kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চ্যান-উকের দুনিয়া

প্রতিশোধস্পৃহা তাঁর ছবির মূল প্রবণতা। কারণ তাঁর মতে একেবারেই কাউকে ঘৃণা না করে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব। আগামীকাল মুক্তি পাচ্ছে প্রভাবশালী কোরিয়ান পরিচালক পার্ক চ্যান-উকের নতুন ছবি ‘দ্য হ্যান্ডমেইডেন’। পরিচালককে নিয়ে লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চ্যান-উকের দুনিয়া

প্রথম জীবনে পার্ক চ্যান-উক ছিলেন চলচ্চিত্র সমালোচক। সে সময় কোরিয়ার প্রথম সারির চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবেই উচ্চারিত হতো তাঁর নাম।

পরে আসেন পরিচালনায়। দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্রশিল্পে যে পালাবদলের শুরু, কোরিয়ার বিগ বাজেট সিনেমা দেশীয় বাজারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারিয়ে দিতে শুরু করে হলিউড ব্লকবাস্টারকে, তার অনেকখানি কৃতিত্ব দেওয়া হয় দুটো চলচ্চিত্রকে—শিরি (১৯৯৯) এবং জেএসএ: জয়েন্ট সিকিউরিটি এরিয়া (২০০০)। এই ‘জেএসএ’ পার্ক চ্যান-উকের পঞ্চম সিনেমা। এরপর প্রতিশোধ ত্রয়ী—‘সিমপ্যাথি ফর মিস্টার ভেনজেন্স’ (২০০২), ‘ওল্ডবয়’ (২০০৩) এবং ‘সিমপ্যাথি ফর লেডি ভেনজেন্স’ (২০০৫) তাঁকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা দেয়। পরে ‘আ’ম এ সাইবর্গ, বাট দ্যাট’স ওকে’ (২০০৬), ‘থার্স্ট’ (২০০৯) প্রভৃতি সিনেমা সে প্রতিষ্ঠাকে আরো পোক্ত করে। আর এই সিনেমাগুলোই পরিচালক পার্ক চ্যান-উকের প্রবণতাগুলোও চিহ্নিত করে দেয়। এখন তাঁর সিনেমা দেখতে গেলে দর্শকরা সেসবের জন্য প্রস্তুত হয়েই থাকে। তারা জানে, পার্ক চ্যান-উকের সিনেমা মানেই ব্ল্যাক কমেডির উপাদানে ভরপুর টান টান উত্তেজনার কোনো থ্রিলার।

চ্যান-উকের সিনেমার মূল প্রবণতা বলা যেতে পারে প্রতিশোধস্পৃহা। তাঁর অনেক সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রই হন্যে হয়ে প্রতিশোধ নিতে চায়। তো প্রতিশোধ গ্রহণেরই তিনটি গল্প। এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্যও একদম চাঁছাছোলা, ‘একেবারেই কাউকে ঘৃণা না করে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব। (তাদের ওপর) প্রতিশোধ গ্রহণের কল্পনা করাটাও অস্বাভাবিক কিছু না। আপনার ভেতর সে অনুভূতিটা থাকতেই পারে। শুধু সে কল্পনাটাকে বাস্তবায়িত না করলেই হলো। ’ আর এই প্রতিশোধপ্রবণতার অপরিহার্য অংশ হিসেবেই আসে তাঁর আরেকটা ঝোঁক— নৃশংসতার কাব্যিক উপস্থাপন। তাঁর সব সিনেমায় হয়তো প্রতিশোধ নেই কিন্তু নৃশংসতা থাকে প্রায়ই। এবং সে নৃশংস দৃশ্যগুলো তিনি এমন কুশলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন, সেগুলো হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন, আকর্ষণীয়। এই নৃশংসতার প্রশ্নে তাঁর ব্যাখ্যা, ‘আমি আসলে দর্শকদের একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চাই— কখন আসলে মানুষ এমন নৃশংস হয়ে ওঠে। আর সেই প্রশ্নটা কেবল ছুড়ে দিলেই আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না। আমি চাই, দর্শকরা যেন প্রশ্নটা সরাসরি শারীরিকভাবেও উপলব্ধি করতে পারে। ’

