kalerkantho


সেই রাতের কথা বলছি...

২৫ মার্চ, ১৯৭১। সেদিনের কালরাতের অন্ধকারে ঢাকার নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলে পড়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেদিন ঢাকায় ছিলেন অভিনেতা-নির্দেশক মামুনুর রশীদ ও কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী। সেই কালরাতের কথা বলছেন তাঁরা—

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সেই রাতের কথা বলছি...

মামুনুর রশীদ ,সৈয়দ আবদুল হাদী

অন্ধকার আকাশ আলোকিত হয়ে গেছে ওদের গুলির আলোতে

মামুনুর রশীদ

সেই রাতে আমি গ্রিন রোডে ছিলাম। প্রয়াত চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক ফরহাদ সাহেবের বাসায়।

সন্ধ্যা থেকেই আমরা আঁচ করতে পেরেছিলাম ঢাকায় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। একটা ছমছমে পরিবেশ। ফরহাদ সাহেবের বাসায় বসে আমি একটা চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি লিখছিলাম। উনি বললেন বাইরের অবস্থা তো তেমন ভালো নয়, তুমি বরং থেকেই যাও। আর রাস্তাঘাটেও নাকি ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। রাত যখন গভীর হচ্ছিল সারা শহরে গুলির আওয়াজ বাড়ছিল। টের পাচ্ছিলাম গ্রিন রোডের ওই বাড়ির সামনে দিয়ে একের পর এক ট্যাংক যাচ্ছে। একটা সময় ট্যাংক কয়েকটা বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে গেল। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যেকোনো সময় আমাদের মৃত্যু হতে পারে। অন্ধকার আকাশ আলোকিত হয়ে গেছে ওদের গুলির আলোতে। আকাশে হাওয়াই বাতির মতো গুলি ছুড়ছিল ওরা। আমাদের কানে এলো, ইকবাল হলসহ রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ি—এ রকম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ওরা হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। সারা রাত ধরেই গুলির শব্দ। কখন থামবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। মনে করেছিলাম হয়তো ফজরের আজানের সময় গুলি করবে না বা তারপর থেমে যাবে। কিন্তু কিসের কী! তখনো চলছিল। পরের দিনও বের হতে পারলাম না। সারা শহরে কারফিউ ছিল। ২৭ তারিখ বের হয়ে দেখি লাশ আর লাশ। মানুষ ছুটছে এলোমেলোভাবে। আমার বোনের বাসা ছিল গুলিস্তানের পাশে। তার বাসায় যেতে যেতে যেসব দৃশ্য দেখলাম তার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।

কাপড়ে মুড়ে ফাইলটা বাড়ির ভেতরই মাটিচাপা দিলাম

সৈয়দ আবদুল হাদী

ওই দিন রাতে আমরা কয়েকজন মিলে সাবিনা ইয়াসমীনের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। সবার নাম সঠিকভাবে মনে নেই। তবে এম এ হামিদের কথা স্পষ্ট মনে আছে। কারণও আছে। রাত একটু বাড়তেই গায়ক খন্দকার ফারুক আহমেদ দৌড়াতে দৌড়াতে এসে আমাদের বকতে শুরু করলেন, ‘আপনারা এখনো বসে আছেন! শহরের অবস্থা খুব খারাপ। গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। সারা শহরের রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া, তাড়াতাড়ি উঠুন। ’ আমরা জলদি করে বের হলাম। আমার গাড়িটা সাবিনার বাসার পাশেই রেখে জোর পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। সঙ্গে ছিল হামিদ। দুজনের বাসা মগবাজার। আমরা হাঁটতে হাঁটতে বাসায় এলাম। নানা রকম অস্ত্র আর গুলির আওয়াজ শুনলাম। বাসায় এসে প্রথমেই যেটা করলাম একটা ফাইল লুকিয়ে ফেললাম। মার্চ মাসের প্রথমে দেশের কবি-সাহিত্যিকরা একটা সংগঠন করেছিলেন ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। কণ্ঠশিল্পী ছাড়াও নাটক, নৃত্য ও চলচ্চিত্র শিল্পীরা মিলে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটা সংগঠন করেছিলাম, আমি সাধারণ সম্পাদক। সব কাগজপত্র আমার কাছেই ছিল। কাপড়ে মুড়ে ফাইলটা বাড়ির ভেতরই মাটিচাপা দিলাম। সেদিন সারা রাতই গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। পরের দিন কারফিউ ছিল, তাই বের হতে পারিনি। ২৭ মার্চ রাস্তায় বের হই। কী যে বীভৎস দৃশ্য! সারা শহর পুড়িয়ে দিয়েছে ওরা। তখনো অনেক জায়গায় লাশ পড়ে ছিল। এসব দৃশ্য আসলে বর্ণনা করা যায় না।

অনুলিখন : মীর রাকিব হাসান


মন্তব্য