kalerkantho

25th march banner

তিনিই ক্যাথরিন দেনিউব

বরফের মতো শীতল ব্যক্তিত্বের অভিনয় দিয়েই তিনি ঝড় তুলতেন হাজার হাজার যুবকের হৃদয়ে। অভিনয় করছেন ১২০টির বেশি ছবিতে। এই ৭৩-এ এসেও অভিনয় করে যাচ্ছেন সমানতালে। হলিউডে আগামীকাল মুক্তি পাচ্ছে তাঁর ছবি ‘স্ট্যান্ডিং টল’। এই অভিনেত্রী সম্পর্কে জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তিনিই ক্যাথরিন দেনিউব

ক্যাথরিন দেনিউব। ফরাসি এই অভিনেত্রী পরিচিত ‘আইস মেইডেন’ নামে। কারণ বরফের মতো শীতল ব্যক্তিত্বের অভিনয় দিয়েই তিনি ঝড় তুলতেন হাজার হাজার যুবকের হৃদয়ে। তাঁকে বলা হতো ‘পৃথিবীর সবচেয়ে মার্জিত সুন্দরী’। ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণীদের প্রসাধনের একটা বিজ্ঞাপন করেন। সে বিজ্ঞাপনে তাঁর সংলাপটিও ভীষণ ঝড় তুলেছিল। তখন ৩৯-এ পা দেওয়া ক্যাথরিনের সংলাপ ছিল, ‘ভালো করে দেখো আমাকে। আসছে বছর আমি ৪০-এ পা দেব। ’ এর দুই বছর পর, ১৯৮৫ সালে ফ্রান্সের স্বাধীনতার প্রতীক ‘মারিয়েন’ হিসেবে তাঁর প্রতিকৃতির ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সেটা ব্যবহার করা হয়।

এই জাতীয় প্রতীকে ফ্রান্সের বিখ্যাত নারীদের ছবি ব্যবহার করা শুরু হয় ১৯৬৯ সাল থেকে।

প্রথম দিকে ব্যবহার করা কেবল সৌন্দর্য দিয়েই যে তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন তা কিন্তু নয়। অভিনয়ের সঙ্গে সৌন্দর্যের যুগলবন্দিতেই তাঁর এ সাফল্য। অভিনয়ের ব্যাপারে তাঁর দর্শনও ছিল সোজাসাপ্টা—‘তোমার (সিনেমায় অভিনয়ের জন্য) যদি আমাকে দরকার হয়, তোমাকেও আমার উপযুক্ত হতে হবে। আর যদি তুমি সে রকম হও, স্বর্গীয় জগতে স্বাগতম। ’ এই স্বর্গীয় জগতের আহ্বান শেষ হয়নি আজও। ৭৩ বছর বয়সে এসেও অভিনয় করে যাচ্ছেন ক্যাথরিন।

ফরাসি এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জন্ম ১৯৪৩ সালে। তাঁর মা-বাবা হনে সিমোনো এবং মরিস ডোগলেয়াক দুজনই মঞ্চে অভিনয় করতেন। অভিনয় করতেন তাঁর বড় বোন ফ্রাঁসোয়া ডোগলেয়াকও। সে সময়ে বেশ নামও কামিয়েছিলেন। বড় বোন ফ্রাঁসোয়ার পরিচয়ে যাতে পরিচিত না হতে হয়, সে জন্য অভিনয়ে নাম লেখানোর সময়ই নিজের নাম পাল্টে ফেলেন তিনি। নিজের নামের শেষে যোগ করেন মায়ের পারিবারিক পদবি। ক্যাথরিন ডোগলেয়াক থেকে হয়ে যান ‘ক্যাথরিন দেনিউব’। তাঁর বয়স তখন মোটে ১৪ বছর।

