kalerkantho


প্রিয় মুক্তিযুদ্ধের ছবি

স্বাধীনতাযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। ৯ মাস প্রাণপণ যুদ্ধের পর বিজয়ের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু ছবি। মহান বিজয় দিবস সামনে রেখে শোবিজ তারকারা বলেছেন তাঁদের প্রিয় মুক্তিযুদ্ধের ছবির কথা। বলেছেন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি নিয়েও

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



প্রিয় মুক্তিযুদ্ধের ছবি

সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘ভুবন মাঝি’র দৃশ্যে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা ঘোষ

ওরা ১১ জন, দ্য ক্রেনস আর ফ্লাইং

সোহেল রানা

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ভালো সিনেমা হয়নি। বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘ওরা ১১ জন’-এর প্রযোজক হিসেবে আমি গর্ববোধ করতে পারি। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘ওরা ১১ জন’ মাইলফলক। তবে এই সিনেমাকে আমি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বলব, ফিচার ফিল্ম হিসেবে এটাকে ভালো ছবিই বলব না। কারণ তখন আমরা নতুন ছিলাম। আমাদের চিন্তা-চেতনায় যেটা আসছে সেভাবেই আমরা ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। ছবির জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দিয়েছেন। এখানে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোও রিয়েল। সিনেমায় ‘ওরা ১১ জন’-এর মধ্যে ১০ জনই সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা। পৃথিবীর আর কোথাও এমন হয়েছে বলে জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের ছায়া অবলম্বনে অনেক সিনেমা হতে পারে। কিন্তু টোটাল যুদ্ধের সিনেমা তৈরি সম্ভব নয় বলেই মনে করি।

বাইরের দেশের ‘দ্য ক্রেনস আর ফ্লাইং’ [১৯৫৭] ভালো লেগেছে।

লাইফ ইজ বিউটিফুল
অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী দ্য গানস অব নাভারন

আলী যাকের

সারা বিশ্বে যে ধরনের যুদ্ধের সিনেমা হয়েছে তেমনভাবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হয়নি। এর একটা বড় কারণ সংগতির অভাব, ইচ্ছার অভাব ছিল না কখনোই। পোস্ট ওয়ার একটা সিনেমা করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন, তা ছিল না। এখন পর্যন্ত যা দেখেছি তার মধ্যে সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ই [১৯৭২] আমাকে ইমোশনালি ইনভলভ করেছে। আমার মনে দাগ কেটেছে। আমার দেখা ভালো মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা এটিই।

দেশের বাইরে তো অনেক আছে। রাশানরা যুদ্ধের ওপর অসাধারণ সব কাজ করেছে। বেশির ভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর—‘দ্য লংগেস্ট ডে’, ‘ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই’। তবে ডেভিড নিভেন ও গ্রেগরি পেক অভিনীত ব্রিটিশ-মার্কিন ছবি ‘দ্য গানস অব নাভারন’কে [১৯৬১] এগিয়ে রাখব। ছবিগুলোর অনেক সংলাপ আমার মুখস্থ। ফ্রেঞ্চ ছবি ‘হিরোশিমা মন আমুর’ও আমার প্রিয়। হিরোশিমায় অ্যাটম বম্ব ফেলা নিয়ে গল্প। আরেকটা অসাধারণ ছবি ‘ডক্টর জিবাগো’। যত দিন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থাকবে তত দিন বিশ্বে এসব ছবিও থাকবে।

আগুনের পরশমণি
ওরা ১১ জন, দ্য হরনেটস নেস্ট

আফজাল হোসেন

মুক্তিযুদ্ধের যত সিনেমাই নির্মাণ হয়ে থাকুক না কেন এখন পর্যন্ত আমার ভালো লাগে ‘ওরা ১১ জন’। ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ও ভালো লাগে।

বিদেশি সিনেমার মধ্যে ‘দ্য হরনেটস নেস্ট’ [২০১৪] সিনেমাটি বেশ ভালো লাগে। আফগান যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত ছবিটিতে যুদ্ধের আবহটা অনেক বেশি উপস্থিত। দুজন সাংবাদিককে নিয়ে গল্পটা। তাদের যুদ্ধে উপস্থিতি।

গেরিলা
মুক্তির গান, দ্য পিয়ানিস্ট

রোকেয়া প্রাচী

‘মাটির ময়না’, ‘গেরিলা’ ও ‘আমার বন্ধু রাশেদ’—তিনটি সিনেমাই আমার ভীষণ প্রিয়। তিনটি ছবিরই আলাদা আবেদন আছে। তবে আমি বলব তারেক মাসুদের তথ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এর [১৯৯৫] কথা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ডকুমেন্টেশন এই ছবিতেই পাই। তখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পর তৈরি তেমন কোনো তথ্যচিত্রও ছিল না। অনেকেই তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, কিন্তু ‘মুক্তির গান’ একদম মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ফুটেজ নিয়ে। এ কারণে ‘মুক্তির গান’ আমাদের কাছে ১৯৭১ সালকেই রিপ্রেজেন্ট করে। সব সময়ই জীবন্ত। অনন্য দলিল বলতে পারি।

