kalerkantho


‘অনেক অগায়কও গায়ক হয়ে যাচ্ছে’

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘অনেক অগায়কও গায়ক হয়ে যাচ্ছে’

বাপ্পা মজুমদার সংগীত পরিচালক

এই প্লাগ-ইন বা অটো টিউন হচ্ছে গানের ছোট ছোট ভুলগুলো ঠিক করার জন্য। বিশ্বের সবখানেই এর ব্যবহার আছে।

কিন্তু আমাদের দেশে যন্ত্রটি ব্যবহারের কারণে অনেক অগায়কও গায়ক হয়ে যাচ্ছে। একজন সত্যিকারের গায়ক-গায়িকা বছরের পর বছর চর্চা করে সঠিক সুরে গাওয়ার জন্য। এই প্লাগ-ইনের কারণে গান শিখে আসা শিল্পীদের সঙ্গে রেকর্ডিংয়ে ফাইট হচ্ছে যারা সঠিক সুরে গাইতে পারে না তাদের সঙ্গে। এটা খুব খারাপ একটা দিক। এর ফলে যারা চর্চা করে আসছে তাদের অবমূল্যায়ন হচ্ছে। তাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে অটো টিউনের ওপর নির্ভরশীল গায়ক-গায়িকারা। যারা সঠিক সুরে গাইতে পারে না বা প্লাগ-ইন-নির্ভর তারা যখন দর্শকের সামনে গাইতে যায় তখন বিব্রত অবস্থায় পড়ে। শ্রোতারা বিষয়টি ঠিকই ধরতে পারে। তখন শ্রোতাদের দিক থেকে একধরনের কনফিউশন তৈরি হয়। শ্রোতারা ভাবে আমি এই শিল্পীর গান যেভাবে শুনলাম, লাইভে তো সে রকম লাগছে না! সমস্যাটা কী? এই যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের গায়কদের ক্ষেত্রে বিশাল দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে। যারা সঠিক সুরে গাইতে পারে আমরা তাদের সামনে আনতে পারছি না। উল্টো ফোকাস হচ্ছেন এই ধরনের প্লাগ-ইন-নির্ভর শিল্পীরা। আমি রেকর্ডিংয়ের সময় বারবার চেষ্টা করি সঠিক সুরে ডেলিভারি দেওয়ার জন্য। এই প্র্যাকটিসটা খুব জরুরি। সঠিক সুরে গাওয়ার ইচ্ছা এবং ক্ষমতা নিয়েই একজন শিল্পীর রেকর্ডিংয়ে যাওয়া উচিত।  

আমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের সঙ্গে কাজ করি, যারা গাইতে পারে। যন্ত্রটি আমিও ব্যবহার করি, তবে অটো টিউন হিসেবে নয় পিচ কারেক্টার হিসেবে। মানে সামান্য ভুলত্রুটি থাকলে সেগুলো ঠিক করি। আর তাই আমার গানগুলোতে কণ্ঠটাকে মেশিনের মতো মনে হয় না। আমার কাছে যারা গাইতে আসে সঠিক ও শুদ্ধভাবে গাওয়ার প্রবণতা নিয়েই আসে। সে কারণে আমার গানগুলোতে একটা হিউম্যান ফিল থাকে। রোবটিক মনে হয় না। কিন্তু এখনকার গানে এমন জোরালোভাবে প্লাগ-ইন দেওয়া হয় সেটা তখন আর হিউম্যান ভয়েস থাকে না, মেকানিক্যাল হয়ে যায়। কারণ ওই গায়ক-গায়িকা এতই বেসুরো গায় যে তা ঠিক করতে গেলে প্লাগ-ইনের রেশিওটা অনেক বাড়িয়ে দিতে হয়।

আমাদের কাজ করা উচিত তাদের নিয়ে, যারা গাইতে পারে। সঠিকভাবে গাওয়া গানের আবেদনও ভিন্ন হয়। যাঁরা সংগীত পরিচালনা করেন এ ক্ষেত্রে তাঁদের দায় অনেক বেশি। একজন সংগীত পরিচালকই শিল্পীর কণ্ঠ রেকর্ড করেন। তিনি যদি সুযোগ না দেন, তাহলে একজন বেসুরো শিল্পী গান করার সুযোগ পায় না। আমি নিজেও যে এ ধরনের শিল্পীদের নিয়ে কাজ করিনি, তা কিন্তু নয়। করেছি, তবে সংখ্যাটা খুব অল্প। আমরা অনেক সময় তাদের জন্য গান বানাই, যারা ঠিকমতো গাইতে পারে না বা গাওয়া দুর্বল। কিন্তু কাজ করি পেটের দায়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটা কিন্তু ক্ষতির কারণ। আমাদের আরো সচেতন হওয়া দরকার। নিজের কথাও বলছি। কাদের দিয়ে গান গাওয়াব, কাদের দিয়ে গাওয়াব না এই প্রার্থক্যটা করা খুব জরুরি। শিল্পী কতখানি সুরে গাইছে, কতখানি গাইছে না এটা বিবেচনার ক্ষমতাও সংগীত পরিচালকের থাকতে হবে, সুর সম্পর্কে জানতে হবে। সংগীত পরিচালকেরই যদি সুর-জ্ঞান না থাকে ডিরেকশন দেবে কিভাবে? 

অনেকে আবেগের বশে গান করতে আসেন। এদিকেও সংগীত পরিচালকদের দৃষ্টি দিতে হবে। সবাই অর্থের জন্যই কাজ করেন। কিন্তু দায়িত্বের জায়গা থেকে এটা একদমই ঠিক নয়। আমাদের নিজ নিজ জায়গায় আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। তবেই এ সংকট নিরসন সম্ভব হবে।


মন্তব্য