kalerkantho


‘নকল আর আসলের অনেক তফাত’

অটো টিউন : আশীর্বাদ না অভিশাপ?

এখনকার প্রায় সব সংগীত পরিচালকই অটো টিউন ব্যবহার করেন। এ নিয়ে একেকজনের একেক অভিমত। কারো চোখে অভিশাপ, কারো কাছে এটা আশীর্বাদ। এ নিয়ে রঙের মেলার এক পৃষ্ঠার বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অটো টিউন : আশীর্বাদ না অভিশাপ?

আলম খান সংগীত পরিচালক

আমরা যে সিস্টেমে রেকর্ডিং করতাম সেটা হলো ‘মনো রেকর্ডিং’। এই পদ্ধতিতে একসঙ্গে সব কিছুর টেক নেওয়া হতো। কণ্ঠ ও মিউজিক একসঙ্গেই রেকর্ড হতো। অর্থাত্ প্রকৃত কণ্ঠই শ্রোতারা পেতেন। ধীরে ধীরে সবকিছু বদলাতে শুরু হলো। এলো ‘স্টেরিও রেকর্ডিং’। এতে এক ট্র্যাকে মিউজিক, অন্য ট্র্যাকে ভয়েস রেকর্ডিংয়ের সুবিধা পাওয়া গেলো। ২ ট্র্যাক থেকে ৪ ট্র্যাক, এরপর ৮ ট্র্যাক, ১৬ ট্র্যাক। এখন তো অফুরন্ত ট্র্যাকে গান রেকর্ড করা হয়। একেক ট্র্যাকে একেক যন্ত্র বাজানো যায়। কণ্ঠও রেকর্ড করা হয় আলাদা আলাদা ট্র্যাকে।

ফলে রেকর্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সুবিধাই হয়েছে। আগে একসঙ্গে সব কিছু রেকর্ড করার ফলে মিক্স, মাস্টার করতে রেকর্ডিস্টকে হিমশিম খেতে হতো। এখন ভাগে ভাগে রেকর্ডিং হওয়ায় গানটাকে ভালোভাবে ব্যালেন্স করে বাকি কাজগুলো করা যায়। স্বীকার করতেই হবে এতে গানের সাউন্ড, মিক্সিং, মাস্টারিং অনেক সমৃদ্ধ হচ্ছে।

 

কিন্তু যেটা আমি মানতে নারাজ সেটা হলো ‘অটো টিউন’। এই যন্ত্রের মাধ্যমে একটি বেসুরো গলাকেও সুরে আনা যায়। এটাকে ‘পিচ কন্ট্রোলার’ও বলে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে সুরটা যেদিকে যাচ্ছে সেদিক থেকে আরেক দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। ধরুন, একটি গান শিল্পী ফরটি পিচে গাইলেন, সেটাকে মেশিনের সাহায্যে ফরটি এইটে নিয়ে যাওয়া হলো। এভাবে সুরে নিয়ে গেলেও আসল ভয়েসের কোয়ালিটি থাকে না। এটা অবশ্য সাধারণ কানে ধরা পড়ে না, যারা গানের মানুষ তারা বুঝতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন—কমেডি গান, কৌতুক গানের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ঠিক আছে। কিন্তু সাধারণ গানের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। শিখে, সুরে, শাস্ত্রীয় মতে গান গাওয়া উচিত। মেশিনের সাহায্যে গাওয়া আমি পছন্দ করি না। নকল জিনিস আর আসল জিনিসের কিন্তু অনেক তফাত। আমি জীবনে কখনো অটো টিউন ব্যবহার করিনি। অটো টিউন আসার পর এক রেকর্ডিংয়ে শিল্পী বেসুরো গেয়েছিল। রেকর্ডিস্ট বলল, ‘মিলিয়ে দিই। ’ বললাম, ‘কোনো দরকার নেই। শিল্পীকে ডাকছি। ’ তারপর শিল্পী এসে সঠিক সুরে লাইনটি গেয়ে দেন। তবে গানের ছোটখাটো ভুল ঠিক করার জন্য যন্ত্রটির ব্যবহার অবশ্যই হতে পারে।

