kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খেলা নিয়ে আরো দুই

দুনিয়া জুড়েই খেলোয়াড়দের বায়োপিক জনপ্রিয় হচ্ছে। এ সপ্তাহে হলিউড ও বলিউডে মুক্তি পাচ্ছে দাবা ও ক্রিকেট খেলোয়াড়দের নিয়ে দুটি সিনেমা। মীরা নায়ারের ‘কুইন অব কাতওয়ে’ ও নীরজ পাণ্ডের ‘এম এস ধোনি : দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ নিয়ে লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



খেলা নিয়ে আরো দুই

দাবায় বাজিমাত

সিনেমাটির পরিচালক এক ভারতীয় নারী। কাহিনীও আবর্তিত হয়েছে দুই নারীকে কেন্দ্র করেই।

তবে তাঁরা আফ্রিকান। শুধু কেন্দ্রীয় দুই চরিত্রই নয়, পুরো সিনেমার সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই কৃষ্ণাঙ্গ। হলিউডের ইতিহাসে এমন চরিত্রায়ণ আর কোনো সিনেমায় করা হয়েছে কি না সন্দেহ। ‘কুইন অব কাতওয়ে’ মূলত উগান্ডার এক তরুণ দাবাড়ুর বায়োপিক। নাম ফিওনা মুতেসি। জন্ম উগান্ডার কাতওয়ে নামের এক দরিদ্র অঞ্চলে। এইডসে ভুগে বাবা মারা গেছেন অল্প বয়সেই। এর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বড় বোনও মারা যান। সে ধাক্কায় কিছুদিনের জন্য তাঁর স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মা বেপরোয়া সংগ্রাম করে মেয়েকে আবার স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। আর মেয়েও প্রতিদান দিতে ভুল করেননি। হতদরিদ্র অঞ্চল থেকে উঠে এসে তিনি এখন দেশের সেরা দাবাড়ু। ২০১২ সালে উগান্ডার প্রথম মহিলা দাবাড়ু হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হন দেশটির জাতীয় জুনিয়র দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ। ৪০তম দাবা অলিম্পিয়াডেও দেশের প্রতিনিধিত্বও করেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতাতেই অর্জন করে নেন ওম্যান ক্যান্ডিডেট মাস্টার নর্ম।

ফিওনা মুতেসির উঠে আসার এই গল্প নিয়ে বই লেখা হয় সে বছরই। লেখেন মার্কিন ক্রীড়ালেখক টিম ক্রথার্স। বইটা চলে আসে উগান্ডার টেন্ডো নাগেন্ডার হাতে। তিনি কাজ করেন ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওজ-এ, সিনিয়র ক্রিয়েটিভ এক্সিকিউটিভ হিসেবে। বইটা পড়ার পর থেকেই তার মাথায় এই কাহিনী নিয়ে সিনেমা বানানোর চিন্তা ঘুরতে থাকে। অন্যদিকে মীরা নায়ার ‘মিসিসিপি মাসালা’ বানানোর জন্য অনেক দিন কাটিয়েছেন উগান্ডায়। রীতিমতো ‘গবেষণা’ করে তবেই সিনেমাটা বানান তিনি। সে সময়ই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর বর্তমান স্বামী মাহমুদ মামদানির। মীরা নায়ারকে দিয়েই সিনেমাটি বানানোর চিন্তা করলেন টেন্ডো।

সে সময় মীরা নায়ার তাঁর উগান্ডার বাসায়ই ছিলেন। সেখানেই হাজির হলেন টেন্ডো। মীরা নায়ারও এককথায় রাজি হয়ে গেলেন, ‘আমি উগান্ডায় এত দিন ধরে এমন হাজারো কাহিনীর মধ্যেই বসবাস করছি। কিন্তু সেই ১৯৯১ সালের পর এখানকার কাহিনী নিয়ে আর কোনো কাজই করিনি। ’ এরপর দেশটির রাজধানী কাম্পালাতে উড়িয়ে আনা হলো চিত্রনাট্যকার উইলিয়াম হুইলারকে। ক্রথার্সের বই থেকে তিনি চিত্রনাট্য দাঁড় করালেন। সব শুনে ডিজনিও টাকা ঢালতে রাজি হয়ে গেল। সঙ্গে জুড়ে গেল ইএসপিএন ফিল্মসও।

