kalerkantho

26th march banner

অনুদান নাকি সম্প্রদান

ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ দিতে ১৯৭৬ সালে চালু হয় সরকারি অনুদান প্রথা। ৪০ বছরে এ পর্যন্ত ১০৬টি ছবিকে অনুদান দেয় সরকার। এর মধ্যে ৩৫টি ছবি এখনো আলোর মুখই দেখেনি। কিছু ছবি আদৌ মুক্তি পাবে কি না সন্দেহ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন রূপক জামান

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অনুদান নাকি সম্প্রদান

নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ

অনুদান পাওয়া ছবি ও যত ঘটনা

১৯৭৬-৭৭ অর্থবছর

আড়াই লাখ টাকা করে পায় চারটি ছবি। অনুদান নিয়ে ছবি জমা না দেওয়ার রেওয়াজটা শুরু হয় তখনই। মসিহ্উদ্দিন শাকের-শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে, বাদল রহমানের শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ মুক্তি পায় ১৯৮০ সালে। কবির আনোয়ারের ‘তোলপাড়’ মুক্তি পায় অনুদান পাওয়ার এক দশক পর, ১৯৮৮ সালে। বেবী ইসলামের ‘মেহেরজান’ আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

 

১৯৭৭-১৯৮১ অর্থবছর

অনুদান দেওয়া হয়নি।

 

১৯৮১-৮২ অর্থবছর

চারটি ছবি অনুদান পায়—‘কলমিলতা’র জন্য শহিদুল হক খান পান পাঁচ লাখ,  ‘মোহনা’র জন্য আলমগীর কবির দুই লাখ, ‘বাঁধনহারা’র জন্য হাবিবুর রহমান খান ও ‘সোয়ামী’র জন্য নুরুল আলম পান আড়াই লাখ টাকা করে। চারটি ছবিই যথাসময়ে মুক্তি পায়।

 

১৯৮২-৮৩ অর্থবছর

পাঁচটি ছবি অনুদান পায় এক লাখ টাকা করে—‘দহন’, ‘ডাক দিয়ে যাই’, ‘ফুলমতি’, ‘পেনশন’ ও ‘উদয় তারা’। তিনটিই আলোর মুখ দেখেনি। পরিচালক ইসমাইল মোহাম্মদের মৃত্যুর পর ‘ডাক দিয়ে যাই’ ও মাসুদ করিমের মৃত্যুর পর ‘ফুলমতি’ বন্ধ হয়ে যায়। নায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জল ‘উদয় তারা’র জন্য এক লাখ টাকা অনুদান পেলেও ছবি জমা দেননি, টাকাও ফেরত দেননি। রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘পেনশন’ মুক্তির পর ১৯৮৪ সালে ছবিটিকে নিষিদ্ধ করে সরকার। শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’ মুক্তি পায় ১৯৮৫ সালে।

 

১৯৮৩-৮৪ অর্থবছর

অনুদান দেওয়া হয়নি।

 

১৯৮৪-৮৫ অর্থবছর

শমশের আহমেদ ‘অচেনা বন্দর’-এর জন্য এক লাখ টাকা অনুদান পান। এই টাকায় ছবি নির্মাণ সম্ভব নয়, তাই নির্মাণ না করে অনুদান ফেরত দেন।

 

১৯৮৫-৮৬ থেকে ৯২-৯৩ অর্থবছর

টানা সাত বছর অনুদান প্রদান বন্ধ ছিল।

 

১৯৯৩-৯৪ অর্থবছর

তিনটি ছবিকে অনুদান দেওয়া হয় দেড় লাখ টাকা করে—হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমনি’, শেখ নিয়ামত আলীর ‘অন্য জীবন’ ও ববিতার ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’। যথাক্রমে ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে ছবিগুলো মুক্তি পায় এবং প্রশংসিত হয়।

 

১৯৯৪-৯৫ অর্থবছর

চারটি ছবিকে ১১ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। মোরশেদুল ইসলামের ‘দীপু নাম্বার টু’ মুক্তি পায় ১৯৯৬ সালে, চাষী নজরুল ইসলামের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। মোস্তাফিজুর রহমান ‘পথ বেঁধে দিল’র জন্য পাওয়া ১১ লাখ টাকা ফেরত দেন। ইসমাইল হোসেন ‘চোখের মণি’ নির্মাণ করেননি, টাকাও গ্রহণ করেননি।

 