আমরা ট্র্যাকে রেকর্ডিং অনেক করেছি। তখনকার চেয়ে এখনকার রেকর্ডিং কোয়ালিটি অনেক ভালো। তবে সুরের ক্ষেত্রে এই প্রজন্ম পিছিয়ে আছে। এখনকার ৭০-৭৫ ভাগ সুরই নিম্নমানের। বাকি ২০-২৫ ভাগ সুর আমাদের সময়কার মতোই ভালো হয়। কখনো কখনো আমাদের সময়কেও ছাড়িয়ে যায়। অনেকে হয়তো ধরেই নেয় যে গানের সংখ্যা বেশি; তাই সুর এমন হচ্ছে। আমার মতে, সংখ্যা বেশি হওয়ায় মানও আরো ভালো করার সুযোগ আছে। শ্রম দিলে আরো ভালো কাজ করা সম্ভব। গান শোনার মাধ্যম এখন অনেক বেশি। এটা একধরনের সমস্যা। কোন চ্যানেলে কোন সুন্দর গানটা চলে গেল বোঝাই যায় না। আগে শুধু একটি মাত্র টেলিভিশন আর রেডিওতে মানুষ গান শুনত। গানগুলোও সাপোর্ট পেত, জনপ্রিয় হতো। এখন সেটা নেই। তার পরও অনেক গান জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সেগুলো নিশ্চয়ই ভালো গান। সে রকম ভালো গান আরো অনেক হওয়া উচিত।  

অটো টিউন যারা ব্যবহার করছে আমি বলব, এটা তাদের অপারগতা। না পেরে ব্যবহার করছে। যখন দেখছে জিনিসটা হচ্ছে না তখন সুবিধাটা নিচ্ছে। কেউ কেউ গান না শিখেও অটো টিউনের জোরে শিল্পী হয়ে যাচ্ছে। এটা আমি সমর্থন করি না। সত্যিকার অর্থে গান শিখে এলে অটো টিউনের দরকার পড়ে না। সংগীত সাধনায় মনোনিবেশের মাধ্যমে গানকে শক্তিশালী করা উচিত, অটো টিউন দিয়ে নয়।

 

 

অটো টিউন কী?

সহজ করে বলতে গেলে অটো টিউন হচ্ছে একটি অডিও প্রসেসর। এই প্রসেসর ব্যবহার করে গানের সুর নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ যন্ত্র আবিষ্কারের উদ্দেশ্য ছিল রেকর্ডিং করা গানের সুর একটু এদিক-ওদিক হলে ঠিক করা। শুধু তা-ই নয়, অটো টিউন ব্যবহার করে সুরকে যেমন উঁচুতে ওঠানো যায় তেমনি নিচেও নামানো যায়। এখন প্রায় সব পেশাদার সংগীত পরিচালকই যন্ত্রটি ব্যবহার করেন। যদিও এর ব্যবহার নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। অবশ্য একেকজনের কাছে এর ব্যবহার একেক রকম। কেউ বেসুরো কোনো গানকে সুরেলা করতে, কেউ বা গানকে আরো আকর্ষণীয় করতে যন্ত্রটি ব্যবহার করছেন।

 

ইতিবাচক দিক

নানা রকম নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও অনেকে অটো টিউনকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অটো টিউনার পপ মিউজিকের জগতে নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। ডাফট পাঙ্ক ও টমাস বাঙ্গালটার তাদের ‘ওয়ানস মোর টাইম’ গানটিতে অটো টিউন ব্যবহার করে প্রশ্নের সম্মুখীন হন। উত্তরে বাঙ্গালটার বলেছিলেন, ‘অনেক সংগীত পরিচালকই অটো টিউন ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মনে হচ্ছে আমরা সত্তরের দশকের ফ্রান্সে বাস করছি। সেই সময় ফ্রান্সের সংগীত পরিচালকরা সিনথেসাইজার নিষিদ্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। এখন যারা অটো টিউনের সমালোচনা করছেন তাঁরা একবারও ভাবেন না যে এটা শুধু যান্ত্রিকভাবে নয়, শৈল্পিক উপায়েও ব্যবহার করা যায়। ’

গায়ক ও র্যাপার টি-পেইন ২০০৫ সালে তাঁর ‘রাপ্পা ট্রান্ট সাঙ্গা’ অ্যালবামে কণ্ঠে ভিন্নতা আনতে অটো টিউন ব্যবহার করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বাবা বলতেন কণ্ঠ একটা বাদ্যযন্ত্রের মতো। যেটা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিপূর্ণ সংগীত তৈরি করে। একটা সময় ছিল যখন সাত মিনিটের একটা গানে পাঁচ মিনিটই বাদ্যযন্ত্র থাকত। ষাটের দশকের সেই সময়টাকে আমি অনুসরণ করার চেষ্টা করি। আমি চাই আমার কণ্ঠ একটা স্যাক্সোফোনে পরিণত হোক। ’

