kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


কথা আগে না সুর?

এমন আলোচনা দীর্ঘদিনের। কেউ বলেন কথার ওপর সুর বসলে কথার গভীরতা ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। অন্যদের মতে, সুরের ওপর কথা বসালে ইচ্ছেমতো সুর করা যায়। সুরটাকে যেকোনো দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। কেউ কেউ আবার উভয় দলেই আছেন। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রবিউল ইসলাম জীবন

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কথা আগে না সুর?

মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

গান মানুষ শোনে, পড়ে না। শোনার সময় অবশ্যই সুরটা বেশি প্রাধান্য পায়। কিন্তু কী কথা বলা হচ্ছে? সেটা কতটা গীতিকবিতা হয়ে উঠছে তাও দেখতে হবে। দুর্বল কথায় চমৎকার সুর কিংবা অসাধারণ গীতিকবিতায় দুর্বল সুর থেকেই ‘কথা আগে না সুর?’ প্রশ্ন আসে। রবীন্দ্রনাথের গানে কথা ও সুর দুটিই প্রাধান্য পায়। কিছু কিছু সুর একই রকম মনে হলেও কথার কারণে সেটা আলাদা লাগে। আবার নজরুলের গানে বাণীর চেয়ে সুরের প্রাধান্য বেশি, বৈচিত্র্যও বেশি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশ গানই হয়েছে কথার ওপর। সমসাময়িক গানে সুরের ওপরই কথা বসানোর হিড়িক চলছে। এতে করে সুর যেন বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছে। সেদিন যশোর থেকে ঢাকায় আসার পথে যত গান শুনেছি সবই প্রায় একই মনে হয়েছে। সুর ও কণ্ঠক্ষেপণ যেন শিক্ষার একেবারে ধারেকাছেও নেই। যে গীতিকবিতা ও সুর একই সঙ্গে তার মান বজায় রাখতে পেরেছে সে গানই কালোত্তীর্ণ হয়েছে। গান করার সময় এ বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

একটা গানের সব কিছুর আগে কথা। আমি যদি কথাটাই না বুঝতে পারি, তাহলে কিসের ওপর সুর করব? আগে কথাটা বুঝব যে কথাটা দুঃখের, না সুখের, ব্যঙ্গ নাকি অন্য কোনো কিছু নিয়ে। ক্ষেত্রবিশেষ কোনো গান তৈরির সময় বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝে সুরের একটা আউট লাইন করা যেতে পারে। তারপর সেটা গীতিকারকে বুঝিয়ে দিতে হবে। খুব সুচতুর গীতিকার হলে এই সুরের মধ্যে ঢুকে কথা প্রয়োগ করতে পারেন। আমি যত দূর বুঝি এ কাজটা খুব কঠিন। এতে গানের ছন্দ, অন্ত্যমিলসহ গ্রামাটিক্যাল বিয়ষগুলো ব্যাহত হয়। যদি প্রতিটি গানেই সুরের ওপর কথা বসানো হয় তখন এলোমেলো হতে বাধ্য। সারা পৃথিবীতেই কথা আগে, সুর পরে। গানের ক্রেডিট লাইনেও আগে গীতিকারের নাম, তারপর সুরকারের। আমি দুই হাজারের মতো গান করেছি। তার ৯৯ শতাংশই কথার ওপর সুর করা। এটাই উচিত বলে আমার অভিমত।

বালাম

ক্যারিয়ারের শুরুতে সুরের ওপর গান লেখাতেই বেশি মনোযোগী ছিলাম। এখন অবশ্য সে ঘোরটা কেটে গেছে। সুরের ওপর বেশি গান করলেও লেখার ওপরও করা হয়। আগে কথা হোক কিংবা আগে সুর হোক একটা নিয়ে দীর্ঘদিন টানা কাজ করলে একঘেয়েমি চলে আসে। তখন আবার অন্যটা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে গানে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। আবার এমনও হয়, দু-তিনটি লাইন বা শুরুটা কথার ওপর করলাম, বাকিটা সুর থেকে। এতে গানটি একটি ভালো পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। তবে বিষয়ভিত্তিক গান হলে সুরের ওপর কথা বসানোটা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। এটা গীতিকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। যাঁরা প্রফেশনাল তাঁরা সহজেই উতরে যেতে পারেন। কথার ওপর সুর করার কিন্তু অন্য রকম একটা আনন্দ আছে। তবে লেখাটা কমন ছন্দে হয়ে গেলে তখন ভালো সুর করাটা কঠিন।

হৃদয় খান

আমার করা ৯৫ শতাংশ গানই সুরের ওপর লেখা। এটা আসলে গানের ওপর নির্ভর করে। আমি যে ধরনের গান করি তার জন্যই হয়তো আগে সুর হলে শুনতে ভালো লাগে। অন্যভাবে বলা যায়, সুরটা আগে চলে আসে। যেমন আমার ‘বল না তুই বল না’ সুরের ওপর লেখা। সুরের সঙ্গে কথাগুলো এমনভাবে গেছে শুনতে খুব আরাম লাগছে। আগে কথা হলে হয়তো মিটারটা অন্য রকম হতো। সুরটাও এমন হতো না। সুরের চলনের জন্যই গানটি ভালো লাগছে। ‘চাই না মেয়ে’, ‘ভেবে ভেবে’, ‘অবুঝ ভালোবাসা’, ‘ভালো লাগে না’, ‘জানি একদিন’, ‘যাবি যদি উড়ে’সহ আমার অনেক জনপ্রিয় গানই সুরের ওপর করা। তাই বলে আমি কথার ওপর সুর করার বিপক্ষে নই। সম্প্রতি ছবিতে কিছু গান করেছি কথার ওপর সুর দিয়ে। দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখি না। অনেক সময় এমন কথা লেখা হয় সেটার ওপর সুর করলেই গানটি বেশি মানানসই হয়। কথা আগে, না সুর? তা না দেখে গানটি আপনি কতটা ভালোভাবে তৈরি করতে পেরেছেন সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


মন্তব্য