১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর

তিনটি ছবি ১১ লাখ করে অনুদান পায়। খান আতাউর রহমান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে [১৯৯৭] ‘এখনো অনেক রাত’ মুক্তি দিলেও মনিরুজ্জামান মনিরের ‘পদ্মা আমার জীবন’ মুক্তি পায় ১৩ বছর পর, ২০০৮ সালে। শাহজাহান চৌধুরীর ‘উত্তরের খেপ’ মুক্তি পায় পাঁচ বছর পর, ২০০০ সালে।

 

১৯৯৬-৯৭ অর্থবছর

তিনটি ছবি অনুদান পায় ১৫ লাখ টাকা করে—‘জননী’, ‘সনাতন গল্প’ ও ‘নিষিদ্ধ লোবান’। ‘জননী’র জন্য জাঁ নেসার ওসমান অর্থ গ্রহণ করেননি, ছবিও হয়নি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ ‘নিষিদ্ধ লোবান’-এর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা গ্রহণ করেননি। ‘সনাতন গল্প’র জন্য মাসুম আজিজকে প্রথম কিস্তি বাবদ পৌনে চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। তবু চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেননি। মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি ছবি নির্মাণ করার আগ্রহ প্রকাশ করে সহযোগিতা কামনা করেন। দ্বিতীয় কিস্তিতে তাঁকে সাড়ে চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২২ জুনের মধ্যে ছবি মুক্তির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। বিশ বছরেও তিনি ছবিটি নির্মাণ করতে পারেননি।

 

১৯৯৭-৯৮ থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর

আবারও তিন বছর অনুদান বন্ধ।

 

২০০০-০১ অর্থবছর

দুটি ছবিকে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়—সাইদুল আনাম টুটুলের ‘আধিয়ার’ ও রেজানুর রহমানের ‘তাহাদের কথা’। ২০০৩ সালে মুক্তি পায় ‘আধিয়ার’। ‘তাহাদের কথা’র জন্য প্রথম কিস্তি বাবদ তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা পান রেজানুর রহমান। ছবি নির্মাণ না করায় ১৪ বছর পর ২০১৫ সালের নভেম্বরে চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত দেন।

 

২০০১-০২ অর্থবছর

অনুদান প্রদান করা হয়নি।

 

২০০২-০৩ অর্থবছর

দুটি ছবি সাড়ে ১৪ লাখ টাকা করে অনুদান পায়। কোহিনূর আখতার সুচন্দার ‘হাজার বছর ধরে’ মুক্তি পায় ২০০৫ সালে, শিবলী সাদিকের ‘বিদেশিনী’ মুক্তি পায় ২০০৬ সালে।

 

২০০৩-০৪ অর্থবছর

দুটি ছবি সাড়ে ১৪ লাখ টাকা করে অনুদান পায়—গাজী জাহাঙ্গীরের ‘জীবন সীমান্তে’ ও নূর-উল-আলমের ‘পরম প্রিয়’। যথাক্রমে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে মুক্তি পায় ছবি দুটি।

 

২০০৪-০৫ অর্থবছর

দুটি ছবি ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান পায়—কাজী মোরশেদের ‘ঘানি’ ও হাফিজ উদ্দিনের ‘হাজী শরীয়তউল্লাহ’। দুটিই ২০০৬ সালে মুক্তি পায়।

 

২০০৫-০৬, ২০০৬-০৭ অর্থবছর

অনুদান প্রদান করা হয়নি।

 

২০০৭-০৮ অর্থবছর

অনুদানের অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হয়। তিনটি ছবি অনুদান পায় ১৬ লাখ টাকা করে। তানভীর মোকাম্মেলের ‘রাবেয়া’ ও আবু সাইয়ীদের ‘রূপান্তর’ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই মুক্তি পায়। এনামুল করিম নির্ঝরের ‘নমুনা’ আটকে দেয় সেন্সর বোর্ড। পরিচালকের বক্তব্য, ‘সেন্সর বোর্ড আমাকে যেসব দৃশ্য বাদ দিতে বলেছে, অনুদান কমিটিই সেসব দৃশ্যের অনুমোদন দিয়েছিল। এসব বাদ দিলে ছবির গল্প আর থাকে না। ’

 

২০০৮-০৯ অর্থবছর

তিনটি ছবি অনুদান পায়। মোরশেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ [২০১১] ও শাহজাহান চৌধুরীর ‘আত্মদান’ [২০১২] মুক্তি পেয়েছে। টাকা পেয়েও ‘স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের কাল’-এর নির্মাণ শেষ করতে পারেননি জুনায়েদ আহমেদ হালিম। অর্থ আদায়ের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়।