ক্যাথরিনকে নিয়ে প্রথম সাড়া পড়ে যায় এরও বছর সাতেক পরে। ১৯৬৪ সালে জ্যাক ডুমর মিউজিক্যাল ‘দি আমব্রেলাস অব শেহবুর্গ’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে। নিজের কাজগুলোর মধ্যে এটিই ক্যাথরিনের সবচেয়ে প্রিয়। তবে তাঁর ওই বরফ শীতল কিন্তু তুমুল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত হয় এর পরের বছর। বিখ্যাত পরিচালক রোমান পোলানস্কির ক্ল্যাসিক ‘রিপালশন’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর খ্যাতির চূড়ায় ওঠেন আরেক কিংবদন্তি পরিচালক লুই বুনুয়েলের সঙ্গে কাজ করে। বুনুয়েলের ‘বেল দে জ্যুর’ (১৯৬৭) এবং ‘ত্রিস্তানা’ (১৯৭০) তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

এর পর থেকেই নিয়মিত সিনেমায় অভিনয় করছেন ক্যাথরিন। কাজ করেছেন ফ্রঁসোয়া ত্রুফো, টনি স্কট, লার্স ভন ট্রায়ারের মতো পরিচালকদের সঙ্গে। মনোনয়ন পেয়েছেন অজস্রবার। ফ্রান্সের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘সিজার অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্যই ১৪ বার মনোনয়ন পেয়েছেন। ঝুলিতে পুরেছেন দুইবার। মনোনয়ন পেয়েছেন অস্কার ও বাফটা পুরস্কারের জন্যও। এ ছাড়া জিতেছেন আরো এক কুড়ি অ্যাওয়ার্ড।

পৃথিবীর সবচেয়ে মার্জিত সুন্দরী ক্যাথরিন নিজেকে কেবল অভিনয়েই আটকে রাখেননি। যৌবনে মডেলিং তো করেছেনই, মডেলিং করেছেন মধ্যবয়সে এসেও। নিজের অভিনীত বেশ কিছু সিনেমার কেবল পোশাক ডিজাইনই নয়, গয়না-অলংকার, জুতো, চশমার নকশাও করেছেন। এমনকি তাঁর নামে একটা সুগন্ধীও আছে বাজারে। ১৯৮৬ সালে ‘দেনিউব’ নামের পারফিউমের ব্র্যান্ডটি আত্মপ্রকাশ করে।

অভিনয়ের বাইরেও কাজ করেছেন দেশ ও মানুষের জন্যও। সেই ১৯৭২ সালে ‘মেনিফেস্টো অব দ্য ৩৪৩’-তে স্বাক্ষর করেন তিনি। ফ্রান্সে গোপনে গর্ভপাতের বিরুদ্ধে সেটি ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ। পরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী প্রচারণা শুরু করেন তিনি। ২০০১ সালে ‘টুগেদার অ্যাগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি’ গ্রুপের সঙ্গে মিলে প্যারিসের মার্কিন দূতাবাসে এ বিষয়ে একটা চিঠিও পাঠান। ২০০৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সেগোলেন রয়াল ‘নারীবিদ্বেষী’ কিছু কর্মসূচি হাতে নিলে, তাঁর বিরুদ্ধেও সোচ্চার হন দুনভ। কেবল সামাজিক-রাজনীতিক কর্মকাণ্ডেই নয়, দেনিউব জড়িত নানা দাতব্য কাজেও। ১৯৯৪-২০০৩ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ইউনেসকোর ‘গুডউইল অ্যাম্বাসাডর’। ‘মারিয়ান’ হিসেবে তাঁর প্রতিকৃতি ব্যবহারের ফলে তিনি যে অর্থ পেয়েছিলেন, তা দিয়ে দেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিবন্ধী, শিশুদের উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, আফ্রিকার শিশু, এতিম শিশু, এইডস, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ইস্যুতেও দাতব্য কাজে জড়িয়ে আছেন ‘আইস মেইডেন’ ক্যাথরিন দেনিউব।


মন্তব্য