বিদেশি সিনেমার মধ্যে ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ [২০০২] খুব পছন্দের। ছবি হিসেবে অসাধারণ, যেমন মেকিং তেমন পারফরম্যান্স। একজন মানুষ যুদ্ধটাকে কেমন করে ফিল করছে সেই গল্প, সিম্বলিক ছবি। পিয়ানোর মিষ্টি সুরের বিপরীত কিছু তো আসলে যুদ্ধ। কেন এই যুদ্ধ? সুর আর অসুরের খেলা? ‘সানফ্লাওয়ার’ও আমার খুব পছন্দের।

আগুনের পরশমণি লাইফ ইজ বিউটিফুল

জয়া আহসান

প্রিয় বললে তো আমার অভিনীত ‘গেরিলা’র [২০১১] কথা বলতেই হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত যত ছবি হয়েছে তার মধ্যে ‘আগুনের পরশমণি’কেই [১৯৯৪] শ্রেষ্ঠ বলব। কারণ এটা মানবিক ও সুনির্মিত ছবি। দর্শককে যুদ্ধের খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছে ছবিটা। যুদ্ধ যারা দেখেনি তারা ছবিটা দেখে ওই সময়টা অনুধাবন করতে পারবে। খুব বেশি আড়ম্বর নেই। গল্পের মূল জায়গাটা আমাকে খুব টাচ করে। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষ যেভাবে এফেক্টেড হয়েছে, শুধু অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ নয় মানসিক-মানবিক যুদ্ধও চলেছে—সেটা ফুটে উঠেছে। ‘আগুনের পরশমণি’ ভেরি সাকসেসফুল সিনেমা।

বিদেশি যুদ্ধের প্রিয় ছবির তালিকা অনেক বড়। ইতালিয়ান ছবি ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’-এর [১৯৯৭] কথা আলাদা করে বলতে চাই। আমার প্রিয় পরিচালক ও প্রিয় অভিনেতার [রবার্তো বেনিনি] ছবি। ভীষণ মানবিক গল্পের ছবি, প্রেম ও যুদ্ধের গল্প। যুদ্ধকে একটু অন্যভাবে উপস্থাপনের জন্য ছবিটার আবেদন কখনো ফুরাবে না। ছবিটা যতবার দেখি ততবার কাঁদি। কষ্ট আর দুঃখ পেয়েও যে মানুষ বিনোদিত হয়, এই ছবি তার প্রমাণ।

ওরা ১১ জন
দ্য ক্রেনস আর ফ্লাইং ওরা ১১ জন

তৌকীর আহমেদ

‘দ্য ক্রেনস আর ফ্লাইং’, ছোটবেলায় দেখেছি এখনো ভুলিনি। রাশিয়ান নির্মাতা মিখাইল কালাতোজোভের একটা মাস্টারপিস এই ছবি। জীবন এবং জীবনের যে উদ্যাপন তা এখানে আছে। বেঁচে থাকার আকুতি, বিয়োগের ব্যথা—সব মিলিয়েই অসাধারণ চলচ্চিত্র। যে একবার দেখবে সে আর ভুলবে না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার কথা বললে ‘ওরা ১১ জন’-এর [১৯৭২] কথা বলব। খুব সুন্দর ছবি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আজ থেকে ২০ বছর পর হয়তো স্বাধীনতা দেখেছে এমন কেউ থাকবে না, তখন এসব শিল্প-সাহিত্য, নাটক-সিনেমাই মুক্তিযুদ্ধকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে।

আগুনের পরশমণি টার্টলস ক্যান ফ্লাই

গিয়াসউদ্দিন সেলিম

‘আগুনের পরশমণি’কেই এগিয়ে রাখব। বাংলাদেশের যুদ্ধের প্লটটা কিন্তু ভিন্ন ছিল। একাত্তরের প্লটটাকে তুলে এনে সিনেমায় ফুটিয়ে তুলতে অনেক বাজেটের দরকার। ছবিটায় যুদ্ধ অত না দেখালেও যুদ্ধের সময় মানুষের মনের অবস্থা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক। সাধারণ দর্শকের মনে গেঁথে আছে ছবিটা। ‘অনীল বাগচির একদিন’ও ভালো ছবি।

