kalerkantho


মানুষ এই নাটকের ভাষা বুঝেছে

শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে আজ শূন্যনের নাটক ‘লাল জমিন’-এর শততম মঞ্চায়ন। মান্নান হীরার রচনায় নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন সুদীপ চক্রবর্তী। একক অভিনীত এই নাটকে অভিনয় করেছেন মোমেনা চৌধুরী। ‘লাল জমিন’-এর মাইলফলক নিয়ে বলেছেন তিনি। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মানুষ এই নাটকের ভাষা বুঝেছে

প্রথমে তো স্ক্রিপ্ট দেখেই ভড়কে গিয়েছিলাম। পুরো ৩৭ পৃষ্ঠা।

তা-ও আবার একক অভিনয়! যত পড়েছি ততই আলোড়িত হয়েছি। ১৪ ছুঁই ছুঁই এক কিশোরী মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু বয়স তাকে অনুমোদন দেয় না। দুরন্ত এ কিশোরীর সাদা শাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে কিভাবে লাল জমিনে পরিণত হয়, তা নিয়েই ‘লাল জমিন’। ২০১১ সালের ১৯ মে নাটকটি নিয়ে প্রথম মঞ্চে উঠি। স্পষ্ট মনে আছে, হলভর্তি দর্শক। ভীষণ নার্ভাস আমি। আগে একক অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না। মঞ্চায়নের আগে টানা ছয় দিন টিএসসির মঞ্চে রিহার্সেল করেছি। সেদিক থেকে আত্মবিশ্বাস হয়েছে, পারব। এ বিশ্বাস নিয়েই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলাম। শুরু করার পর দেখলাম নার্ভাসনেস যেন কোথায় উবে গেছে। এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের মতো টানা অভিনয়। মঞ্চায়ন শেষে দেখলাম সব দর্শক উঠে দাঁড়িয়েছে। অনেকের চোখে জল! এক ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘আপা, এই নাটকের পরের শো কবে? আমি আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে আসব। ’

লাল জমিন মঞ্চায়নের আজ চার বছর ৯ মাস হলো। এ সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরে ২৫টি জেলাসহ ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছি। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, কঠিন সময় পার করে এসেছি। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। অনেকের ভালোবাসা পেয়েছি। ত্যাগও করতে হয়েছে অনেক। পরিবারকে সময় দিইনি। সব মিলিয়ে পেয়েছিই বেশি।

দেশের বাইরে প্রথম শো করি লন্ডনে, ২০১১ সালের অক্টোবরে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পুরনো একটা অফিসে। সেখানে ছোট্ট একটি জায়গায় মঞ্চ। দুটি সাদা টিউবলাইট ছাড়া আর কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। দর্শক মাত্র ৬৯ জন। তাদের মধ্যে দুজন মুক্তিযোদ্ধা। নাটক শেষে যেন কান্নার রোল উঠল। ৬৯ জন মানুষই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদেছে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। মনে হলো এখনো চোখের কোণে জল আসে। এরপর কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় শো করি। অশোকনগরে শো শেষে একজন দর্শক হাত ছুঁয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের বাড়ি ছিল বরিশালে। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় ভারত চলে আসি। তোমাকে ছুঁয়ে মনে হলো অনেক বছর পর বাংলাদেশকে ছুঁলাম’—বলেই অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন।

যত দূর মনে পড়ে ফেরদৌসী আপা (ফেরদৌসী মজুমদার), শিমূল ইউসুফ, মুনিরা ইউসুফ মেমী, নাজনীন চুমকি, রোজী সিদ্দিকী, জ্যোতি সিনহাসহ অনেকেই একক অভিনয় করেছেন। কিন্তু দেখা গেছে দু-চারটা শো করার পর নানা কারণে অনেকেই সেটা কন্টিনিউ করেননি। একক অভিনয়ে কিছু সুবিধা আছে, অসুবিধা অজস্র। সহজেই পুনরাবৃত্তির মায়ায় পড়তে হয়। ফেরদৌসী আপার ক্ষেত্রে অভিনয়টা ছিল মূলত বাচিক, কিন্তু লাল জমিনের গল্পই এমন যে গান গেয়ে, নেচে, ছুটে, শুয়ে-বসে ও নিগ্রহের পীড়নে ছিন্নভিন্ন হয়ে মঞ্চকে নাস্তানাবুদ করতে হয়েছে। আমাকে কখনো হানাদার সৈন্য, কখনো রাজাকার, কখনো মা, কখনো কন্যার ভূমিকা নিতে হয়েছে। যেন শতরূপে শত দুঃখ-সুখের পালা রচনার কারবার। শারীরিক কসরতও কম করতে হয়নি।

এ নাটকে আমার শোতে যারা কাজ করে তারা আসে খুব আগ্রহ নিয়ে। কিন্তু কয়েকটা শো করার পর তারা চলে যায়। এই সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে অনেক। মানুষ হয়তো মঞ্চে তাদের দেখছে না। কিন্তু যে ছেলেটি মঞ্চের পেছনে কাজ করে, লাইট কিংবা মিউজিক করে সে যখন দর্শকের সামনে আসে তখন সেও প্রশংসা পায়। প্রতিটি কাজ মিলিয়েই তো অভিনয়। গেল ডিসেম্বরে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক ফোন করলেন সেখানকার বিজয় মঞ্চে শো করার জন্য। বিজয় দিবসের তখন ঠিক দুই দিন বাকি। যে লাইট করে, মিউজিক করে তারা দুজনেই ব্যস্ত। কিন্তু আমি শোটা নিয়ে নিলাম। তানভীর ছাড়াও মামুন নামে একটি ছেলে সঙ্গে ছিল। আমরা তিনজন মিলে শোটা করে এলাম।

শো করতে গিয়ে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে মানুষের আবেগের তারতম্যও দেখেছি। ঢাকার শোতে দর্শকদের আবেগ থাকে। কিন্তু ঢাকার বাইরের শোগুলোতে মানুষের যে আবেগ দেখেছি তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। নাটকের ভাষা দারুণ কাব্যময়। শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটি দেখে একজন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষ কি এই নাটকের ভাষা বুঝবে?’ বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ এ নাটকের ভাষা বুঝেছে। পাটগ্রামের মতো জায়গায় পরপর তিন বছর এ নাটকের তিনটি শো করেছি। প্রতিটি শো হাউসফুল। দর্শনীর বিনিময়ে নাটকটি দেখেছে তারা।

শারীরিক সামর্থ্য যত দিন থাকবে তত দিনই নাটকটি নিয়ে কাজ করতে চাই। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, সেই তরুণ প্রজন্মের জন্য নাটকটি মঞ্চে এনেছি। ঢাকার কয়েকটি কলেজে মঞ্চায়নের দায়িত্ব নিয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। নাটকটি নিয়ে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে যেতে চাই।

 

অনুলিখন : পিন্টু রঞ্জন অর্ক


মন্তব্য