ফিওনা মুতেসির উঠে আসার এই কাহিনী নিয়ে মীরা নায়ার বেশ উচ্ছ্বাসই প্রকাশ করেছেন, ‘এমন কাহিনী নিয়েই আমি সিনেমা বানাতে পছন্দ করি। মুতেসি এমন প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছে, যেখান থেকে কিছু একটা করাটাই অসম্ভব বলে মনে হয়। ’ এই মুতেসির চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাদিনা নালওয়াঙ্গা। ফিওনার মা হ্যারিয়েট করেছেন লুপিটা নিয়ঙ্গো। আর ফিওনার প্রশিক্ষক রবার্ট কাতেন্দ হয়েছেন ডেভিড ওয়েলোওয়ো। প্রথম দিকে যদিও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সিনেমাটিতে সব নতুনদের নেওয়া হবে, কিন্তু নতুন কেবল উগান্ডার মাদিনা নালওয়াঙ্গাই। বাকি দুজনই হলিউডের চেনা মুখ। নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ডেভিড এর আগেও অভিনয় করেছেন ‘রাইজ অব দ্য প্ল্যানেট অব দি এপস’, ‘মিডল অব নোহয়ার’ এবং ‘লিংকন’-এর মতো সিনেমায়। আর কেনিয়ান বংশোদ্ভূত লুপিতা কো ‘টুয়েলভস ইয়ার্স আ স্লেভ’-এ অভিনয় করে অস্কারই জিতেছেন। তবে তাঁর কাছে অস্কারজয়ী সেই সিনেমার চেয়ে ‘কুইন অব কাতওয়ে’র কাহিনীই বেশি ভালো লেগেছে, ‘প্রথম কোনো চিত্রনাট্য আমাকে চমকে দিল। মনে হয়েছে, আমার গভীরের সত্তাটা যেন জেগে উঠেছে। ’

কেবল কলাকুশলীরাই নয়, সিনেমাটির প্রশংসা করছেন সমালোচকরাও। টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, আরবান ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভাল এবং বিএফআই লন্ডন ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয়েছে। .

 

ধোনির না-বলা গল্প

১৫ মার্চ ২০১৬। ভারতে শুরু হয়েছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসর। একই দিনে মুক্তি পেয়েছিল বলিউডের একটা সিনেমার টিজার। হ্যাঁ, সিনেমাটির সঙ্গে ক্রিকেটের যোগ আছে বেশ ভালোভাবেই। সিনেমাটি যে বানানোই হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে নিয়ে।

‘পান সিং তোমর’, ‘ভাগ মিলখা ভাগ’, ‘মেরি কম’ আর ‘আজহার’-এর পর এটা সাম্প্রতিক সময়ের সধ্যে বলিউডের পঞ্চম স্পোর্টস বায়োপিক। তবে অন্যগুলোর সঙ্গে এটির পার্থক্য যাকে নিয়ে সিনেমাকে সেই মহেন্দ্র সিং ধোনি এখনো খেলে যাচ্ছেন। তিনি ভারতের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কও বটে। অবশ্য সিনেমাটিতে ধোনিকে মহান কোনো ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। বরং জন্ম থেকে শুরু করে অধিনায়ক হিসেবে ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতা পর্যন্ত, ব্যক্তি ধোনির জীবনকেই এতে তুলে আনা হয়েছে। পরের বছরগুলোর কিছু ঘটনাও অবশ্য আছে। তবে সব মিলিয়ে ছবিতে একটা টান টান ভাব যে থাকবে সেটা নিশ্চিত। কারণ পরিচালক নীরজ পাণ্ডে। যিনি ‘আ ওয়েডনেস ডে’, ‘স্পেশাল ২৬’, ‘বেবি’-এর মতো থ্রিলার বানিয়েছেন। সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল গত বছরের প্রথম দিকেই। কিন্তু বাদ সাধেন স্বয়ং ধোনি। না, সিনেমাটি করার ব্যাপারে ধোনির কোনো আপত্তি নেই। রয়ালটি বাবদ বেশ মোটা অঙ্কের টাকাই পাচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্যে সে টাকার অঙ্ক ৪০ কোটি রুপি গিয়েও ঠেকেছে। গোল বাধে অন্যত্র। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে, অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঝপথেই, হঠাৎই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। ফলে সিনেমার কাহিনীতেও বদল আনতে হয়। মুক্তির নতুন তারিখ ঠিক করা হয় সে বছরেরই ২২ অক্টোবর। তবে শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি তারও বছরখানেক পরে মুক্তি পাচ্ছে। তারিখ এতটা পেছানোর একটা কারণ বাজেট বেড়ে যাওয়া। আর অন্য কারণ—ধোনি আর তাঁর স্ত্রীর কোলজুড়ে আসা ফুটফুটে এক মেয়ে।

