kalerkantho


নায়িকাদের চোখে নায়করাজ

সুচন্দা, কবরী, শাবানা ও ববিতার সঙ্গে জমে উঠেছিল রাজ্জাকের জুটি। শাবানা এখন দেশে নেই। বাকি তিনজনই বলেছেন প্রিয় সহকর্মীকে নিয়ে। প্রথম পরিচয়, শুটিং, গুজব—কত কত স্মৃতি!

২৪ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



নায়িকাদের চোখে নায়করাজ

তিনি সেরা হতে চেয়েছিলেন, হয়েছেন

সুচন্দা

কস্টিউম ডিজাইনার এসেছেন। তাঁর কাছে ড্রেসের মাপ দিয়ে ফিরে যাচ্ছি।

হঠাৎ জহির রায়হান বলে উঠলেন, ‘আরে রাজ্জাক, এদিকে আসেন। ’ সামনে আসার পর পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “আমি ‘বেহুলা’ বানাচ্ছি, সুচন্দা এই ছবির নায়িকা বেহুলা আর আপনি হলেন নায়ক লখিন্দর। আপনাকে নায়ক বানিয়ে দিলাম, যান আজ থেকে আপনি নায়ক। ” সুখবরটি শোনার জন্য হয়তো প্রস্তুত ছিলেন না রাজ্জাক। তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। পায়ে হাত দিয়ে জহিরকে সালাম করলেন। সেদিনই আমাদের প্রথম দেখা।

প্রথম ছবিতেই তিনি সাবলীল অভিনয় করেছেন। ‘বেহুলা’ পুরো পূর্ব পাকিস্তানের সব সিনেমা হলে অনেক দিন চলেছে।

এরপর তো সুচন্দা-রাজ্জাক জুটিই গড়ে উঠল। মনে আছে, ‘আনোয়ারা’র শুটিং করতে সিরাজগঞ্জে গিয়েছিলাম। সেখানে কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকার জনগণের চাপে শুটিং করাই দুষ্কর হয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত তারা জহির রায়হানের কাছে আবেদনপত্রও লিখেছিল—‘আমরা রাজ্জাক-সুচন্দাকে কেবল একনজর দেখতে চাই। ’ কুয়াশার মধ্যে শুটিং করবেন বলে পরিচালক খুব ভোরে শুটিং কল করলেন। আমরা রাতেই মেকআপ নিয়ে নিলাম, যাতে জহির রায়হান ডাকলেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারি। শুটিং করতে করতে ঈদ চলে এলো। এখনকার মতো তখন শুটিং শেষে আমরা দিনে দিনে ঢাকায় ফিরতে পারতাম না। লোকেশনে থাকতে হতো। আমরা তো ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে চাই। কিন্তু জহির যেতে দেবেন না, তাহলে ছবির ছন্দঃপতন হবে। ঈদের দিনও শুটিং করতে হলো।  

রাজ্জাক-সুচন্দা জুটির অনেক বিখ্যাত ছবি আছে—‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘মনের মতো বৌ’, ‘দুই ভাই’, ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘জুলেখা’, ‘সুয়োরাণী দুয়োরাণী’, ‘সখিনা’। ‘জীবন থেকে নেয়া’র গল্প একটু বলি। তত দিনে জহিরের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমরা দিলু রোডে থাকি। একদিন তিনি ছবিটির শিল্পী-কলাকুশলীদের ডেকে বললেন, ‘আজ রাতে আপনারা আমার বাসায় থাকবেন, ডিনার করবেন। ভোরে আমরা প্রভাতফেরির শুটিং করতে যাব। ’ খাওয়াদাওয়া সেরে রাতভর সবাই গল্প করলাম। ভোরে বেরিয়ে গেলাম। আমাদের সঙ্গে আনু ভাই (আনোয়ার হোসেন), রোজী ভাবিও (রোজী আফসারী) ছিলেন। পরে ঢাকার আরিচায় শুটিং করতে যাওয়ার সময় আমাদের গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ল। তবু শুটিং করলাম। ফেরার পর পুলিশ সবাইকে থানায় নিয়ে গেল। গভীর রাতে গাড়িটি আটকে রেখে আমাদের ছেড়ে দিল। ট্রাকে চড়ে ঢাকায় ফিরতে হয়েছিল।  

