kalerkantho


‘লালনের বুকের ওপর এখন ফাল দেয় মানুষ’

পাঁচ দশক ধরে গান করলেও নজরুলসংগীতের অ্যালবাম এই প্রথম। চলছে রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবামের কাজ। সুবীর নন্দীর সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবিউল ইসলাম জীবন

১৭ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



‘লালনের বুকের ওপর এখন ফাল দেয় মানুষ’

এত বছর পর নজরুলসংগীতের অ্যালবাম...

ছোটবেলা থেকেই নজরুল গাইতাম। সর্বপ্রথম গেয়েছিলাম—‘বউ কথা কও’।

নজরুলসংগীত শিল্পী হিসেবেই বেতারে তালিকাভুক্ত ছিলাম। আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় আর সেভাবে গাওয়া হয়নি। তবে ইচ্ছা ছিল। ‘মোরা ছিনু একেলা’ শিরোনামের এ অ্যালবামের আমার সহশিল্পী ছন্দা চক্রবর্তী। গান রয়েছে ১০টি। প্রায় সব গানই প্রেম পর্যায়ের। বেশির ভাগই রাগের ওপর করা। গানগুলো বেছে দিয়েছেন সুধীন দাশ। আমার মনে হয়, এটাই তাঁর শেষ কাজ।

রেকর্ডিংয়ের অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করতেন—

অ্যালবামের জন্য রেকর্ডিং, তাই গাইতে গিয়ে একটু কেয়ারফুল ছিলাম। সুরটা আয়ত্তে রাখা গেলে গাইতে সুবিধা হয়। গানগুলোর মধ্যে মজা আছে, বৈচিত্র্য আছে।

দ্বৈতর পর এবার তো একক অ্যালবাম করছেন—

হ্যাঁ। ভাবলাম, নজরুলের গান নিয়ে নিজের একটি একক অ্যালবাম থাক। আটটি গান নিয়ে এ অ্যালবাম। বেশির ভাগই রাগভিত্তিক। দু-তিনটি গান আছে একসময় গাইতাম, এখন আর গাওয়া হয় না। সংগীতায়োজন করছেন উজ্জ্বল সিনহা। ছয়টি গানের রেকর্ডিং শেষ। আমার প্রডিউসারের প্রেসার নেই। নিজের মতো করতে হয়। ফিন্যান্স জোগাড় করা লাগে। আগামী বছরের জ্যৈষ্ঠ মাসে অ্যালবামটি প্রকাশ করব।

রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবামও তো করছেন...

রবীন্দ্রনাথের গান প্রথম গেয়েছিলাম পাঁচ-সাত বছর বয়সে। গানটি ছিল—‘আমার মাথা নত করে দাও হে’। এটা আমাদের পরিবারের সিগনেচার টিউন ছিল। সাদী মহম্মদ অনেক দিন ধরে বলছিল রবীন্দ্রসংগীতের একটি অ্যালবাম করার জন্য। আমিও চাচ্ছিলাম। কিন্তু দুজনের কারোরই সময় হয় না। এবার দুজন মিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পূজার পর কাজে হাত দেব।  

নজরুলসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত—গাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