টি-পেইনের মতো লিল ওয়েনও অটো টিউনের ব্যাপারে একই রকম ভাবতেন এবং ব্যবহার করতেন। তিনি ‘থা কার্টার ২’ এবং ‘থা কার্টার ৩’ এই দুই অ্যালবামে অটো টিউন ব্যবহার করেন নিরীক্ষা হিসেবে। কেনি ওয়েস্ট তাঁর ‘এইট জিরো এইট অ্যান্ড হার্টব্রেক’ অ্যালবামে শৈল্পিক উপায়ে অটো টিউন ব্যবহার করেন। একে ইতিবাচকভাবে নিয়ে সমালোচকরা বলেছিলেন, মা মারা যাওয়ার পর কেনির ভেতর যে হাহাকার তৈরি হয়েছিল তারই যেন প্রকাশ এই অটো টিউনের ব্যবহার। এই অ্যালবাম সমালোচনা করতে গিয়ে রোলিং স্টোনের সংগীত সমালোচক জোডি রোজেন লিখেছিলেন, ‘টি-পেইন বিশ্বকে শিখিয়েছেন শুধু সুর আর কণ্ঠ পরিষ্কার করার জন্যই অটো টিউন ব্যবহার করা হয় না। গানে একটা ভিন্ন মাত্রা আনতেও খুব শৈল্পিক উপায়েও ব্যবহার করা যায়। ’

 

নেতিবাচক দিক

২০০৯ সালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের ৫১তম আসরে অটো টিউনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে নীল রঙের রিবন পরে মঞ্চে উঠেছিলেন ‘ডেথ ক্যাব ফর কুটি’ ব্যান্ডের সদস্যরা। এমন প্রতিবাদের ঘটনা আরো আছে। সে বছরই ‘দ্য ব্লুপ্রিন্ট ৩’ অ্যালবামে ‘ডেথ অব অটো টিউন’ শিরোনামে একটি গান করেন জে জেড। গানটি কেন লিখেছেন সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, অটো টিউনের ব্যাপারটা তাঁর কাছে প্রতারণা মনে হয়। অনেকে মনে করেন, সংগীতের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টে যাচ্ছে অটো টিউনের কারণে। সংগীত সমালোচক নেইল ম্যাকক্রোমিক ২০০৪ সালে ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ   লেখেন, ‘এই অশুভ জিনিসটা (অটো টিউন) ১৯৯০ সালের পর থেকে পপগানে অতিরিক্ত চাকচিক্য নিয়ে এসেছে। ’ ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক রিপোর্টে নাম প্রকাশ না করে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জয়ী এক রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার বলেছিলেন, ‘ব্রিটনি স্পিয়ার্স থেকে শুরু করে বলিউডের অনেক শিল্পীরই ভোকাল অটো টিউনে সেভ করা আছে আমার কাছে। ’ সেই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছিল, পপগানের অসাধারণ সুরগুলো একেবারে মলিন হয়ে যাচ্ছে অটো টিউনের কারণে।

২০১০ সালে ব্রিটিশ রিয়ালিটি শো ‘দ্য এক্স ফ্যাক্টর’-এ প্রতিযোগীদের জন্য অটো টিউনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিচারকদের একজন সাইমন কাওয়েলের তীব্র আপত্তিতে সেটি বাতিল করা হয়। একই বছর টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিকৃষ্টতম ৫০টি আবিষ্কারের তালিকায় স্থান পায় অটো টিউন।

বলা হয়, যাঁরা সঠিকভাবে গানে সুর ঢালতে পারেন না তাঁরাই যন্ত্রটি ব্যবহার করেন। যদিও স্নুপ ডগ, লিলওয়ে, ব্রিটনি স্পিয়ার্স, রিহানার মতো শিল্পীরাও এটি ব্যবহার করছেন। ট্রে পার্কার তাঁর ‘গে ফিশ’ গানটিতে অটো টিউন ব্যবহার করার পর দেখেন পুরো সুরই নষ্ট হয়ে গেছে! কিছুটা খেপে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি যদি খুব খারাপ গান করেন, তবেই যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারেন। তাহলে হয়তো গানটি কিছুটা ভালো শোনাতে পারে। যদি সঠিক সুরে গাইতে পারেন, তাহলে কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই। ’ টাইম সাংবাদিক জস টাইরাঞ্জিল তো বলেই দিয়েছেন, ‘অটো টিউন হচ্ছে মানবকণ্ঠের ফটোশপ। ’ কারো কারো মতে, এই যন্ত্র ব্যবহারে কণ্ঠকে ‘রোবটের মতো’ লাগে।

 

[সূত্র : উইকিপিডিয়া]

 


মন্তব্য