kalerkantho


অন্তরে তার মমতাজ নারী বাহিরেতে শা-জাহান

ঢাকাই ছবির প্রেমিক পুরুষ। এককালে নায়িকার সঙ্গে তাঁর রোমান্স দেখতে মানুষ সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। বাস্তবে যে তিনি কত বড় প্রেমিক, তার খবর রাখেন না অনেকেই। পর্দার বাইরের আপাদমস্তক প্রেমিক রাজ্জাককে নিয়ে লিখেছেন দাউদ হোসাইন রনি

২৪ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



অন্তরে তার মমতাজ নারী বাহিরেতে শা-জাহান

পশ্চিমবঙ্গের এক রেলস্টেশনে বসে ট্রেনের অপেক্ষায় আব্দুর রাজ্জাক ও খায়রুন নেসা লক্ষ্মী

বাড়ির নেমপ্লেটে লেখা ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’। এই বাড়ির কর্তা দেশের সবচেয়ে বড় নায়ক—রাজ্জাক।

হুট করেই তো আর এত বড় তারকার বাড়িতে ঢুকে পড়া যায় না! বাড়ির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পাশের গলিতে একটি চায়ের দোকানে গিয়ে বসে রইলাম। নায়ক নিজেই ডেকেছেন, টিভি সিরিয়ালের জন্য একটি পারিবারিক গল্প শুনতে চান। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢোকার সাহস হচ্ছিল না কিছুতেই। বারবার মনে হচ্ছিল বাবার কথা। রাজ্জাকের অন্ধভক্ত তিনি। নায়কের সঙ্গে দেখা করতে পারলে বাবা নিজের জীবনটাই ধন্য মনে করতেন। সেই বাবার ছেলে এখন রাজ্জাকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, অন্য রকম একটা অনুভূতি। কিছুটা ভয়ও হচ্ছিল। জহির রায়হান, সৈয়দ শামসুল হকের মতো নির্মাতা-লেখক যাঁকে গল্প শুনিয়েছেন, কত শত গল্প শুনে যিনি অভ্যস্ত তাঁকে গল্প শোনানোর জন্য বুকের শক্ত পাটা থাকতে হয়। রাজ্যের ভাবনা মাথায় হাজির। হঠাৎ দেখা গেল, বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছেন সম্রাট, নায়কের ছোট ছেলে। ‘আরে, আপনি এইখানে! আব্বু আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। ’ সম্রাটের কথায় মনে অপরাধবোধ জাগল। বয়সে ৪০ বছরের বড় একজনকে অপেক্ষায় রাখা রীতিমতো অপরাধ। তড়িঘড়ি করে ঢুকতেই দেখি চোখের সামনে নায়করাজ! পরনে পাঞ্জাবি-পায়জামা। সোফায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন। আগন্তুকের চেহারা দেখেই মনোজগতের অবস্থা বুঝে ফেলেছেন হয়তো। পাশের সোফায় বসার অনুমতি দিয়েই বললেন, ‘পানি খাবে?’

আমতা আমতা করে বললাম, ‘জি। ’ মুহূর্তেই পানি চলে এলো।

পরিবেশ সহজ করার জন্য নিজেই শুরু করলেন। এটা-সেটা জিজ্ঞেস করে কৌশলে গল্পটা জেনে নিলেন। সমস্যা হচ্ছে, গল্প শোনাতে এসে নিজেরই গল্প শোনার আগ্রহ তৈরি হলো, লক্ষ্মীকুঞ্জের গল্প। জিজ্ঞেস করি, সম্রাট শাহজাহান কি আপনার পছন্দের বিশেষ কেউ?

উত্তর দেওয়ার আগে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, ‘কেন!’

শাহজাহান তাঁর স্ত্রীর নামে ‘তাজমহল’ গড়েছেন, আর আপনি গড়েছেন ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’...

দুই ঠোঁটের এক পাশ দিয়ে নিঃশব্দে হাসলেন, পর্দায় যেমনটা তিনি সব সময়ই হাসেন। হাসি মিলিয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘প্রেমের বহিঃপ্রকাশ আসলে সব প্রেমিকের কাছেই এক রকম। রাজা-বাদশা হলেই যে তিনি বড় প্রেমিক হবেন তা তো না। দরকার একটা প্রেমিক মনের। কুঁড়েঘরে থেকেও সম্রাট শাহজাহানের চেয়ে বড় প্রেমিক হওয়া সম্ভব। শাহজাহান তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী তাজমহল গড়েছেন, আমি গড়েছি লক্ষ্মীকুঞ্জ। ’

রাজলক্ষ্মী প্রডাকশনস, রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সও তো গড়েছেন। সবখানেই দেখছি লক্ষ্মী আছেন?