ইরাকি ছবি ‘টার্টলস ক্যান ফ্লাই’ [২০০৪] আমার প্রিয় যুদ্ধের ছবি। এখানেও সম্মুখযুদ্ধ নয়, যুদ্ধের ইমপ্যাক্ট দেখানো হয়েছে। অপূর্ব মেকিং। যুদ্ধময় ইরাকের পটভূমি ঘিরে। ইরাকের মানুষ তখন যুদ্ধের খবরের জন্য পাগল। এমন ছোট্ট এক গ্রামে খবরের একমাত্র ভরসা ১৪ বছরের এক কিশোর। তার নাম ‘স্যাটেলাইট’। গ্রামের শিশু-কিশোরদের নিয়ে খোলা মাঠে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণের কাজও করে। এই মাইন বিক্রি করে পয়সাও উপার্জন করে সে। সব চরিত্র গল্পের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে। সিনেমাটা দেখলে মনে হয়, ওই গল্পের মধ্যে আমিও কোনো না কোনো চরিত্র। যুদ্ধ কতটা অমানবিক তা দৃশ্যে দৃশ্যে ফিল করায়।

আগুনের পরশমণি নো ম্যানস ল্যান্ড

মেহের আফরোজ শাওন

প্রথমেই বলব ‘আগুনের পরশমণি’র কথা। আমি নিজে অভিনয় করেছি ‘শ্যামল ছায়া’য়। কিন্তু সেখানে যুদ্ধ দেখিয়ে যতটা না যুদ্ধ অনুভূত হয়েছে তার চেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ‘আগুনের পরশমণি’র একটা ঘরের মধ্যে। একটা মধ্যবিত্ত পরিবারকে দিয়ে পুরো বাংলাদেশের চিত্রটা তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমায় দোকানদারের একটি চরিত্র আছে। সালেহ আহমেদ সাহেব অভিনয় করেছেন। দোকানে তিনি ইয়াহিয়া খানের ছবি রাখেন। প্রতিদিন ঘৃণাভরে ছবিটায় থুতু দেন, আবার ছবিটা তিনি রাখতেও বাধ্য হচ্ছেন—এরকম অনেক বিষয় আছে ছবিতে।

দেশের বাইরের পছন্দের যুদ্ধের ছবি ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ [২০০১]। বসনিয়া যুদ্ধের ওপর ছবিটা। যুদ্ধের মধ্যে একদিনের সকাল থেকে সন্ধ্যার ঘটনা নিয়ে পুরো ছবি। বসনিয়ান ও সার্বদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ফ্রন্টলাইনে নো ম্যানস ল্যান্ডে এক পরিত্যক্ত ট্রেঞ্চে এক বসনিয়ান ও এক সার্ব আটকা পড়ে, দুজনই আহত ও সশস্ত্র। ওই ট্রেঞ্চে আরো একজন আহত বসনিয়ান আটকা পড়ে একটা অ্যাক্টিভেট করা তাজা মাইনের ওপর, যাকে আগে মৃত ভাবা হয়েছিল। ইইউয়ের তৈরি মাইনটা একটু অন্য রকম, চাপ পড়লে মাইনটা অ্যাক্টিভেট হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফাটে না। মাইনটা ফাটবে চাপটা সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, মানে যে আহত লোকটা মাইনের ওপর পড়েছে, সে যদি সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই সিনেমায়ও যুদ্ধটা অনুপস্থিত কিন্তু যুদ্ধের অনেক মানবিক বিষয় উঠে এসেছে।

মুক্তির গান
গেরিলা, শিন্ডলার্স লিস্ট

অনিমেষ আইচ

‘গেরিলা’র শিল্প নির্দেশনায় ছিলাম। এটিকেই এগিয়ে রাখব। কারণ আমার মনে হয়েছে যুদ্ধটাকে কাছ থেকে দেখছি। বাচ্চু ভাই [নাসিরউদ্দীন ইউসুফ] নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। একজন মুক্তিযোদ্ধা সে সময়টাকে যতটা জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন অন্যরা কিন্তু তা পারবে না। ছবিটার মধ্যে ইতিহাসের দলিল আছে। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসটিও আমার খুব প্রিয়।

বিদেশের যুদ্ধের ছবির মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় স্টিফেন স্পিলবার্গের ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ [১৯৯৩]। এই ছবিটায় কালার নিয়ে একটা অদ্ভুত খেলা খেলছে। শুধু যুদ্ধের সিনেমা বলে নয়, এটা আমার দেখা ওয়ান অব দ্য বেস্ট মুভি। অনেকবার দেখেছি। পুরো সিনেমা ইমোশনাল দৃশ্যে ভরা, শেষের দৃশ্যটি সবচেয়ে টাচি। শিন্ডলার্স এক রাতে তাঁর ফ্যাক্টরিতে ইহুদি শ্রমিকদের বলেন, ‘রেডিওতে আজ মধ্যরাতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তোমরা মুক্ত। আর আমি নািস বাহিনীর সদস্য। আমি ক্রিমিনাল...’ তবু তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা কমে না।

অনুলিখন : মীর রাকিব হাসান


মন্তব্য