kalerkantho


নারীবাদী নই মানবতাবাদী

এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে নিজের ছবি ‘সোনাটা’ নিয়ে এসেছেন ভারতীয় বাঙালি এই অভিনেত্রী-পরিচালক। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ ঢাকায় অংশ নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক উইমেন কনফারেন্সে। অপর্ণা সেনের সঙ্গে সেখানে কথা বলেছেন পার্থ সরকার

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নারীবাদী নই মানবতাবাদী

ঢাকা চলচ্চিত্র উত্সবে অপর্ণা সেন

প্রথমেই বললেন, ‘সাক্ষাত্কার দিতে পারব না, ছবি তোলারও মুড নেই একেবারে।’ তাহলে কথা তো বলতে পারি সেমিনার শুরু হওয়ার আগে? একটু ভেবে বললেন, ‘সে বলতে পারেন। তবে বেশি তো দেরি নেই সেমিনার শুরু হওয়ার।’

নির্মাতা, নাকি নারী নির্মাতা—কোন পরিচয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

‘অবশ্যই নির্মাতা। শুধু জেন্ডারের ভিত্তিতে আলাদা কোনো তকমা আমার পছন্দ না। ঢাকা উত্সবে যখন নারী নির্মাতা হিসেবে আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলো, তখন আমার একটু বিরক্তই লাগছিল। কিন্তু পরে এসে ভাবনাটা বেশ বদলে গেছে। এখানে না এলে এত নারী নির্মাতার সঙ্গে একসঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান হতো কিভাবে!’

আপনাকে তো নারীবাদী তকমা দেওয়া হয়। সেটা কিভাবে দেখেন? ‘নারী কিন্তু পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়; বরং এমন অনেক কিছুই আছে, যেটা নারীরা পারে, পুরুষরা পারে না। আবার উল্টোটাও আছে। তাই আমি কোনো তুলনা না করে বলতে চাই, নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে, সেটাই হওয়া উচিত। তবে আমি নারীবাদী নই, মানবতাবাদী।’

নির্মাতা হতে গিয়ে বড় কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন? ‘কোনো রকম বাধার সম্মুখীন হইনি কখনো। একে তো আমার বাবা ছিলেন চলচ্চিত্রের মানুষ। কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি শুরু হয় আমার বাবার হাত ধরে, আমাদের বাড়িতে। সত্যজিত্ রায় ছিলেন বাড়ির মানুষ। সব মিলিয়ে আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে চলচ্চিত্রঘেঁষা একটি পরিবারে জন্মেছিলাম। তার ওপর আমি আবার ছিলাম লাস্যময়ী নায়িকা। সবার একটা আলাদা অ্যাটেনশন বরাবরই ছিল। তাই কাজ করতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। আসলে কি জানেন, আমাদের ভারতবর্ষে বাবা-জ্যাঠার একটা পরিচয় থাকলে শুরুর পথটা অনেক মসৃণ হয়। যত দূর জানি, বাংলাদেশেও একই ব্যাপার।’

একেবারেই কি কোনো সমস্যা হয়নি? একটু ভেবে...“প্রথম যখন ছবি বানালাম ১৯৮১ সালে, সবাই তখন ভাবছিল শখে একটা করার জন্য করছি। কেউ খুব একটা পাত্তা দেয়নি। ছবি বের হওয়ার পর অনেকেই একটু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘ও তুমি লিখেছ, তুমি ডিরেক্ট করেছ!’ ভাবখানা এমন, যেন আমি অন্যের লেখা গল্প নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছি কিংবা অন্য কেউ গিয়ে ছবিটা ডিরেক্ট করে দিয়েছিল। রাগে গা জ্বলত! কিন্তু সেগুলো পাত্তা দেওয়ার মতো তেমন কিছু সমস্যা নয়।”

কনফারেন্স ততক্ষণে শুরু হয়ে গেল। অপর্ণা সেন গেলেন মঞ্চে আর আমি দর্শকসারিতে। মঞ্চেও তাঁকে একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হলো। তিনি বললেন, ‘আমাদের সমাজে একজন মহিলার পরিচয় সে মা, কাকি, মামি, বউদি ইত্যাদি। এ রকম চলতে চলতে একসময় তার নিজের নামটাই হারিয়ে যায়। সব কিছুই তার ওই একটি নির্দিষ্ট সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ব্যপারটা অনেকটা এমন, সম্পর্কটা শেষ তো নারীর পুরো দুনিয়া শেষ। তার কিন্তু আর কিছুই রইল না। আমার চলচ্চিত্রে এগুলো নিয়েও কথা বলেছি।’

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় কি দেখছেন? একজন প্রশ্ন করলেন। অপর্ণার উত্তর, “আমি যখন সাংবাদিকতা করতাম, তখন ৬৫ বছর বয়সের এক নারীর একটা চিঠি পেয়েছিলাম। তিনি লিখেছিলেন, ‘১৬ বছর বয়সে এই বাড়িতে এসেছিলাম। তখনো আমার কোথাও যাওয়ার মতো টাকা ছিল না, আজও নেই। নিজের নাম তো ভুলেছি সেই কবেই। অমুকের বউ আর তমুকের মা-তেই জীবনটা আটকে গেছে।’ এই যে মহিলাটা নিজের পুরো জীবন এই সংসারে দিয়ে দিলেন, তাঁর কেন কিছু থাকবে না? কেন তাঁর শ্রমের দাম থাকবে না? কেন তাঁর নিজের নামটাই হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে? এই জায়গাটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আগে।”

এই অঞ্চলের নারী নির্মাতারা পাশ্চাত্যের নারী নির্মাতাদের চেয়ে কতটা পিছিয়ে? ‘পাশ্চাত্যে কতজন নারী নির্মাতা আছেন! এমনকি হলিউডের মতো জায়গায় তাঁদের সংখ্যা ১-২ শতাংশের বেশি নয়। সেই হিসাবে ভারতবর্ষে অনেক নারী নির্মাতা। ব্যবসার দিক থেকে সফলদের সংখ্যাও কম নয়। সুখের কথা হলো, এই নারী নির্মাতার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সেদিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা অনেক ভালো করছেন। চলচ্চিত্রের বাইরের কথা যদি বলি, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স শুধু যে এখানে হয় তা কিন্তু নয়, আমেরিকায় যে পরিমাণ ডমেস্টিক ভায়োলেন্স তা শুনলে আঁতকে উঠতে হয়।’

‘তবে আমি একটা জিনিস নিয়ে খুব ভাবি? এই যে পুরুষরা ধর্ষক হয়, অত্যাচারী হয়; কেন হয়? এরা যখন মায়ের পেট থেকে বের হয়, তখন তো এমনটা থাকে না। সমাজ কী এমন করে যে তারা পশু হয়ে যায় মাঝে মাঝে? আমার মনে হয়, এই জায়গাটা নিয়ে নারীদের, বিশেষ করে মায়েদের  কাজ করার বেশ জায়গা রয়েছে। মায়েদের উচিত তার সন্তানদের বলা—হারতে শেখো, এটাই জীবন। জীবনের সব ক্ষেত্রে তুমি জিততে পারবে না। কেউ মারলে তাকে আরো দুটো মারার দরকার নেই। একটা মেয়ে রিফিউজ করলেই তার ওপর প্রতিহিংসা দেখানোর কিছু নেই। হিংসা নয়, ভালোবাসা দিয়ে জগত্টা গড়ে তোলো। আমরা আমাদের ছেলেসন্তানদের যদি এভাবে গড়ে তুলতে পারি তাহলে ধর্ষকের সংখ্যা কমবে।’



মন্তব্য