kalerkantho


যেভাবে ছবি যায় অস্কারে

২০০২ সাল থেকে অস্কারে বাংলাদেশের ছবি পাঠানো হচ্ছে—১৫ বছরে মোট ১২টি। এবারও ছবি আহ্বান করেছে ‘অস্কার বাংলাদেশ কমিটি’। কিভাবে একটি ছবি অস্কারে যায়? সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন খায়রুল বাশার নির্ঝর

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



যেভাবে ছবি যায় অস্কারে

‘ওয়ান কান্ট্রি ওয়ান ফিল্ম’ বিদেশি ভাষার ছবির ক্ষেত্রে এ নীতিই মেনে চলে একাডেমি অব মোশন পিকচার্স আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের যেকোনো দেশ থেকে প্রতিবছর কেবল একটি ছবিই পাঠানো যাবে অস্কার মনোনয়নের জন্য।

কিন্তু এমন তো নয় যে একটি দেশে বছরে একটিই ভালো ছবি হয়! একাধিকও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোনটিকে নির্বাচন করা হবে? এ প্রশ্নটি মাথায় রেখেই পৃথিবীর অনেক দেশে সিলেকশন কমিটির উদ্ভব।

প্রতিবছর চলচ্চিত্র আহ্বান করা হয়। যাচাই-বাছাই করে কমিটি সিদ্ধান্ত দেয় কোন ছবিটি অস্কারে পাঠানোর উপযোগী। যুক্তরাজ্যে এ কাজটি করে ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ দায়িত্ব পালন করে ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া। আবার ব্রাজিলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা অন্য রকম। অস্কারে ছবি পাঠানো-সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড দেখভাল করে দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশেও এসংক্রান্ত একটি কমিটি আছে—‘অস্কার বাংলাদেশ কমিটি’।

২০০২ সাল থেকে তারা কাজ করছে। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের উদ্যোগে ওই বছর তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশি ছবির অস্কারযাত্রা। এই দীর্ঘ সময়ে অস্কারগামী বাংলাদেশি ছবির সংখ্যা ঠেকেছে এক ডজনে। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য এটি অত গৌরবের বিষয় না হলেও একেবারেই ফেলনা নয়। অতীতে অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা ছবির তালিকায় যেমন প্রশংসিত ছবি ছিল, তেমনি এমন অনেক ছবি ছিল যেগুলো নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ছবি বাদ পড়েছে। ফিসফিসানিটা ক্রমেই বাড়ছে। ভারতে তো অস্কার সিলেকশন কমিটির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবারই প্রকাশ্যে অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন কয়েকজন নির্মাতা-প্রযোজক! প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের অস্কার কমিটি ছবি বাছাইকরণ প্রক্রিয়ায় কতখানি স্বচ্ছতা এবং দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে? হাবিবুর রহমান খান, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’সহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু চলচ্চিত্রের প্রযোজক। তিনি শুরু থেকেই অস্কার কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে বিতর্কের সুযোগ নেই। প্রতিবছর অস্কার কমিটির কাছে আমাদের কমিটির তালিকা পাঠাতে হয়। ওরা যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়ার পর আমরা কাজটা করি। ’ ৯ সদস্যের কমিটি। কারা থাকেন এতে? চেয়ারম্যান হিসেবে এ বছরও আছেন হাবিবুর রহমান খান। আরো আছেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সভাপতি আব্দুস সেলিম, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ, শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর, চিত্রগ্রাহক সমিতির সভাপতি আব্দুল লতিফ বাচ্চু, ফিল্ম এডিটরস গিল্ডের সভাপতি আবু মূসা দেবু, নির্মাতা শামীমা আক্তার ও আবু সাইয়ীদ।

কে কী বলছেন?
বিতর্ক করার জন্য কিছু লোক তো থাকেই

হাবিবুর রহমান খান চেয়ারম্যান, অস্কার বাংলাদেশ কমিটি

প্রতিবছর অস্কারের মূল কমিটির কাছে আমাদের কমিটির তালিকা পাঠাতে হয়। ওরা যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়ার পর আমরা কাজটা করি। এখানে আমরা ওদের অ্যাফিলিয়েটেড কমিটি। ইচ্ছা করলেই আমি একটা কমিটি করলাম বা আপনি একটা করলেন—সেটা হবে না। আর বিতর্কের বিষয়ে বলব, বিতর্ক করার জন্য কিছু লোক তো থাকেই। কেউ বিতর্ক করতে চাইলে কিছু করতে পারব আমরা? একটা কথা বলি, এখনকার অনেক স্থপতি আছেন যাঁরা তাজমহলেরও ভুল ধরেন! কীই-বা করার আছে। প্রতিবছর একটা-দুটা-তিনটা করে ছবি জমা পড়ে। অস্কারের আবার বিভিন্ন নিয়মনীতি আছে—কোনটা দেওয়া যাবে, কোনটা যাবে না। সব যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিই।

একাধিক ছবি পাঠানো গেলে ভালো হতো

আবু সাইয়ীদ অস্কার বাংলাদেশ কমিটির সদস্য, ‘নিরন্তর’ পরিচালক এটা সত্যি যে, একটা প্রতিনিধিত্বমূলক কমিটি থাকতে হয়। তবে কমিটিতে কে থাকবে, কে থাকবে না এ নিয়ে একাডেমির কোনো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। এটা যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল বডি নয়, লোকাল বডি; ফলে তার জায়গা থেকে কমিটি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেখান থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে। যদি এ রকম হতো, একটা দেশ থেকে দুটি বা তিনটি ছবি যাবে, অস্কারের সাবকমিটি যেকোনো একটা নির্বাচন করবে, তাহলে আরেক রকম হতো। ভারতেও মাঝে মাঝে দেখা যায়, একটা ছবি সাবমিটেড হলে অন্যরা সেটা পছন্দ করে না। এর বাইরে অন্য কোথাও বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্ক হয় কি না সেটা জানার তেমন সুযোগ নেই। কারণ এটা খুবই ছোট একটা বিষয়! তবে আমার মনে হয় একাধিক ছবি পাঠানোর সুযোগ থাকলে জটিলতা কমত।