সিনেমাটিতে ধোনির চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুশান্ত সিং রাজপুত। কেমন করেছেন, তা কিছুদিনের মধ্যেই জানা যাবে। ছোটবেলায় ক্রিকেট খুব একটা ভালো খেলতেন না। তবে ছবিতে ভালো করার জন্য পরিশ্রম যে কম করেননি, তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। ধোনির চরিত্র বোঝার জন্য তিনি আড়াই শটি ‘হাইপোথিটিক্যাল’ প্রশ্ন নিয়ে দেখা করেছিলেন ধোনির সঙ্গে। সেসব প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করেছেন, সে কেমন। আলাপ করেছেন ধোনির ছোটবেলার বন্ধু আর শিক্ষকদের সঙ্গেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধোনির নানা ভিডিও ফুটেজ দেখেছেন। ধরার চেষ্টা করেছেন ধোনির শরীরী ভাষা আর নানা মুদ্রাদোষ। নিজের মধ্যে খেলোয়াড়ি দেহভঙ্গি আনার জন্য বছরখানেক অনুশীলন করেছেন কিরণ মোরের অধীনে থেকেও। আর ট্রেলার থেকে বোঝা যাচ্ছে ধোনির ট্রেডমার্ক ‘হেলিকপ্টার’ শটটাও ভালোই আয়ত্ত করেছেন তিনি। তবে শরীরী ভাষা আর কয়েকটি শট আয়ত্ত করলেই যে ছবি সফল হয় না তার প্রমাণ ‘আজাহার’। সুশান্তের মতে তাঁর বড় কাজটা ছিল নিজেকে বোঝানো, যে তিনিই ধোনি।

ধোনির চরিত্রে অভিনয় করার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিলেন অক্ষয় কুমারও। তবে তাঁর সঙ্গে ধোনির চেহারা-শরীরের কোনো মিলই নেই। তাই পরিচালক নীরাজ পাণ্ডে সাম্প্রতিক সব ছবিতে অক্ষয়কে নিলেও এবার বাধ্য হন সুশান্তকে নিতে। ধোনির স্ত্রী সাক্ষী সিং রাওয়াত চরিত্রেও এমন বদল ঘটেছে। প্রথমে শোনা যাচ্ছিল পরিণীতি চোপড়ার নাম। শেষ পর্যন্ত অভিনয় করেছেন কিয়ারা আদভানি। ধোনির সাবেক প্রেমিকা প্রিয়াঙ্কা ঝার চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগতা দিশা পাতানি। থাকছেন অনুপম খেরও, ধোনির বাবা পান সিংয়ের চরিত্রে। তবে সে চরিত্রের জন্য তাঁকে তাঁর প্রিয় গোঁফটা বিসর্জন দিতে হয়েছে। আবার চেহারায়-শরীরে মিল থাকার ভিত্তিতেও অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন বেশ কজন—বিরাট কোহলির চরিত্রে ফাওয়াদ খান, সুরশে রায়নার চরিত্রে রাম চরণ তেজা, জহির খানের চরিত্রে গৌতম গুলাতি আর যুবরাজ সিংয়ের চরিত্রে হ্যারি তাংরি। আরো আছেন ভূমিকা চাওলা। ছবির বেশির ভাগ অংশেরই শুটিং হয়েছে সত্যিকারের লোকেশনে। বাদ যায়নি ধোনির ছোটবেলার স্কুল আর খড়গপুর স্টেশনও [ধোনি যেখানে ট্রেনের টিটি ছিলেন]।


মন্তব্য