‘লক্ষ্মী কোথায় নেই! এই যে শরীরটা, ভেতরে যে প্রাণ, তার পুরোটাই তো ওর। ও আছে বলেই তো এত কিছু। মানুষ যে আমাকে নায়করাজ বলে, ও না থাকলে এত দূর আসতেই পারতাম না। ’

কথার মাঝখানে সম্রাট এসে হাজির, ‘আব্বু, তোমার ঘুমের সময় হয়েছে, আম্মু যেতে বলেছে। ’

নায়করাজ ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর একটু উঁচু স্বরে শোনালেন, ‘এখনো ১৫ মিনিট বাকি। ’ অতিথির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, আরো কী যেন বলতে চাইছ?’

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আর বিজনেস কমপ্লেক্সের নামে ‘লক্ষ্মী’র আগে ‘রাজ’ যোগ করেছেন। বাড়ির নামটায় ‘রাজ’ নেই। অন্তর্নিহিত কোনো অর্থ আছে নিশ্চয়ই?

‘এভাবে তো ভাবিনি!’ মুখের ওপর বলে দিলেন ঠিকই, কিন্তু জবাবটা নিজেরই মনঃপূত হলো না। তিন সেকেন্ডের মতো নীরব রইলেন। তারপর বললেন, ‘এর একটা মানে হতে পারে এমন—আমি যখন বাইরে যাই, তখন লক্ষ্মীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। আর যখন ঘরে ফিরি, তখন লক্ষ্মীর কাছেই ফিরি। ’

আপনি রোমান্টিক নায়ক, সারা দেশের নারীদের স্বপ্নের পুরুষ। সুন্দরী নায়িকাদের সঙ্গে কাটাতে হয় দিনের অনেকটা সময়...

‘থামো থামো। কী বলতে চাও বুঝেছি। শোনো, মোহ আর প্রেম এক না। আমার ২০ বছর বয়সে ঘরে লক্ষ্মী এসেছে। বিয়ের দুই বছর পর কলকাতার টালিগঞ্জ ছেড়ে এক কাপড়ে এলাম ঢাকায়। অচেনা একটা শহরে টিকে থাকার জন্য কত সংগ্রাম করতে হয়েছে! একের পর এক ভালোবাসার পাথর বিছিয়ে আমরা প্রেমের ইমারত গড়ে তুলেছি। এ রকম একটা সম্পর্ক ইগনোর করে কোনো মানুষের পক্ষে বিপথগামী হওয়া সম্ভব না। যার ঘরে প্রেমের অভাব, সে বাইরে গিয়ে হয়তো প্রেম খোঁজে। সাময়িক বা জাগতিক কোনো মোহ আমাদের বিশ্বাস টলাতে পারেনি। ’

কবরী, ববিতার মতো সহশিল্পীদের সঙ্গে আপনাকে ঘিরে গুজব ছিল। এসব নিশ্চয়ই আপনার স্ত্রীর কানে চলে যেত। কিছু বলতেন না? ‘হা হা হা। রাগ তো করতই। কোন মেয়েটা স্বামীর সঙ্গে অন্য নারীকে সহ্য করতে পারে শুনি! আমি যখন কাছে গিয়ে বলেছি, গুজব তো গুজবই। তুমি আমার লক্ষ্মী ছিলে, লক্ষ্মীই থাকবে। মুহূর্তেই ওর রাগ পানি হয়ে যেত। কবরী-ববিতারা কিন্তু লক্ষ্মীরও কাছের মানুষ। এই উপলক্ষ সেই উপলক্ষ এলে ও-ই তাদের দাওয়াত করে বাসায় আনে। ’

আবার ঘড়িতে তাকালেন। ১৫ মিনিট হয়ে গেছে। ‘আজকে এ পর্যন্তই। এখন আমার ঘুমানোর সময়। পরে আবার কথা হবে’, বলেই বসার ঘর ছাড়লেন। অন্য রুমে ঢোকার আগমুহূর্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, “স্ক্রিপ্ট করে নিয়ে এসো কিন্তু। আরো কথা হবে। গল্পটা ভালো, নামটাও সুন্দর—‘অষ্টব্যঞ্জন’। ”

 

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, ‘অষ্টব্যঞ্জন’ আর তৈরি হয়নি। কয়েক দিন পরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই শরীর নিয়ে বড়জোর এক ঘণ্টার নাটক বানানো যায়, সিরিয়াল অসম্ভব।

 

ছয় বছর পর, স্থান সেই লক্ষ্মীকুঞ্জ

বাড়ির সামনে অ্যাম্বুল্যান্স। সেখানে শুয়ে আছেন লক্ষ্মীর প্রেমিক রাজ। বাড়ির ভেতর লক্ষ্মী। দুজনেরই নিথর দেহ, পার্থক্য কেবল নিঃশ্বাসে—রাজ আর নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না, লক্ষ্মী এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। একটু পরেই বনানীর কবরস্থানে দাফন করা হবে রাজকে। শবযাত্রীরা সবাই উচ্চ স্বরে প্রার্থনা করছে। ঠিক তখনই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুকের মনে পড়ল কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতার দুটি চরণ—

‘তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছ তার প্রাণ?

অন্তরে তার মমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান। ’


মন্তব্য