প্রতিশোধস্পৃহা আর নৃশংসতার বাইরে পার্ক চ্যান-উকের সিনেমার আরো একটি প্রবণতা—অস্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক। ‘সিমপ্যাথি ফর মিস্টার ভেনজেন্স’-এ সে সম্পর্ক দেখা যায় এক সন্ত্রাসীর সঙ্গে এক প্রতিবন্ধী মেয়ের মধ্যে। ‘ওল্ডবয়’-এ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর নায়ক জানতে পারে, সম্পর্কে সে আসলে নায়িকার বাবা। ‘থার্স্ট’-এ ভ্যাম্পায়ার-প্রিস্ট নায়ক যৌন সম্পর্কে জড়ায় তার এক বাল্যবন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে। আর তার প্রথম হলিউডি মুভি ‘স্টকার’-এ নায়ক যৌন সম্পর্কে জড়ায় তার শ্যালিকা ও বোনের মেয়ের সঙ্গে। পার্ক চ্যান-উক তাঁর সিনেমায় এ দৃশ্যগুলো উপস্থাপনও করেন অসাধারণ কাব্যিকতার সঙ্গে। আর সে কারণেই তাঁর রোমান্টিক সিনেমা দেখার প্রত্যাশা ছিল অনেকেরই।

তিনি যে একেবারেই রোমান্টিক সিনেমা বানাননি, তা নয়। তাঁর ‘আ’ম এ সাইবর্গ, বাট দ্যাট’স ওকে’কে রোমান্টিক ঘরানার সিনেমাই বলতে হয়। আসলে তাঁর প্রায় সব সিনেমায়ই প্রেমের অনুষঙ্গ থাকেই। সে প্রেমও মেলোড্রামাটিক। তবে কোরিয়ার চলচ্চিত্রের প্রথাগত মেলোড্রামা আর পার্ক চ্যান-উকের মেলোড্রামা একেবারেই ভিন্ন। তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য হ্যান্ডমেইডেন’ও সে রকমেরই এক প্রেমের সিনেমা। কাহিনী নেওয়া হয়েছে ওয়েলসের লেখিকা সারাহ ওয়াটার্সের ‘ফিঙ্গারস্মিথ’ উপন্যাস থেকে। প্রযোজক সিড লিম তাঁকে প্রথম উপন্যাসটি পড়তে দেন। চ্যান-উকের পছন্দও হয়। কিন্তু এর আগেই উপন্যাসটি থেকে বিবিসি একটা মিনি সিরিজ বানিয়ে বসে আছে। তাই চ্যান-উক কাহিনীটি নিলেও সেটাকে নিয়ে আসেন কোরিয়ার প্রেক্ষাপটে। ব্রিটেনের ভিক্টোরিয়ান যুগের কাহিনী হয়ে যায় জাপান-অধিকৃত কোরিয়ার গল্প। সময়কাল হয়ে যায় গত শতকের ত্রিশের দশক। চরিত্রগুলোও বদলে যায়, তবে তাদের কাঠামো ঠিকই থাকে। মূল চরিত্র সু ট্রিন্ডার হয়ে যায় সুক-হি। ছবিটি মূলত দুই নারীরে প্রেমের গল্প। কিন্তু দুই নারীর প্রেমের গল্প কি পুরুষ  চ্যান-উকের পক্ষে নিরপেক্ষ থেকে বলা সম্ভব? সে প্রশ্নেই তিনি চিত্রনাট্য রচনায় তাঁর সঙ্গে নেন সিও-কিয়ুং চং-কে। প্রতিটি লাইনে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন কিয়ুং চং। চলচ্চিত্রটির কাজ শেষ করার পর সিনেমাটি বেশ কয়েকজন নারীবাদী কর্মীকেও দেখান। তাদের সবার ছাড়পত্র নিয়েই চলচ্চিত্রটি দর্শকদের সামনে নিয়ে এসেছেন পার্ক চ্যান-উক। সমকামিতার বিষয়ে এখনো সম্পূর্ণ প্রগতিশীল নয় কোরিয়ার সমাজ। বিশেষত কোরিয়ার প্রবীণদের মধ্যে ব্যাপারটা এখনো নিন্দনীয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশটির দর্শকরা সিনেমাটিকে বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে।

আগামীকাল যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেলেও ছবিটি কোরিয়ায় মুক্তি পেয়েছে জুনেই। কান চলচ্চিত্র উৎসবে লড়েছে স্বর্ণ পামের জন্য। সেটা না জিতলেও সেখানে এলজিবিটি সিনেমার জন্য বিশেষ পুরস্কার ‘কুইর পাম’ জিতেছে ঠিকই।


মন্তব্য