ব্রেক দিয়েছিলেন বলে সারা জীবনই জহির রায়হানের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন। যত দিন জহির বেঁচে ছিলেন, কোনো সিনেমায় অভিনয়ের অফার পেলে রাজ্জাক আমাদের বাসায় আসতেন, ‘জহির ভাই, আমার হাতে একটি অফার আছে, করব?’ পরিচালক ও ছবিটির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে জহির বলতেন, ‘নিশ্চয়ই কাজ করবেন। ’ জহিরের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো ছবি সাইন করেননি। উপার্জনের টাকায় প্রথম যখন গাড়ি কিনলেন, সেই টয়োটা চালিয়ে বাসায় চলে এলেন। আমরা তখন বাড়িতে ছিলাম। ‘জহির ভাই, গাড়ি কিনেছি। আপনি আর ম্যাডাম না চড়লে এই গাড়িতে আমি বসব না। ’ শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের চড়িয়েই ছাড়লেন। কিছুদূর ঘুরে আমাদের বাড়িতে নামিয়ে দিলেন। যখনই জহির ডেকেছেন, তিনি ছুটে এসেছেন। জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি মাঝেমধ্যে বাসায় এসে আমার খোঁজ নিয়েছেন। তাঁর এই আন্তরিকতা, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা খুব প্রশংসনীয়। তাঁর পরিবারের সঙ্গেও আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সুখে-দুঃখে কথা হতো। নানা অনুষ্ঠানে আমরা তাঁদের বাসায় গিয়েছি, তাঁরাও এসেছেন।

কলকাতায় থাকাকালে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর চেহারা ক্যামেরায় এত সুন্দর লাগত যে আমার মতো অনেকেরই মনে হয়েছে, উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর চেহারা, চুল বা কোথাও যেন একটু মিল আছে। তখন তো আমাদের হাতে গোনা কয়েকজন নায়ক। তিনি তাঁদের মধ্যে সেরা হতে চেয়েছিলেন, হয়েছেনও। সে জন্য অধ্যবসায়, প্রচেষ্টা, ধৈর্য, সহনশীলতা, আগ্রহসহ যত গুণের প্রয়োজন, সবই রাজ্জাকের  মধ্যে ছিল। এ কারণেই তিনি এত বড় শিল্পী হয়েছেন, এ দেশের মানুষের কাছে এত      প্রিয় হয়েছেন।

 