 

২০০৯-১০ অর্থবছর

আবারও অনুদানের অর্থ ও ছবির সংখ্যা বাড়ানো হয়। ১৯ লাখ ২০ হাজার টাকা করে অনুদান পায় ছয়টি ছবি—বেলাল আহমেদের ‘অনিশ্চিত যাত্রা’, কাজী মোর্শেদের ‘একই বৃত্তে’, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’, সামিয়া জামানের ‘ছেলেটি’ [পরে নাম রাখা হয় ‘আকাশ কত দূরে’], আখতারুজ্জামানের ‘সূচনারেখার দিকে’ ও সজল খালেদের ‘কাজলের দিনরাত্রি’। ‘সূচনা রেখার দিকে’ ছাড়া বাকি ছবিগুলো মুক্তি পেয়েছে।

 

২০১০-১১ অর্থবছর

এবারও বাড়ানো হয় অনুদানের অর্থ। ২৪ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয় ছয়টি ছবিকে। মুক্তি পেয়েছে চারটি—মুরাদ পারভেজের ‘বৃহন্নলা’, মাসুদ পথিকের ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’, মিঠুন চক্রবর্তীর ‘মুক্তি’ ও মানিক মানবিকের ‘শোভনের স্বাধীনতা’ [শিশুতোষ]। মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেনের ‘ধোকা’, ফারুক হোসেনের ‘কাকতাড়ুয়া’ মুক্তি পায়নি।

 

২০১১-১২ অর্থবছর

আরেক দফা বাড়ানো হয় অনুদানের অর্থ। ছয়টি ছবিকে ৩৫ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। তানভীর মোকাম্মেলের ‘জীবন ঢুলী’, গাজী রাকায়েতের ‘মৃত্তিকা মায়া’ ও দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘হেড মাস্টার’ মুক্তি পেয়েছে। ‘নেকড়ে অরণ্য’র জন্য প্রথম কিস্তির টাকা গ্রহণ করার পরও ছবির কাজ শুরু করতে না পারায় মারুফ হাসান আরমানের বিরুদ্ধে মামলা করে তথ্য মন্ত্রণালয়। তাঁকে ফোনেও পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, অনুদানের টাকা দিয়ে তিনি জমি কিনেছেন। শিশুতোষ ছবি ‘একা একা’র জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছিলেন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। ছবি নির্মাণ না করায় গুণী এই নির্মাতার বিরুদ্ধেও অর্থ আদায়ের জন্য মামলা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। পাঁচ বছর পর সবে শুটিং শেষ করেছেন ‘হাডসনের বন্ধুক’-এর পরিচালক প্রশান্ত অধিকারী।  

 

২০১২-১৩ অর্থবছর

সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিকে ৩৫ লাখ ও পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিকে ১০ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। নির্মাতা তারেক মাসুদ ‘কাগজের ফুল’-এর জন্য অনুদান পান। প্রথম কিস্তির অর্থ পাওয়ার পরপরই সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরে প্রযোজক ক্যাথরিন মাসুদ অর্থ ফেরত দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় ছবিটি নির্মাণের অনুরোধ করে ক্যাথরিনকে। তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এই ছবির কাজে দেশের বাইরে রয়েছেন ক্যাথরিন মাসুদ। সেখান থেকেই আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। আশা করছি সামনের বছর শুটিংয়ে যেতে পারব। ’

আকরাম খানের ‘খাঁচা’র শুটিং সম্প্রতি শেষ হয়েছে। ‘কাঁটা’ নির্মাণ না করায় টোকন ঠাকুরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। তবে পরিচালক জানালেন, এ মাসেই ছবির শুটিং শেষ হবে। ‘যৈবতী কন্যার মন’-এর জন্য নারগিস আক্তারের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ‘রেইনকোট’ [নাম বদলে ‘মেঘমল্লার’], শাহ আলম কিরণের ‘একাত্তরের মা জননী’ ও মান্নান হীরার ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ মুক্তি পায় ২০১৪ সালে।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সবকটিই যথাসময়ে নির্মিত হয়—‘আজও চিঠি আসে’, ‘ফ্ল্যাশ ব্যাক একাত্তর’, ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’, ‘অপেক্ষা’ ও ‘গাড়িওয়ালা’।

