বছর সংগীতে ‘একুশে পদক’ পাচ্ছেন ওস্তাদ মতিউল হক খান। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আতিফ আতাউর। ছবি তুলেছেন আলিফ হোসেন রিফাত

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সঙ্গী তাঁর সেতার

সেতারকে ভালোবেসেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যন্ত্রসংগীতে ডুব দিয়েছিলেন। জীবনসায়াহ্নে এসেও তাঁর ভাবনাজুড়ে সেতার। রামপুরা টেলিভিশন ভবন থেকে মিনিট দুয়েকের দূরত্বে মতিউল হকের বাসা। স্ত্রী নূরজাহান খান গত হয়েছেন ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি। এখন তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটে একা। এক দশকের বেশি সময় ধরে প্যারালাইজড হয়ে গৃহবন্দি জীবন যাপন করছেন। শরীরের বাঁ পাশ নড়াতে পারেন না। বসার ঘরের কোনায় সেতারটি মোড়কবন্দি হয়ে আছে; দেখেই বোঝা যায় বহুদিন তাতে হাতের স্পর্শ পড়ে না।

সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৭ সালের একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই মন্ত্রণালয় থেকে খবরটি পেয়েছেন। নাতির সহায়তায় ড্রয়িংরুমে এসে বসেন। অভিনন্দন জানাতেই স্মিত হাসি ফুটে ওঠে মতিউলের মুখে। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়ে কেমন লাগছে? কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এই দুহাত ভরে সেতার বাজিয়েছি। কত গান, কত স্মৃতি! সেই সেতার এখন আর বাজাতে পারি না। ১৩ বছর ধরে বিছানার পাশে সেতারকে সঙ্গী করে ঘুমাই।’ ড্রয়িংরুমের কোনায় রাখা ধূলিধূসর সেতারটির দিকে আনমনে চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বলেন, ‘আমার বাবা ওস্তাদ এরশাদ আলী খানও ছিলেন সেতারবাদক। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে বাবার সেতারবাদন শুনতাম। ভালো লাগা ভালোবাসায় রূপ নিতে সময় লাগেনি। বাবার কাছেই ১২ বছর সেতার বাজানো শিখেছি।’ বাবার পেশার প্রতি ছেলের ভালো লাগা দেখে মতিউলের মা-ও কখনো বাধা দেননি। বরং উৎসাহই দিয়েছেন। যুবক বয়সে পঞ্চাশের দশকে ভারতে যান মতিউল। সেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, আলী আকবর খান, নিখিল ব্যানার্জির কাছে তালিম নেন। আলী আকবর কলেজ অব মিউজিকে উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে পড়ার সময় থেকেছেন তাঁর বাড়িতেই। সেখানে থাকতেই একবার বেশ অর্থকষ্টে পড়েন। পয়সার জন্য পা বাড়ান চলচ্চিত্রে। সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’ এবং তপন সিংহর ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছবির আবহসংগীতেও সেতার বাজিয়েছেন। যখন দেশে ফেরেন, তখন আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশ উত্তাল। তার মধ্যেই যোগ দেন রেডিও পাকিস্তানে—মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে। সংগীত পরিচালনা করতেন। সে সময়ই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। চাকরির কয়েক বছর না যেতেই দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। চলে যান নিজ গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার শিবপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চাইলে স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘বড় একটা পুকুর ছিল আমাদের। সেখান থেকে মাছ ধরে তরকারি রেঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়ে যেতাম।’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যোগ দেন বাংলাদেশ বেতারে। কিছুদিন পর বদলি হন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে। সেখানে কাটে ১৩ বছর। বাংলাদেশ বেতারের বিশেষ মানের উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী ছিলেন তিনি। সেতার বাজিয়ে দুটি অ্যালবামও প্রকাশ করেছেন। প্রথমটি বের হয় ১৯৯৫ সালে বিসিসি ফাউন্ডেশন থেকে। আট বছর পর ২০০৩ সালে সংগীতার ব্যানারে বের করেন দ্বিতীয়টি। ‘হীরামন’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন সংগীত পরিচালক হিসেবে।

কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বিশেষ অনুষ্ঠানে ওস্তাদ আলী আহমেদ খান, আলী আকবর খান, নিখিল ব্যানার্জি, বিসমিল্লাহ খান, পণ্ডিত রবিশংকরের মতো ব্যক্তিত্বদের সামনে সেতার বাজিয়ে বাহবা পেয়েছিলেন তিনি। তুরস্ক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন ও জাপানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সেতার বাজিয়েছেন। লন্ডনের বিবিসি স্টুডিওতে সেতার বাজানোর অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশের বহু গুণী ব্যক্তির সেতার শিক্ষক তিনি। দেশ-বিদেশে তাঁর অনেক শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মেন্টর ফেলোশিপ ইন মিউজিক প্রকল্পে শিক্ষকতা করেছেন দুই বছর। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের উদ্বোাধনী অনুষ্ঠানেও সেতার বাজানোর অভিজ্ঞতা আছে। দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রাপ্ত ‘শিল্পকলা পদক ২০১৩’ উল্লেখযোগ্য।



মন্তব্য