জয়যাত্রা কিন্তু অস্কারে যায়নি

তৌকীর আহমেদ ‘অজ্ঞাতনামা’ পরিচালক এই কমিটির মাধ্যমেই বাংলাদেশি ছবি প্রথম অস্কারে যায়। সময়ের সঙ্গে হয়তো কমিটি আরো অর্গানাইজড হবে। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমরা যে খুব ভালো ছবি বানাচ্ছি তা-ও তো নয়। এখান থেকে যে সিলেকশনটা দেওয়া হয়, এটা এক ধরনের প্রতিনিধিত্ব। একটা সময়ে আমাদের ছবি মূল পর্বে সিলেক্ট হবে, সে রকম স্বপ্নও আমরা দেখতে পারি। কিন্তু সে রকম ছবি তো নির্মাণ করতে হবে!
আমি তো আগেও ছবি বানিয়েছি, ‘জয়যাত্রা’ [২০০৪] ভীষণ প্রশংসিত ছবি। ‘জয়যাত্রা’ কিন্তু অস্কারে যায়নি। আবার গত বছর ‘অজ্ঞাতনামা’ পাঠানো হয়েছিল অস্কারে।
এখানে একটা কমিটি কাজ করছে। সিলেকশন যত নিরপেক্ষ হবে, আমাদের জন্য ততই মঙ্গল। আশা করছি সাংগঠনিকভাবে এসব কমিটি আরো দক্ষ হয়ে উঠবে। প্রত্যাশা করি, তাঁরা যেন উপযুক্ত সিদ্ধান্তটা নিতে পারেন। কারণ এটা একটা দেশের ইমেজের ব্যাপার। যত সুষ্ঠু হবে প্রক্রিয়াটা, ততই চলচ্চিত্রের জন্য মঙ্গল।

‘আয়নাবাজি’ অস্কারে পাঠানোর মতো ছবি বলেও মনে হয় না

অমিতাভ রেজা চৌধুরী পরিচালক আমার কোনো আইডিয়াই নেই এসব ব্যাপারে। আমি আসলে আগ্রহী নই। আমার ছবি বানাতে পারলেই হয়, এসব পুরস্কার-অস্কার নিয়ে তেমন কিছুই জানি না। কানে প্রতিবছর দুই লাখ ছবি এন্ট্রি হয়, আপনার ইচ্ছা হলে নাটকও একটা পাঠাতে পারেন। অসুবিধা তো নেই! অস্কারেও তো এ রকম অনেক ছবি যায়। এখন প্রতি দেশ থেকে একটা ছবিই যায় নাকি কিভাবে যায়, একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের কী নিয়ম—কিচ্ছু জানি না। কান-বার্লিন সম্বন্ধে জানি, অস্কার নিয়ে জানি না। বাংলাদেশ থেকে ‘আয়নাবাজি’ অস্কারে পাঠানোর মতো ছবি বলেও মনে হয় না। সারা পৃথিবী থেকে বিদেশি ভাষায় যে ছবিগুলো অস্কার পায়, সেগুলোর কাছাকাছি মানের কোনো ছবি আমরা বানাতে পেরেছি নাকি?

অস্কার কমিটিই অধিক দায়িত্বশীল

আবু শাহেদ ইমন ‘জালালের গল্প’ পরিচালক বাংলাদেশে অস্কার কমিটি কিভাবে হবে, এটার জন্য একটা দিকনির্দেশনা আছে। দিকনির্দেশনা মোতাবেক অস্কার কমিটি গঠন করা হয়। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা থাকেন এখানে। এফডিসির প্রতিনিধিরা থাকেন। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর প্রতিনিধিরাও থাকেন। গত কয়েক বছরে যে ছবিগুলো অস্কারে পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। দু-একটা বছর হয়তো কিছু ছবি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, সেটা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।   জাতীয়ভাবে যেসব পুরস্কার দেওয়া হয়, সেখানে বিদেশে পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির ব্যাপারে এক ধরনের অনীহা দেখা যায়। যতগুলো ছবি অস্কারে গেছে, সেসবের বেশির ভাগই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়নি। আমার তো মনে হয়, অস্কার কমিটিই অধিক দায়িত্বশীল।

অস্কারে যত ছবি
মাটির ময়না [২০০২] তারেক মাসুদ

শ্যামল ছায়া [২০০৫] হুমায়ূন আহমেদ

নিরন্তর [২০০৬] আবু সাইয়ীদ

স্বপ্নডানায় [২০০৭] গোলাম রাব্বানী বিপ্লব

আহা! [২০০৮] এনামুল করিম নির্ঝর

বৃত্তের বাইরে [২০০৯] গোলাম রাব্বানী বিপ্লব

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার [২০১০] মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

ঘেটুপুত্র কমলা [২০১২] হুমায়ূন আহমেদ

টেলিভিশন [২০১৩] মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

জোনাকির আলো [২০১৪] খালিদ মাহমুদ মিঠু

জালালের গল্প [২০১৫] আবু শাহেদ ইমন

অজ্ঞাতনামা [২০১৬] তৌকীর আহমেদ


মন্তব্য