 

২০১৩-১৪ অর্থবছর

সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি অনুদান পায়। নাদের চৌধুরীর ‘নদী উপাখ্যান’ [নাম বদলে ‘লালচর’], প্রসূন রহমানের ‘সুতপার ঠিকানা’, সাজেদুল আউয়ালের ‘ছিটকিনি’, রওশন আরা নীপার ‘মহুয়া মঙ্গল’ [নাম বদলে ‘মহুয়া সুন্দরী’] ও মুশফিকুর রহমান গুলজারের ‘লাল সবুজের সুর [শিশুতোষ]’ ছবিগুলো যথাসময়ে মুক্তি পেয়েছে। জাঁ নেসার ওসমানের ‘পঞ্চসঙ্গী’র [শিশুতোষ] মুক্তির জন্য প্রস্তুত। মুক্তি পায়নি ড্যানি সিডাকের ‘কাসার থালায় রূপালি চাঁদ’। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘কালো মেঘের ভেলা’, ‘কমলাপুরাণ’, ‘পুনরাবর্তন’ [নাম বদলে ‘ঘ্রাণ’], ‘বিবেক’ ও ‘সাদা গোলাপ’ মুক্তি পেয়েছে।

 

২০১৪-১৫ অর্থবছর

ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান পায়। শামীম আখতারের ‘রীনা ব্রাউন’ জানুয়ারিতে মুক্তি পেয়েছে। ফাখরুল আরেফীনের ‘ভুবন মাঝি’ মুক্তির মিছিলে রয়েছে। তবে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দিয়েও শুটিং শুরু করতে পারছেন না ‘বিউটি সার্কাস’-এর মাহমুদ দিদার। প্রথম কিস্তি বাবদ ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। অগ্রগতি জানানোর জন্য তাঁকে চিঠি দেওয়া হয়। জবাব দেননি বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। ‘চন্দ্রাবতীর কথা’র পরিচালক এন রাশেদ চৌধুরী জানালেন তাঁর ছবির শুটিং শেষ, এডিটিং চলছে। নুরুল আলম আতিকও ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’র শুটিং প্রায় শেষ করেছেন। শুটিং শেষ মাসুদ পথিকের ‘মায়া’রও। তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী প্রথম কিস্তির টাকা প্রদানের পর কাজের অগ্রগতি জানতে চেয়ে মাসুদকে চিঠি দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি।

অনুদান পাওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের একটিও শেষ হয়নি। মোহাম্মদ ফরহাদ ‘ড্রেসিংটেবিল’-এর জন্য প্রথম কিস্তি বাবদ তিন লাখ টাকা পেয়েছেন। কাজের অগ্রগতি জানতে চেয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে চিঠি দিলেও উত্তর দেননি। ‘সবুজ ঘুড়ি’ দুই কিস্তিতে সাত লাখ টাকা পেলেও কাজ শেষ হয়নি। প্রামাণ্যচিত্র ‘আমার সোনার বাংলা’র জন্য আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম কিস্তিতে তিন লাখ টাকা পেয়েছেন। কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় ৩১ মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হলেও ছবি জমা দিতে পারেননি। ‘নেপেন দারোগার দায়ভার’-এর জন্য আবু সাঈদ মো. মেহেদী হাসান প্রথম কিস্তিতে তিন লাখ টাকা পান। অগ্রগতি জানতে চেয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাব দেননি তিনিও। তবে শুটিং শেষ শারমিন সুলতানা শর্মীর ‘বিজয়িনী’র।

 

২০১৫-১৬ অর্থবছর

সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিকে অনুদান দেওয়া হয়। অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হয় এ বছরও। তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিকে দেওয়া হয়েছে ৫০ লাখ টাকা করে—মোরশেদুল ইসলামের ‘আঁখি ও তাঁর বন্ধুরা’, সারা আফরীনের ‘শঙ্খধ্বনি’ ও জয়া আহসানের ‘দেবী’। বদরুল আনাম সৌদের ‘গহীন বালুচর’, লোরা তালুকদারের ‘বৃদ্ধাশ্রম’ ও পান্থ প্রসাদের ‘সাবিত্রী’ পেয়েছে ৪০ লাখ টাকা করে। কাওসার চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘বধ্যভূমিতে একদিন’ পেয়েছে ২০ লাখ টাকা। কোনো ছবিরই শুটিং শেষ হয়নি। ‘গহীন বালুচর’ ও ‘বৃদ্ধাশ্রম’-এর শুটিং প্রায় শেষের দিকে। অনেক চলচ্চিত্র এখনো কাজ শুরুই করতে পারেনি। স্বল্পদৈর্ঘ্য ক্যাটাগরিতে ১০ লাখ টাকা পেয়েছে ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘ব্রাত্যজন’, ‘সাইকেল বালক’, ‘জলকন্যা’ ও ‘বক্তাবলীর কান্না’। অগ্রগতি জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে সবাইকে।