সব গানেরই নিজস্ব গায়কি আছে। খুব বেশি এদিক-ওদিক করার সুযোগ নেই। নজরুলের গান একটু ইম্প্রোভাইজ করা যায়। রবীন্দ্রনাথের গান অবশ্য অনেকে যাচ্ছেতাইভাবে গাচ্ছে। আসল কথা হলো পরিমিতিবোধ। বেশি গাওয়াও ভালো না। বেশি বাজানোও ভালো না। আজকাল দেখি লালনের গানও যে যার মতো করে গায়। লালনের বুকের ওপর এখন ফাল দেয় মানুষ। অথচ গত ১০ বছরে সে অর্থে লালনের গানের শিল্পী আসেনি। ফরিদা পারভীন, আর চন্দনা মজুমদাররাই তো আছেন। যেকোনো গান অন্তরে ধারণ করে গাইতে হয়। নজরুল-রবীন্দ্রনাথ-লালন তাঁরা নিজেরাই নিজেদের গান দিয়ে আলোকিত। আমরা তাঁদের গান দিয়ে আলোকিত হব, বড় হব—এই চিন্তা করা উচিত। উল্টো তাঁদের আলোকিত করতে যাই। এটা ধৃষ্টতা। গাওয়ার মধ্যে জীবনাচার থেকে সব কিছু চলে আসতে হবে। কিছু গান শুনে মানুষ বিরক্ত হচ্ছে। নতুনত্ব থাকবে, কিন্তু গানকে ছাড়িয়ে যদি অন্য কিছু চলে আসে তাহলে তো হবে না। একটা গানের জন্য একজন শিল্পী বেঁচে থাকে। ‘অতল জলের আহ্বান’ ছবিতে সুজাতা চক্রবর্তীর ‘ভুল সবি ভুল এই জীবনের পাতায় পাতায়’ সবচেয়ে বড় উদাহরণ। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর করা এই গানই শিল্পীকে বাঁচিয়ে রেখেছে।  

গান প্রকাশের মাধ্যমে পরিবর্তন এসেছে। আপনি তো ফিতা, ক্যাসেট কিংবা সিডিতে গান বের করেছেন। এখন অনলাইন, ইউটিউব। এটাকে কিভাবে দেখেন?

অ্যাপ্রিসিয়েট করি। সবাই স্বাধীন। যে প্রকাশ প্রচার করতে পারছে না, তার গানটাও শোনা যাচ্ছে।

ইউটিউব ভিউ দিয়ে গানের জনপ্রিয়তা যাচাই করাকে কিভাবে দেখেন?

এ নিয়ে কিছু বলতে চাই না।

মিউজিক ভিডিও...

আমার কাছে গান শোনার বিষয়। মিউজিক ভিডিওর প্রচলন ইন্ডিয়ায়ও ছিল। এখন আর সেভাবে নেই। আমি আবারও বলি, গান সব সময় শোনার বিষয়। অভিনয় দেখার বিষয়।

বাংলাদেশে এখনো গীতিকার, সুরকাররা গানের রয়ালটি বুঝে পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পুরো অংশটিই চলে যাচ্ছে তৃতীয় পক্ষের হাতে...

হবে আস্তে আস্তে। আইনটা তো হয়েছে। প্রয়োগও হবে নিশ্চয়ই। কত আইনই তো আছে। প্রয়োগ হয় কয়টির? আমরা তো একসময় এই আইনের সঙ্গে পরিচিতই ছিলাম না। নতুন একটা জিনিস শুরুতে গ্রহণ করতে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, নানা ব্যাপার থাকে। আমি আশাবাদী। সরকারও উদ্যোগ নিচ্ছে। পাঁচ-দশ বছর পর হলেও হবে। আমরা না পাই পরবর্তী প্রজন্ম অন্তত পাবে।

অবসরে কী করেন?

গান নিয়ে বসি। হাতের কাজগুলো করি।

নতুনদের গান শোনেন? কাদের কাজ ভালো লাগে?

নাম ধরে বললে মুশকিল আছে। অনেকেই ভালো করছে। সবার আরেকটু যত্নবান হওয়া উচিত। কাজ করার সুযোগই যদি তারা না পায় ভালো করবে কিভাবে? আর লেগে থাকলে ফল আসবে।

সংগীতজীবনের প্রায় ৫০ বছর পার করেছেন। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করেছেন কখনো?

সবই তো প্রাপ্তি। প্রাপ্তি ছিল বলেই তো এখনো গান নিয়ে কথা বলছি। মানুষের এত এত ভালোবাসা পেয়েছি। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি।


মন্তব্য