আমার বেশির ভাগ ছবির নায়কই রাজ্জাক

কবরী

রাজ্জাকের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে কিছু ভালো লাগছে না। ফোনটা অনেক সময় ধরে বন্ধ রেখেছিলাম। শত শত ফোন, নানা ধরনের প্রশ্ন। কী বলতে কী বলব, মাথা ঠিক ছিল না। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আমাদের। মান-অভিমান তো ছিলই, ছিল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধও। একটা সময় তো আমাদের জুটি নিয়ে নানা ধরনের কথা রটেছিল। আমরা সেটা উপভোগ করতাম। বিশেষ করে লক্ষ্মী ভাবি আমাদের নিয়ে বেশ মজা করতেন। বলতেন, ‘দেখো, রাজ্জাক বাইরে তোমাদের নায়ক, কিন্তু ঘরে শুধু আমার। বাইরের বিষয় নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। ’ ভাবির কথায় আমরা হাসতাম। একজন লক্ষ্মী ছাড়া বোধ হয় রাজ্জাকের পক্ষে নায়করাজ হওয়া কঠিন হতো। রাজ্জাকের সঙ্গে আমার প্রথম ছবি করার কথা ছিল ‘যোগাযোগ’। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের পরিচালনা করার কথা। আমি তখনো রাজ্জাক সম্পর্কে অতটা জানতাম না, প্রশংসা শুনেছিলাম শুধু। ভেবেছিলাম, অন্য নায়করা যেমন, তেমনই কেউ একজন হবে। গাজী ভাইয়ের বাসায় গিয়ে ধারণা বদলে গেল। কথা বলে বুঝলাম, সে লম্বা রেসের ঘোড়া। চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক ভাবে। গল্প, চিত্রনাট্য সব কিছুই দারুণ বোঝে। প্রথম দিনই দুজনের মধ্যে আন্তরিকতা তৈরি হলো। যদিও ‘যোগাযোগ’ শেষ পর্যন্ত হয়নি। পরে জুটি হিসেবে আমরা প্রথম করি কাজী জহিরের ‘ময়নামতি’ [যদিও আগে মুক্তি পায় ‘আবির্ভাব’]। শুটিং শুরুর সময় থেকেই আমাদের জুটি আলোচনায় চলে আসে। আর ছবি মুক্তি পাওয়ার পর তো কথাই নেই! একের পর এক ছবিতে জুটি হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হতে থাকলাম। আমার বেশির ভাগ ছবির নায়কই কিন্তু রাজ্জাক। ‘ময়নামতি’র শুটিংয়ের সময়কার কিছু স্মৃতি মনে পড়ে। তখন দেশ উত্তাল। চলছে আন্দোলন। শুটিং লোকেশন সাভারের নয়ারহাট। টিম পৌঁছার আগেই আমি আর রাজ্জাক রওনা দিলাম কাকডাকা ভোরে। গাড়ি চলছে শাঁই শাঁই গতিতে। এর মধ্যে আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি লোকেশনে। মেকআপম্যান কাদরি ভাই তড়িঘড়ি মেকআপ দিলেন। শুটিংয়ের জন্য তৈরি হয়ে গেলাম।

রাজ্জাককে আমি সব সময়ই বন্ধু ভাবতাম। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘রাজলক্ষ্মী’র প্রথম ছবি ‘রংবাজ’-এ বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলাম। ছবিটি সে সময় রেকর্ড ব্যবসা করার পরও একটি পয়সাও দাবি করিনি। অনেকেই হয়তো জানেন না, রাজ্জাক, আমি, চিত্রগ্রাহক বেবী ইসলাম, পরিচালক নারায়ণ ঘোষ মিতা মিলে ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ছবি প্রযোজনা করি। শুটিং হয় চুয়াডাঙ্গা। সেখানকারও কিছু মজার ঘটনা আছে। ওই এলাকায় প্রথম সিনেমার শুটিং। হাজার হাজার মানুষের ভিড়। এদিকে আমরাও গেছি শুটিংয়ের পাশাপাশি পিকনিক করতে। মজা করতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভিড়ে সেটা আর হয়ে উঠছে না। শেষ পর্যন্ত ইউনিটকে বলে দিলাম, মানুষজন এলেই বলবা শুটিং প্যাকআপ।    এই কথা শুনে সবাই যখন চলে যেত আমরা নেমে পড়তাম শুটিংয়ে। এ রকম অনেক স্মৃতি আছে। বলতে পারলে ভালো লাগত। মনটা হালকা হতো। কিন্তু ইচ্ছা করছে না। সবারই একদিন মৃত্যু আসবে আর তা মেনেও নিতে হবে। রাজ্জাকের মৃত্যু মেনে নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।

 