 

প্রশংসিত ও পুরস্কৃত যত ছবি

এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী : বাদল রহমানের এই ছবি স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম শিশুতোষ ছবি। ১৯৮০ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে পাঁচ বিভাগে পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পার্শ্ব চরিত্র, সম্পাদনা, শিশুশিল্পী ও চিত্রগ্রহণ।

সূর্য দীঘল বাড়ি : শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহ্উদ্দিন শাকেরের ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৯ সালে। সেবার সাত বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ছবিটি—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, অভিনেত্রী, সম্পাদনা, শিশুশিল্পী, শিশুশিল্পী [বিশেষ শাখা] ও চিত্রনাট্য। জার্মানির  ম্যানহেইম উৎসবে তিনটি পুরস্কার জিতেছে ছবিটি। পর্তুগালেও পুরস্কৃত হয়।

দহন : শেখ নিয়ামত আলীর এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৮৫ সালে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিন বিভাগে পুরস্কার পায়—পরিচালনা, পার্শ্ব চরিত্র, কাহিনি।

পোকামাকড়ের ঘরবসতি : মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৯৬ সালে। চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, কাহিনি, পরিচালনা ও চিত্রগ্রহণ।

আগুনের পরশমনি : হুমায়ূন আহমেদের এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ছবিটি—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, অভিনেত্রী, সংগীত পরিচালনা, শিশুশিল্পী, শিশুশিল্পী (বিশেষ শাখা), কাহিনি, সংলাপ ও শব্দগ্রহণ।

অন্য জীবন : শেখ নিয়ামত আলীর এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ১১টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পার্শ্ব চরিত্র [পুরুষ], পার্শ্ব চরিত্র [নারী], শিশুশিল্পী, চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা ও শিল্প নির্দেশনা।

হাঙর নদী গ্রেনেড : চাষী নজরুল ইসলামের এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। তিনটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—পরিচালনা, অভিনেত্রী, পার্শ্ব চরিত্র [নারী] ও কাহিনি।

দীপু নাম্বার টু : মোরশেদুল ইসলামের ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৬ সালে। দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—পার্শ্ব চরিত্র [পুরুষ] ও শিশুশিল্পী।

এখনো অনেক রাত : খান আতাউর রহমানের এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—সংগীত পরিচালনা ও সুর।

উত্তরের খেপ : শাহজাহান চৌধুরীর এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০০ সালে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী’র পুরস্কার পায়।

আধিয়ার : সাইদুল আলম টুটুলের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৩ সালে। দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—কাহিনি ও চিত্রগ্রহণে।

হাজার বছর ধরে : কোহিনূর আক্তার সুচন্দার এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। ছয়টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় এটি—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, সংগীত পরিচালনা, কাহিনি, চিত্রগ্রহণ ও শিল্প নির্দেশনা।

ঘানি : কাজী মোরশেদের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৬ সালে। ১২টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পার্শ্ব চরিত্র [পুরুষ], পার্শ্ব চরিত্র [নারী], সংগীত পরিচালনা, কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনা।

রাবেয়া : তানভীর মোকাম্মেলের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০১০ সালে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পেলেও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত ও পুরস্কার পায়।

রূপান্তর : আবু সাইয়ীদের এই ছবিটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়নি, কিন্তু প্রশংসিত হয়। আন্তর্জাতিক উৎসবেও পুরস্কৃত হয়। মুক্তি পায় ২০১০ সালে।

আমার বন্ধু রাশেদ : মোরশেদুল ইসলামের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০১০ সালে। দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—কাহিনি ও চিত্রগ্রহণে।

গেরিলা : নাসির উদ্দীন ইউসুফের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০১১ সালে। ১০টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, অভিনেত্রী, খল অভিনেতা, চিত্রনাট্য, সংলাপ, শব্দগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, রূপসজ্জা ও পোশাক। কলকাতা উৎসবেও সেরা ছবির পুরস্কার ‘নেটপ্যাক’ জিতেছে।

নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ : মাসুদ পথিকের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০১৪ সালে। পাঁচটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, সংগীত পরিচালনা, সুর, গীতি, কণ্ঠশিল্পী [নারী]।  

মৃত্তিকা মায়া : গাজী রাকায়েতের এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০১৩ সালে। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে রেকর্ড সংখ্যক ১৭টি শাখায় পুরস্কার পায়—শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, কাহিনি, চিত্রনাট্য, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পার্শ্ব চরিত্র [পুরুষ], পার্শ্ব চরিত্র [নারী], খল অভিনেতা, চিত্রগ্রহণ, সংগীত পরিচালনা, রূপসজ্জা, অঙ্গসজ্জা ও পোশাক পরিচ্ছদ, সম্পাদনা, সংলাপ, শব্দগ্রহণ ও শিল্প নির্দেশনা।

 

অনুদানের ছবি নির্মাণে দেরি হয় কেন?

অনুদানের অর্থপ্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে ছবির কাজ শেষ করে জমা দেওয়ার নিয়ম। প্রয়োজনে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সময় বাড়ানো যায়। বারবার সময় বাড়িয়ে নিয়েও ছবি শেষ করতে পারেন না অনেক পরিচালক। এমন পরিচালকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। মামলার বর্তমান অবস্থা জানতে চাওয়া হয় অতিরিক্ত সচিব মানজুরুর রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রের দায়িত্বে এসেছি অল্প কয়েক দিন হলো। এ মুহূর্তে সঠিক অবস্থা জানাতে পারছি না। যতটুকু জানি, অনেকেই ছবির কাজ শেষ করে আনছেন। আর যাঁরা পারবেন না তাঁদের বিরুদ্ধে তো মামলা চলবেই। ’

কিন্তু কেন এমন দেরি হয়? ২০১১-১২ অর্থ ছরে ‘হাডসনের বন্দুক’-এর জন্য অনুদান পেয়েছিলেন প্রশান্ত অধিকারী। তিনি বলেন, ‘সবাই যে ইচ্ছাকৃত দেরি করে তা নয়। প্রথম কিস্তিতে ১০ লাখের মতো টাকা দেওয়া হয়, প্রি-প্রডাকশনের সময়েই সাত-আট লাখ খরচ হয়ে যায়। বাকি টাকা দিয়ে ৩০ শতাংশ শুটিং শেষ করে জমা দিলে পরের কিস্তির টাকা দেওয়া হয়। এ কারণে আমাদের আলাদা প্রযোজক খুঁজতে হয়। পুরোটা একসঙ্গে পেলে মনে হয় না দেরি হতো। ’ ‘বিউটি সার্কাস’-এর জন্য অনুদান পাওয়া মাহমুদ দিদার বলেন, ‘আমার ছবিতে লাগবে এক কোটি টাকারও বেশি। অনুদান পাব ৩৫ লাখ। আরেকজন প্রযোজক খুঁজে পাচ্ছি না, তাই শুটিং শুরু করতে পারছি না। ’ ২০১২-১৩ অর্থবছরে অনুদান পাওয়ার পর ‘খাচা’র শুটিং মাত্রই শেষ করেছেন আকরাম খান। সময়মতো ছবি জমা দিতে না পারার কারণ হিসেবে বলেন, ‘সব ছবিই ৯ মাসের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয় না। আমার ছবি ১৯৪৭-৬৪ সালের প্রেক্ষাপটের। এতগুলো স্থান, সময় একটা ছবিতে আনার মতো লোকেশন, পোশাক জোগাড় করা বেশ সময়ের ব্যাপার। দেরিটা সে কারণেই। ’

অনুদান প্রদানের শুরু থেকেই কি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হতো? অনুদান কমিটির সাবেক সদস্য ও বিটিভির বর্তমান মহাপরিচালক হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘সময়সীমার ব্যাপারটা শুরু থেকেই ছিল। একটা ছবির গল্পে হয়তো শীতকাল বা বর্ষাকাল ধরতে হবে, সে ক্ষেত্রে দেরি হয়। গল্প বা যৌক্তিক কারণে দেরি হলে সেটা সব সময়ই নমনীয় চোখে দেখেছে কমিটি। তার মানে এই নয়, কেউ বছরের পর বছর পার করে দেবেন!’


মন্তব্য