মানুষ রাজ্জাকের মৃত্যু হলেও নায়করাজের মৃত্যু নেই

ববিতা

চলচ্চিত্রে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন রাজ্জাক ভাই। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ ছবির নায়িকা আমি। শিশুশিল্পী হিসেবে আমার প্রথম ছবি ‘সংসার’-এ সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলাম তাঁকে। জহির রায়হানের এই ছবিতে আমি তাঁর আর সুচন্দা আপার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এরপর ‘স্বরলিপি’তে প্রথম দুজন জুটিবদ্ধ হই। রাজ্জাক ভাই আর নেই, মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে। নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। কিছুদিন আগেও আমাদের কথা হয়েছে টেলিফোনে। অথচ কোথা থেকে কী যে হয়ে গেল! আজ অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। জুটি হিসেবে আমরা যখন একের পর এক সফল ছবি উপহার দিচ্ছি, তখন আমাদের নিয়ে প্রেমের গুজব রটে। এই রটনাকে আরেকটু বাজিয়ে দিতে রাজ্জাক ভাই নিজের প্রযোজনা ও পরিচালনায় শুরু করলেন ‘অনন্ত প্রেম’, আমাকে ৫০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন! সে সময় এত টাকা কোনো নায়িকাই পেতেন না। আমি বুঝতে পারিনি তিনি ভেতরে ভেতরে কী পরিকল্পনা এঁটেছেন। বুঝলাম গিয়ে ছবির শেষ দৃশ্যে। দৃশ্যটা এমন—আমরা দুজন ফেরারি। বনজঙ্গলে পুলিশের তাড়া খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলে। পালানোর সময় দুজনই গুলি খাই। ঝরনা থেকে লাফিয়ে পড়ি। এরপর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাই। দৃশ্যটি এত অন্তরঙ্গ ছিল যে প্রথমে করতে চাইনি। রাজ্জাক ভাই নাছোড়বান্দা। বললেন, আমাকে করতেই হবে! আমিও সুযোগ নিলাম। বললাম, তাহলে আরো ২০ হাজার টাকা বেশি পারিশ্রমিক লাগবে। কোনো কথা না বলেই রাজি হয়ে গেলেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হয়ে গেল। এমনকি চুমুর দৃশ্যসহ ছাপা হলো। আমি তো ভয়ে অস্থির। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই ভেবে, সেন্সর কর্তৃপক্ষ হয়তো দৃশ্যটি রাখবে না। কিন্তু অবাক কাণ্ড, ছবি আনকাট ছাড়পত্র পেল! রাজ্জাক ভাইকে ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম, দৃশ্যটি কিভাবে সেন্সর পেল? হাসতে হাসতে বললেন, ‘শোনো, গল্পের প্রয়োজনে, দুটি মনের প্রয়োজনে দুটি মানুষ যদি এক হয় সেখানে অশ্লীলতার কিছু নেই। সেন্সর বোর্ড এটা বোঝে। তবে তোমার যেহেতু ভালো লাগছে না, অস্বস্তিতে আছ আমি দৃশ্যটি কেটে দেব। ’ সত্যি তিনি কথা রেখেছিলেন। পর্দায় দৃশ্যটি দেখতে পায়নি দর্শক। তবু ছবিটি সে কী ব্যবসা করেছিল!

রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে আমার বা আমাদের [সুচন্দা-চম্পা] রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও পারিবারিক একটা সম্পর্ক ছিল। আমার দুলাভাই জহির রায়হান নায়ক হিসেবে সুযোগ করে দিয়েছিলেন রাজ্জাক ভাইকে। সে কথা সব সময় মনে রেখেছিলেন তিনি। আমরাও তাঁর ভালোবাসা ভুলতে পারিনি। তাই শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে ছুটে গিয়েছিলাম এফডিসিতে। আমি মনে করি, মানুষ রাজ্জাকের মৃত্যু হলেও নায়করাজ রাজ্জাকের কোনো মৃত্যু নেই। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ইতিহাস রচনা করে গেছেন। এ ইতিহাস কেউ মুছতে পারবে না।

 

অনুলিখন : ওমর শাহেদ ও সুদীপ কুমার দীপ


মন্তব্য